সুন্দরবনের অদূরে ট্যাঙ্কার ডুবানো কি পরিকল্পিত !

imagesনিউজগার্ডেন ডেস্ক : সুন্দরবনের জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়া ফার্নেস অয়েল অপসারণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। এই তেলের কার্যকারিতা ধ্বংস করতে যে কোনো ধরনের রাসায়নিক দ্রব্যের ব্যবহার সুন্দরবনকে আরও ঝুঁকিতে ফেলবে। বিষয়টি বুঝতে সরকারের অনেক দেরি হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া তেল অপসারণের প্রতিটি উদ্যোগ বিলম্বে নেওয়ায় সুন্দরবনের ক্ষতি বাড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। বন বিভাগ, অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও মংলা পোর্ট তেল অপসারণে উদ্যোগও নিয়েছে। সর্বশেষ সোমবার কচুরিপানা ছড়িয়ে তেল অপসারণ ও সুন্দরবনের গাছ-মাটিতে আটকে থাকা তেল পানি দিয়ে ধুয়ে দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু এ সব ক্ষেত্রেও বিলম্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে সরকার ও সরকারি সংস্থাগুলো। কচুরিপানা ছড়িয়ে তেল অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ঘটনার ৬ দিন পর। কিন্তু ততক্ষণে তেল সুন্দরবনের মাটিতে মিশে গেছে। অপরদিকে সুন্দরবনের মাটি ও শ্বাসমূলে লেগে থাকা তেল পানি দিয়ে ধোয়ার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন স্থানে তেল কাদা-মাটির সঙ্গে পুরোপুরি মিশে গেছে। অনেক স্থানে তেল শুকিয়ে images-1গেছে। কেমিক্যাল ব্যবহার নিয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থেকে স্থানীয় বনবিভাগ ও অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) তেল আটকানোর বিষয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি স্থানীয়ভাবে তেল অপসারণের বিষয়েও বনবিভাগ ও বিআইডব্লিউটিএ ঘটনার আড়াইদিন পর উদ্যোগ নেয়। ততক্ষণে তেল সুন্দরবন, এমনকি লোকালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। অপরদিকে মংলা সমুদ্রবন্দর কর্তৃপক্ষও ঘটনার দুইদিন পর ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কারটির চারপাশে রাবার বয়া দিয়ে তেল আটকানোর চেষ্টা করে। কিন্ত তখন আর ট্যাঙ্কারে খুব বেশি তেল ছিল না, জলাশয়ে তেল ছড়িয়ে পড়েছে। সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, যতক্ষণে তেল অপসারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল ততক্ষণে তেল বিশাল এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকি পানির তেল মাটিতে মিশতে শুরু করায় লেয়ার কমে এসেছে। সুন্দরবনের মাটিতে, গাছের শ্বাসমূলে তেল আটকে গেছে। ফলে স্থানীয়ভাবে তেল অপসারণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তেল অপসারণ করা গেছে ৪৮ হাজার ৪০০ লিটার। অথচ ডুবে যাওয়া ট্যাঙ্কারে তেল ছিল ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার। সরকারের সিদ্ধান্ত না পাওয়া এবং বনবিভাগ ও images-2বিআইডব্লিউটিএ-এর প্রতিটি উদ্যোগ অনেক দেরিতে গ্রহণ করায় সুন্দরবনের ক্ষতিকে কার্যকর অর্থে কমাতে পারবে না বলেই বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের গাফিলতি ও অবহেলার কারণে সুন্দরবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এদিকে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরাও এই ঘটনা নিয়ে দায়সারা কথা বলেছেন। মংলা পোর্ট থেকে দুর্ঘটনাস্থল মাত্র ২৩ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু মংলা পোর্টের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ভূইয়া ঘটনার আড়াইদিন পর ঘটনাস্থলে গিয়ে রাবার বয়া দিয়ে তেল আটকানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ সময় তিনি বলেন, ‘এটি আমার দায়িত্ব নয়। নৈতিকতার উপলব্ধি থেকে এখানে এসেছি।’ ঘটনার চারদিন পর ঘটানাস্থলে গিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খান বলেন, ‘সরকার দুর্ঘটনার বিষয়টি মঙ্গলবার বিকেলে জানতে পেরেছে। এ কারণেই ব্যবস্থা নিতে দেরি হয়েছে।’ অথচ ঘটনাটি ঘটে মংলা পোর্টের অদূরে এবং চাঁদপাই রেঞ্জ বনবিভাগের কার্যালয়ের খুব কাছে। তারপরও সরকারের বিষয়টি জানতে ১২ ঘণ্টা সময় লেগেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিদ্ধান্ত নিতে দেরি হওয়ায় সুন্দরবনের ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি এলাকায় ফার্নেস অয়েল ছড়িয়ে পড়েছে যা এখন আর অপসারণ করা সম্ভব না। ফলে তেলের কারণে সুন্দরবনের সর্বোচ্চ ক্ষতিই হবে। এই তেল আঠালো হওয়ায় রাবার বয়া দিয়ে তেল আটকানো যেত। এতে করে তেল সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় ছড়াতো না। স্থানীয় বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সরকারের পক্ষ থেকে চাপ ছিল কেমিক্যাল ব্যবহারের। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে এবং সরেজমিন পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, সুন্দরবনে কেমিক্যাল ব্যবহার করলে ইকোসিস্টেম আবারও বাধাগ্রস্ত হবে। ফলে সুন্দরবন আরও ঝুঁকিতে পড়বে। সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) কেমিক্যাল ব্যবহারে সরকারের চাপ ছিল স্বীকার করে বলেন, ‘সুন্দরবনের বাস্তবতা ভিন্ন। এ কারণেই বনবিভাগ তেল অপসারণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্রোটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক সরদার শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তেল অপসারণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সুন্দরবনে কেমিক্যাল ব্যবহার করা হলে আরও বেশি ক্ষতি হবে। তবে সরকার তেল অপসারণের সিদ্ধান্ত নিতে অনেক দেরি করেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রেই গাফিলতি করেছে। এ কারণেই সুন্দরবনে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। শুধু তাৎক্ষণিকই নয়, দীর্ঘমেয়াদেও এর প্রভাব পড়বে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও পরিবেশ-প্রতিবেশ বিষয়ক গবেষক মো. তানজীম উদ্দিন খান বলেন, ‘সরকারের গাফিলতির বিষয়টি এখানে স্পষ্ট। তারা দুর্ঘটনা রোধে উদ্যোগ নিতে তো পারেনি। যতক্ষণে উদ্যোগ নেওয়া হলো তা পুরো সুন্দরবনে ছড়িয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি স্থানীয়রা শুরু থেকেই নিজেদের তাগিদে তেল অপসারণ করছে। কিন্তু এটি যথেষ্ট নয়। রাষ্ট্র এই দুর্ঘটনার জন্য যেমন দায়ী, তেমনি দুর্ঘটনার পর তাদের গাফিলতির কারণেই সুন্দরবন মারাত্মক হুমকিতে পড়েছে।’ সুন্দরবনের শ্যামা নদীর চাঁদপাই রেঞ্জে গত মঙ্গলবার ভোরে ‘ওটি সাউদার্ন স্টার-৭’ নামে একটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ডুবে যায়। এতে ওই ট্যাঙ্কারের ৬টি হাউজে ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৬৪ লিটার ফার্নেল অয়েল নদীতে ছড়িয়ে পড়ে।
সূত্র : দি. রি.

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*