সুঅভ্যাস অর্জনে সহায়তার জন্যই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: ২৫ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার: আমি একজন শিক্ষকের সন্তান; আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটি একজন শিক্ষক; আমার অনেক বন্ধু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক, মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। সর্বোপরি, আমি তো ছাত্রাবস্থায় সকল স্তরের শিক্ষকের মুখোমুখি হয়েছি। আজ আমি একজন ছাত্রের পিতা হিসেবে শিক্ষা ব্যবস্থা ও শিক্ষক নিয়ে উদ্বিগ্ন। উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে আমাদের এই অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষা বিস্তারের ধারা রচিত হয়েছিল; যা অদ্যাবধি পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। একটা সময়ে জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস ও সুঅভ্যাস অর্জনে সহায়তার জন্যই শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল। এই প্রয়োজনকে সামনে রেখেই সমাজের বিত্তবান, দানবীর ও শিক্ষানুরাগী মহৎ ব্যক্তিরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেন। আবার যে সকল এলাকায় এমন মহান ও দানবীর ব্যক্তি না পাওয়া যেত, সে সকল এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিগণ সকলের সহযোগিতায় চাঁদা প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতেন। সমাজের সর্বত্র জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে চাইতেন।
তখন কেউ এন্ট্রাস (বর্তমানের এসএসসি) পাস করলে, দূর-দূরান্ত থেকে লোকজন দেখতে আসত। আর তৎকালীন শিক্ষা ব্যবস্থায় সর্বত্র কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ও দৃশ্যমান ছিল। শিক্ষকের বেত খেয়ে অনেক গাধা শিক্ষার্থীও মহাপণ্ডিত হয়েছে। কিন্তু কখনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীর কিংবা অভিভাবকের নালিশ থাকত না।
কিন্তু আজকাল নামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, দামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রতিযোগিতা চলছে। প্রতিষ্ঠাতারা নয়, উদ্যোক্তারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলছেন। এলাকার অযোগ্য ও বেকার লোকেরা যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা, তেমন বড় বড় ব্যবসায়িক গ্রুপও উদ্যোক্তা। জ্ঞান বিতরণের জন্য নয়, মুনাফা অর্জনের জন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। শিক্ষার্থীদেরকে নানা রকমের প্রলোভন দেখিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হচ্ছে।
শিক্ষার্থীরাও উদ্যোক্তা ও শিক্ষকদের দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে। শিক্ষার্থীর গায়ে হাত তোলা তো দূরের কথা, ধমক দিয়েও কথা বলা যায় না। আজ গুরু মারার বিদ্যাই যেন প্রচলিত! গত দুই দশক ধরে ব্যক্তিগত বা যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠা অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা খুবই নাজুক। কিন্ডারগার্টেন, মাধ্যমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিভিন্ন ধরণের ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়- সব ধরণের প্রতিষ্ঠান ব্যক্তিগত বা যৌথ উদ্যোগে গড়ে উঠেছে। সেখানে সব ধরণের কোর্স করানো হয়। কিন্তু অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে নেই পর্যাপ্ত ও দক্ষ শিক্ষক, লাইব্রেরী ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধা।
ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজ পর্যন্ত জোড়াতালি দিয়ে চলছে। পাড়ার বেকার ছেলে-মেয়েরা যেমন প্রাইভেট কলেজের শিক্ষক, তেমন সদ্য পাস করা ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, মেডিকেল কলেজের শিক্ষক। আবার কখনো ধার-দেনা করা শিক্ষক দিয়েও এমন পেশাদারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাস পরিচালনা করা হয়। যাদের শিক্ষার্থীদের প্রতি নেই কোন নৈতিক দায়বদ্ধতা; তাদের দায়বদ্ধতা নিয়োগকর্তার প্রতি, নির্দিষ্ট কোর্সের প্রতি।
একটা সময়ে রচনামূলক প্রশ্ন পদ্ধতিতে পরীক্ষা হত। রচনামূলক প্রশ্নে উত্তীর্ণের হার অনেক কম হত; কিন্তু একজন ছাত্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি পেত। তখন বড় বড় প্রশ্ন কেউ বুঝে মুখস্থ করত; আবার কেউ না বুঝে মুখস্থ করত। কিন্তু তখন যারা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হত, তারা প্রকৃতপক্ষেই মেধাবী ছিল।
১৯৯২-১৯৯৫ সালে এস এস সি তে ৫০০ অবজেক্টিভ প্রশ্ন-ব্যাংকের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের সহজে পাস করানোর পদ্ধতি ছিল। তখন তো, বিশেষ করে ১৯৯৫ সালে অনেকেই এই সুবিধা নিতে এক ক্লাস লাফ দিয়ে এস এস সি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেছিল। পাশাপাশি একই সময় থেকে শিক্ষকদের মধ্যে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের নেশার সৃষ্টি হয়, তাঁরা নিজেদের বাড়ির ছোট রুমে বিশেষ যতেœর নামে প্রাইভেট ব্যাচ পড়াতে শুরু করেন।
ছাত্র-ছাত্রীরাও বিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় বাড়তি সুবিধা নিতে শিক্ষকের প্রাইভেট ব্যাচে নাম অন্তর্ভূক্ত করতে শুরু করে। তারপর সকল বিষয় এক জায়গায় পড়ানোর নামে শুরু হয় কোচিং সেন্টারের ব্যবসা; যেখানে নামেমাত্র অভিজ্ঞ ও অনভিজ্ঞ শিক্ষক পড়াতে শুরু করেন। তখন থেকে পরীক্ষায় পাসের হার বাড়লেও, কমতে থাকে শিক্ষার মান। আর বর্তমানে চলছে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি। প্রশ্ন পদ্ধতিতে সৃজনশীলতা থাকলেও, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস রুমে সৃজনশীলতা নেই, অধিকাংশ শিক্ষকের কাছে সৃজনশীলতা নেই, শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকের কাছে সৃজনশীলতা নেই। শিক্ষার্থীদের মাঝে জ্ঞান অর্জনের প্রতিযোগিতা নেই, আর শিক্ষকদের মাঝে জ্ঞান বিতরণের নেশা নেই।
কখনো কখনো শোনা যায়- শিক্ষা বোর্ডের প্রেরণায় অধিকাংশ শিক্ষক পিইসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসি তে জিপিএ-ফাইভ এর বন্যা বইয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। ফলাফল দেখলে মনে হয়- আমাদের ছেলে-মেয়েদের বুদ্ধিবৃত্তিও যেন জ্যামিতিক হারে বেড়ে চলেছে! তবে একটা মজার বিষয় লক্ষ্যণীয়- আমাদের সময়ে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় ফেল করলে মন খারাপ হতো, বর্তমানে জিপিএ-ফাইভ না পেলে মন খারাপ হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে অশুভ দরকষাকষি চলছে, জিপিএ-ফাইভ এর নিশ্চয়তা দিয়ে উচ্চ টিউশন ফিতে শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরাও শিক্ষকের প্রাইভেট ব্যাচে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে।
সম্প্রতি কোচিং সেন্টারগুলোও অভিভাবকদের জন্য আকর্ষণীয় অফার নিয়ে এসেছে- শিক্ষার্থীকে বাড়িতে পড়তে হবে না, বাড়ির সব পড়া এখানেই শেষ করবে। আমি দেখেছি- আমার নিজ শহর কিশোরগঞ্জের অলিতে-গলিতে গড়ে উঠা কোচিং সেন্টারগুলোতে রাত ১১টা পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বিদ্যমান। আমি এও শুনেছি- শিক্ষার্থীরা নাকি কোচিং সেন্টারে বসেই রাতের খাবার সাড়ে, যাতে বাড়িতে এসেই ঘুমিয়ে পড়তে পারে।
আজকালের শিক্ষার্থীদের জীবনে যেন অবসর, বিনোদন বলতে কিছু নেই; মানসিক বিকাশের কোন সুযোগ নেই; সবকিছুই অপ্রাকৃতিক। ক্লাস ঠিক মত হোক আর না হোক; পরীক্ষা ঠিকমতই হয়। নানা কিসিমের পরীক্ষা হয়; যেমন : ছোট পরীক্ষা, মাঝারি পরীক্ষা, বড় পরীক্ষা, ইত্যাদি। পরীক্ষার মাধ্যমে জাতীয়ভাবে বুদ্ধি বিকাশের প্রতিযোগিতা সৃষ্টি না হলেও, জিপিএ-ফাইভ পাওয়ার অশুভ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে; তা যেভাবেই হোক না কেন; অসদ্পুায়ে হলেও যেন তৃপ্তির ঢেকুর আছে।
সন্তান পড়াশুনার মাধ্যমে কতটুকু জ্ঞান অর্জন করল, পরীক্ষার মাধ্যমে কতটুক মেধা অর্জন করল- তা নিয়ে অভিভাবকদের ভ্রুক্ষেপ নাই। জাতীয় পরীক্ষা তো দূরের বিষয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আভ্যন্তরীণ পরীক্ষায় পর্যন্ত যেকোন উপায়ে নম্বর বাড়ানোর জন্য শিক্ষার্থীদের চেয়ে অভিভাবকদের আগ্রহই বেশি। আজকালের শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার বড়ই অভাব পরিলক্ষিত হয়!
আমাদের শিক্ষামন্ত্রী আশা করেছেন ‘ভবিষ্যতে আমরা বহির্বিশ্বে জ্ঞান রপ্তানি করব’। নিম্নমানের ও ভুলে ভরা বই পাঠ করে অর্জিত ভুল জ্ঞান! কোটি কোটি শিক্ষার্থী ভুল বিষয় শিখে বড় হবে, ভুল বানান শিখে বড় হবে; সর্বোপরি ভুলে ভরা জীবনের সৃষ্টি হবে। শিক্ষার্থীসহ অভিভাবকরা বিশ্বাস করে- একজন শিক্ষক ভুল করতে পারেন, কিন্তু জাতীয় পাঠ্যপুস্তক ও পাঠ্যক্রম কর্তক প্রণীত বইয়ে কোন ভুল থাকতে পারে না। কারণ, দেশের উচ্চ মানের শিক্ষাবিদগণ পাঠ্য বইয়ের সম্পাদনার কাজে নিয়োজিত থাকেন।
শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশে বড় ভুলগুলো আঠা দিয়ে ঢেকে পাঠদান করে জিপিএ-ফাইভ এর বন্যা বইয়ে দেওয়া যাবে। আর ভবিষ্যতে জ্ঞান রপ্তানির পরিবর্তে জিপিএ-ফাইভ রপ্তানি করা সম্ভব হবে! শিক্ষার মান বাড়ানো হউক, শিক্ষা হউক সত্যের সন্ধানে, শিক্ষার্থীদের মনস্তত্ব ও আনন্দঘন পরিবেশে মেধাবী ও যোগ্য শিক্ষক কর্তক পাঠদান করা হোক, শিক্ষা পদ্ধতি সৃজনশীল হোক। শিক্ষা যেন ব্যবসা আর শিক্ষক যেন ব্যবসায়ী না হতে পারে- সেদিকে অবশ্যই সরকারকে মনোযোগ দিতে হবে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: