সিএমপিতে চালু হয়েছে পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা মূল্যায়ন

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১০ জুলাই: পাচারের জন্য অপহৃত হওয়া কাউকে যদি উদ্ধার করতে পারেন তবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্য পাচ্ছেন পাঁচ নম্বর। অস্ত্র উদ্ধারের জন্য পাচ্ছেন সর্বোচ্চ চার নম্বর। তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী গ্রেফতার করলে তিন নম্বর। এক কেজি গাঁজা উদ্ধারের জন্য দেয়া হচ্ছে এক নম্বর। শুধু অভিযান নয়, মামলা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট নম্বর পাচ্ছেন চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশে (সিএমপি) কর্মরত উপ-কমিশনার (ডিসি) থেকে থানার কনস্টেবলরা পর্যন্ত।
নতুন কমিশনার মো.ইকবাল বাহার যোগদানের পর থেকে সিএমপিতে চালু হয়েছে পুলিশ সদস্যদের দক্ষতা মূল্যায়নের এই কার্যক্রম। পুলিশ সদস্যদের কাজের স্পৃহা বাড়াতে নম্বরের উপর ভিত্তি করে মাসিক অপরাধ সভায় দেয়া হয়েছে সেরা কর্মকর্তার পুরস্কার।
নম্বরের ভিত্তিতে সাফল্য মূল্যায়নের নীতিমালা চালুর পর নগরীতে অপরাধ দমন ও অপরাধী গ্রেফতার এবং মামলা নিষ্পত্তি প্রায় তিনগুণ বেড়েছে বলে দাবি করেছেন সিএমপি কমিশনার মো.ইকাবল বাহার।
‘নিজস্ব কোন বিবেচনা থেকে নয়, নম্বরের উপর ভিত্তি করে পুলিশ সদস্যদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে। যিনি বেশি কাজ করছেন তিনি বেশি নম্বর পাচ্ছেন। তিনিই শ্রেষ্ঠ কিংবা চৌকস সদস্য হিসেবে পুরস্কৃত হচ্ছেন। এতে পুলিশ সদস্যরা উজ্জীবিত হয়েছেন। কাজের গতি বেড়েছে। প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। সুস্থ প্রতিযোগিতার আবহ তৈরি হয়েছে।’ বলেন সিএমপি কমিশনার।
চলতি বছরের ৯ এপ্রিল মো. ইকবাল বাহার সিএমপি কমিশনার হিসেবে যোগ দেন। মে মাস থেকে তিনি নম্বর মূল্যায়ন নীতিমালা চালু করেন। এ পদ্ধতির ভিত্তিতে জুন মাসে অপরাধ সভায় ৪৩ জনকে পুরস্কৃত করা হয়। পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয় নগদ টাকা ও সনদপদত্র।
সূত্রমতে, ৫টি ক্যাটাগরিতে পুলিশ সদস্যদের নম্বর দেয়া হচ্ছে। ক্যাটাগরিগুলো হচ্ছে গ্রেফতার, মাদক উদ্ধার, অস্ত্র-বিস্ফোরক উদ্ধার, অন্যান্য (চোরাই গাড়ি, জাল টাকা, স্বর্ণ, শাড়িসহ বিবিধ) মালামাল উদ্ধার এবং মামলা নিষ্পত্তি ও ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংক্রান্ত পুলিশের নিজস্ব কার্যক্রম।
জোনাল উপ কমিশনার, অতিরিক্ত উপ কমিশনার, সহকারী কমিশনার, বিশেষ শাখার কর্মকর্তা, কোর্ট অফিসার, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, পরিদর্শক, ট্রাফিক পরিদর্শক ও সার্জেন্ট এবং নায়েক-কনস্টেবল সবার জন্য রয়েছে আলাদা-আলাদা মূল্যায়ন নীতিমালা।
নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) আশিকুর রহমান জানান, প্রতিদিন থানা এবং বিভিন্ন ইউনিট থেকে পুলিশ সদস্যদের কার্যক্রমের বিবরণ তিনি জমা নেন। তারপর প্রতিদিনের কার্যক্রমের ভিত্তিতে নম্বর দেয়া হয়। মাস শেষে প্রত্যেক সদস্যের আলাদা আলাদাভাবে প্রাপ্ত মোট নম্বর পর্যালোচনা করে পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হয়।
সূত্রমতে, পরোয়ানা মূলে আসামি, তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী, নিয়মিত মামলার আসামি, ডাকাত-ছিনতাইকারি-ধর্ষক-অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টির সদস্য, যে কোন মামলার ভিকটিম, মানবপাচার আইনে অপহরণের শিকার এবং মানবপাচারকারী গ্রেফতারের জন্য দশমিক পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ নম্বর পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে।
ফেনসিডিল, চোলাই মদ, গাঁজা, হেরোইন, বিদেশি মদ, ইয়াবা উদ্ধারে (প্রতিটির জন্য) সর্বোচ্চ এক নম্বর পর্যন্ত দেয়ার নিয়ম আছে। অস্ত্র, ককটেল-পেট্রলবোমা, বিস্ফোরক উদ্ধারের জন্য সর্বোচ্চ চার নম্বর পর্যন্ত দেয়া হচ্ছে। তবে আসামিসহ অস্ত্র উদ্ধার হলে সর্বোচ্চ তিনগুণ পর্যন্ত বাড়তি নম্বর দেয়ার কথা উল্লেখ আছে নীতিমালায়।
মামলা নিষ্পত্তির জন্য আছে এক নম্বর। প্রতিটি মামলার রহস্য উদঘাটনের জন্য দেয়া হচ্ছে একের অর্ধেক নম্বর। আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নিতে পারলে দশমিক পাঁচ নম্বর। মোবাইল কোর্ট, অপমৃত্যু মামলা নিষ্পত্তি, পাসপোর্ট-অস্ত্র-চাকুরি ভেরিফিকেশনের জন্য দশমিক ২৫ থেকে দশমিক ১০ পর্যন্ত নম্বর দেয়া হচ্ছে।
চোরাই রিক্সা থেকে মোটরগাড়ি পর্যন্ত উদ্ধারের জন্য দেয়া হচ্ছে সর্বোচ্চ তিন নম্বর। এক নম্বরে আছে জাল টাকা ও স্বর্ণ-রূপা। এর নিচে আছে নগদ টাকা, গরু-ছাগলের চামড়া, কিরিচ-ছোরা উদ্ধার।
জোনাল অফিসাররা নম্বর পাচ্ছেন মামলার তদন্ত নিষ্পত্তি, আসামি গ্রেফতার, মাদক-অস্ত্র উদ্ধার, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ও সভা আয়োজনের জন্য। গোপন তথ্য সংগ্রহ করে অভিযান পরিচালনায় সহায়তা, প্রতিদিনের ওয়াচ রিপোর্ট, সোর্স নিয়োগ, এজেন্ট নিয়োগ, ভেরিফিকেশনের জন্য নম্বর পাচ্ছেন বিশেষ শাখার কর্মকর্তারা।cmp
আসামি-সাক্ষী উপস্থাপন, নন জি আর মামলা পরিচালনা, জিআর মামলা উপস্থাপন, আলামত নিষ্পত্তি, মামলায় সাজার হারের উপর ভিত্তি করে নম্বর পাচ্ছেন কোর্ট অফিসাররা। পি আর স্লিপ, এফএম, জেলা প্যারেডের জন্যও আলাদা নম্বর আছে।
লাইসেন্সবিহীন গাড়ি জব্দ, আসামি গ্রেফতার, মামলার প্রেক্ষিতে জরিমানা আদায়ের জন্য নম্বর দেয়া হচ্ছে ট্রাফিক পরিদর্শক ও সার্জেণ্টদের।
নগরীর বায়েজিদ বোস্তামি থানার ওসি মোহাম্মদ মহসিন বলেন, নম্বরের ভিত্তিতে সাফল্য মূল্যায়নের নীতিমালা চালুর পর থেকে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে কাজের স্পৃহা বেড়েছে। প্রতিটি থানায় এখন অনেক বেশি কাজ হচ্ছে।
তবে নম্বরের ভিত্তিতে কার্যক্রম মূল্যায়নের বিষয়টি যাতে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখার অনুরোধ করেছেন চট্টগ্রাম মহানগর পিপি মো.ফখরুদ্দিন চৌধুরী।
‘নম্বর পাবার জন্য প্রতিযোগিতা বেড়েছে। এই প্রতিযোগিতার আবার নেতিবাচক-ইতিবাচক দুটো দিক আছে। নম্বর ও পুরস্কারের আশায় কেউ যেন অনৈতিক কোন কাজে জড়িয়ে না পড়ে সেইদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে।’

Leave a Reply

%d bloggers like this: