সৌদির চাপের মুখে নমনীয় হবে কাতার

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২১ জুলাই ২০১৭, শুক্রবার: সৌদি আরবের নেতৃত্বে কয়েকটি আরব দেশের আরোপিত অবরোধে কাতারের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। সৌদি জোট আশা করেছিল তাদের চাপের মুখে নমনীয় হবে কাতার, বন্ধ করে দেবে আলজাজিরা, সমর্থন প্রত্যাহার করবে হামাস ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতি এবং সম্পর্ক ছিন্ন করবে ইরানের সাথে; কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হয়নি। বেশ দক্ষতার সাথেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে চলছে আরব বিশ্বের ছোট্ট দেশটি। সৌদি জোট যেসব সহযোগিতা বন্ধ করেছে তার প্রতিটিরই বিকল্প সমাধান খুঁজে নিয়েছে তারা।
অবরোধ ঘোষণার পরদিনই কাতারের বাসিন্দারা দেশটির মুদি দোকানগুলোয় ভিড় জমিয়েছিল। শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই যতটা সম্ভব সংগ্রহ করে রেখেছে দুগ্ধজাত পণ্যসহ সব আমদানিকৃত খাদ্যদ্রব্য। স্থলপথে আমদানির একমাত্র পথটি সৌদি সরকার বন্ধ করে দেয়ায় দেশটি খাদ্য সঙ্কটে পড়তে যাচ্ছে এমন ধারণা ছিল সবার। কিন্তু সপ্তাহ না ঘুরতেই পাল্টে গেল দৃশ্যপট। কাতারের অলিগলির দোকানগুলো আবার ভরে উঠল গোশত কিংবা পনিরের মতো আমদানি পণ্যে। তুরস্কসহ ইউরোপ থেকে আসতে থাকল খাদ্যদ্রব্য। অবরোধের ধাক্কা সামলে উঠতে ওমান, ভারত ও তুরস্কের সাথে নতুন পাঁচটি বাণিজ্য রুট চালু করল কাতার।
কোনো প্রভাব পড়ল না কাতারের পর্যটন খাতেও। সেন্ট রিজিসের মতো বিলাসবহুল হোটেলগুলোয় আগের মতোই ভিড় লেগে আছে বিদেশী অতিথিদের। গত সপ্তাহে বার্সেলোনা ও বিশ্ব ফুটবলের বড় তারকা জেরার্ড পিকে, সার্জিও বুস্কেটস, জর্ডি আলবাকে দেখা গেছে একটি শপিং মলে প্রচুর ভক্তবেষ্টিত অবস্থায়। আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশটিতে শুধু গত জুন মাসেই ৪ হাজার ৩০০টি গাড়ি এসেছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। হাঙ্গেরি থেকে এসেছে ১৬৫টি দুগ্ধবতী গরু। আগস্ট মাসের মধ্যে হাঙ্গেরি, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানি থেকে আসবে মোট চার হাজার গরু। অবরোধের কারণে সৌদি আরবে থাকা কাতারের কৃষকদের পশুগুলো আটকে দেয়া হলেও সৌদি সীমান্তরক্ষীদের সাথে অনানুষ্ঠানিক চুক্তি করে তারা ফেরত এনেছে উটগুলো। কাতারের অবকাঠামো খাতও এখনো বহাল তবিয়তে আছে। অবরোধের কোনো ধাক্কাই লাগেনি সেখানে। ২০২২ সালে দেশটিতে অনুষ্ঠিত হবে ফুটবল বিশ্বকাপ। সে লক্ষ্যে এখন চলছে ব্যাপক স্থাপনা ও রাস্তাঘাট নির্মাণ। বিশ্বকাপের সময় স্টেডিয়ামগুলোয় যাতায়াতের জন্য বিশেষ এক্সপ্রেসওয়ের কাজ চলছে পুরোদমে। হামাদ বন্দরমুখী প্রশস্ত মহাসড়কের কাজেও এতটুকু বিঘœ ঘটাতে পারেনি সৌদি অবরোধ।
অবরোধের কারণে কোনো আর্থিক সঙ্কটেও পড়েনি কাতার, আমদানি বন্ধ হয়নি অর্থের অভাবে। দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ৩৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলার। এর মধ্যে চার হাজার কোটি ডলারের অর্থ ও স্বর্ণ। বাকি ৩০ হাজার কোটি কাতারের বিনিয়োগ কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে। দেশটির আয়ের প্রধান উৎস প্রাকৃতিক গ্যাস, যার উৎপাদন চলছে যথানিয়মে। এ ছাড়া কৌশলগত কারণে কাতারের রাষ্ট্রীয় সম্পদের বড় একটি অংশ বিনিয়োগ করা আছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিলাসবহুল ব্র্যান্ড এবং লন্ডন, নিউ ইয়র্কের মতো শহরের আবাসন খাতে। এটিও দেশটির অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতার বড় একটি শক্তি। পরিস্থিতি ভালোভাবে সামাল দিতে পারার কারণে কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আল থানির জনপ্রিয়তা আরো বেড়েছে দেশটিতে। কাতারের রাস্তায় বিভিন্ন গাড়ির গায়ে কিংবা বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে ‘আমরাই তামিম, আমরাই কাতার’ এমন সব সেøাগান। এক মাসের বেশি সময় অতিবাহিত হলেও চারটি আরব দেশের অবরোধের কোনো প্রভাব পড়েনি জনজীবনে। বদর জেরান নামে এক নাগরিক বার্তা সংস্থা এপিকে বলেন, ‘আগের পরিস্থিতির সাথে এখনকার কোনো পার্থক্য দেখছি না। সর্বত্রই আনন্দঘন পরিবেশ।’ সরকার আমদানিসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে বাড়তি ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখছে এবং তুরস্কসহ মিত্র দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করে চলছে। ফলে বেশ ভালোভাবেই প্রতিবেশী দেশগুলোর ছুড়ে দেয়া চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে টিকে আছে কাতার।

Leave a Reply

%d bloggers like this: