সাতক্ষীরায় ২ বছরে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার ৫৭

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : আতঙ্কে আছে সাতক্ষীরার মানুষ। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চলছে sadহয়রানি-নির্যাতন। সরকার দলীয় লোকজন পুলিশকে ব্যবহার করে বিরোধীদল দমনে রয়েছে সক্রিয়। প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হচ্ছে। একই সঙ্গে চলছে গ্রেফতারের নামে অর্থ বাণিজ্য। এমনকি আ’লীগের কোন কর্মী-সমর্থকের সঙ্গে ব্যবসায়িক লেনদেনে বাকবিতান্ডা হলে প্রতিপক্ষকে জেলের ঘানিটানতে হচ্ছে। কথা হয় পাটকেলঘাটার খলিষখালি ইউনিয়নের মঙ্গলানন্দকাটী গ্রামের মোকাম শেখের (৬৫) সাথে। সারাজীবন ধরে তিনি আ’লীগের রাজনীতির সাথে সরাসরি জড়িত। সেই সুবাধে বর্তমান সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য বিভাগে তার এক মাত্র ছেলে আব্দুস সবুরের চাকুরি হয়। গত মাসে তার ছোট মেয়ের স্বামীকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। স্থানীয় আ’লীগের নেতা সহ মোটা অংকের টাকা নিয়ে থানায় যায় মোকাম শেখ। কিন্ত পাটকেলঘাটা থানার ওসি জানায় গ্রেফতারের পর তার কিছু করার নেই। এক পর্যায়ে মোকাম শেখ বলতে বাধ্য হয় আলীগ করে কী করব? আমার জামায় তো কোন দল করে না। এক মাস জেলের ঘানিটেনে অর্ধলক্ষাধিক টাকা খরচ করে জামিন পায় সে। রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বাসিন্দা রড-সিমেন্ট ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম তাঁর একমাত্র ছেলে নাইমুল ইসলামকে নিরাপদে রাখতে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। ঢাকায় পাঠানোর কারণ ব্যাখ্যা করে সাইফুল বললেন, ‘ছেলের বয়স ৩০ বছর। কখন কার সঙ্গে দেখে ওকেও পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে। তারপর দেখা যাবে পায়ে গুলি খেয়ে পড়ে আছে।’ সাতক্ষীরার বিভিন্ন পেশার মানুষের মতে, একদিকে হরতাল-অবরোধের নাশকতার আশঙ্কা, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুলিশের অভিযানও ভীতি তৈরি করেছে। রাজনীতিবিদেরা তো এলাকায় থাকছেন না। গ্রেফতার-আতঙ্কে জেলার কয়েক হাজার মানুষ বাড়ি ছাড়া। ৬ জানুয়ারি থেকে বিএনপি-জামায়াতের হরতাল-অবরোধের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ধরনে পরিবর্তন এসেছে। এখন ‘বন্দুকযুদ্ধ’ বা ‘ক্রসফায়ারে’ নিহত হওয়ার চেয়ে পায়ে গুলিবিদ্ধ হচ্ছে বেশি। জেলার রাজনীতিবিদ ও সাধারণ মানুষের কাছে এটি নতুন আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের বেশির ভাগই বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। অবশ্য কয়েকজনের বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালান ও ডাকাতির অভিযোগ আছে। রাজনৈতিক কারণে নাশকতা ও সহিংসতা এবং পরবর্তীকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানের ঘটনায় গত দুই বছরে সাতক্ষীরা জেলায় ৫৭ জন খুন হয়েছেন, গুম হয়েছেন পাঁচজন। আর সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশি অভিযানে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন ২৪ জন। অবরোধ-হরতালের মধ্যে গত আড়াই মাসে অভিযানে একজন নিহত এবং নয়জনের পায়ে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গুলিবিদ্ধ দুজনের পা কেটে ফেলতে হয়েছে। বাকিদের পক্ষেও স্বাভাবিক চলাচল সম্ভব হবে না। সাতক্ষীরায় প্রতিদিনই গড়ে ৪০ থেকে ৫০ জন আটক হচ্ছেন। এর মধ্যে রাজনীতির কারণে আটক হচ্ছেন ৮ থেকে ১০ জন। বাকিরা অন্যান্য কারণে। সাতক্ষীরায় তিন শ‘র বেশি মামলা আছে। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি কয়েক হাজার। ফলে গ্রেফতার যে কাউকে কোনো একটি মামলায় আসামি করা হচ্ছে। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সদর উপজেলার শহিদুল নামে এক ব্যক্তি পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধ চলাকালে পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। শহিদুল বিএনপির কর্মী বলে দলটি দাবি করেছে। তবে দল বা অঙ্গসংগঠনের শহিদুলের কোনো পদ ছিল না। তাঁর দুই পায়ের অবস্থাই খারাপ। কলারোয়া উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি আবদুল মজিদ পায়ে গুলিবিদ্ধ হন। তার বা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। ফারুক হোসেন নামে অপর এক ব্যক্তির পা গুলিবিদ্ধ হওয়ার কারণে কাটা পড়েছে। কলারোয়ার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা আনোয়ার বেগম বলেন, ‘আমরা স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে চাই। ভয়-আতঙ্ক নিয়ে চলতে ভালো লাগে না। দুই বছর ধরে এই জেলার মানুষ স্বাভাবিক অবস্থার মধ্যে নেই।’ অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও পুলিশী হয়রানির মুখে রাজনৈতিক সঙ্কটে রয়েছে সাতক্ষীরায় বিএনপি-জামায়াত। অন্যদিকে রাজপথে খোশমেজাজে আছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এমনটাই মনে করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। বিএনপি-জামায়াত নেতাদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও পুলিশের বাধার মুখে তারা রাজপথে নামতে পারছেন না। রাজনৈতিক পরিবেশ ফিরে এলে অবশ্যই তারা মাঠের আন্দোলনে সরব হবেন। তবে ওই দুই দলের অভিযোগ সরাসরি নাকচ করেছে আওয়ামী লীগ ও পুলিশ। আওয়ামী লীগের দাবি, তারা বিরোধী রাজনৈতিক দলকে রাজপথে নামতে কোনো বাধা দিচ্ছে না। পুলিশও আওয়ামী লীগের সুরে সুর মিলিয়ে বলছে, বিএনপি-জামায়াতের কোনো নেতাকর্মীকে হয়রানি বা গ্রেফতার করা হচ্ছে না। তবে যারা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত তাদের ছাড় দেওয়া হবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, দীর্ঘ ১০ বছর পর সম্মেলনের মাধ্যমে জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা হওয়ায় সংগঠনটির নেতাকর্মীরা এখন রয়েছে খোশমেজাজে। তাই কেন্দ্র ঘোষিত কর্মসূচিতে রাজপথে দেখা যাচ্ছে তাদের। চলতি বছরের ৭ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। বর্তমান কমিটির সভাপতি মনসুর আহম্মেদ ও সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম। এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘কমিটি গঠনের পর নেতাকর্মীরা এখন অনুপ্রাণিত। তারা নতুন করে শক্তি ও সাহস সঞ্চার করে ঘুরে দাঁড়িয়েছেন।’ বিরোধী দলকে মাঠে নামতে দেওয়া হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হলেও বিএনপি-জামায়াতের নেতারা নিজেরা মাঠে থাকেন না। তাদের কোনো কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া হয় না।’ এ ব্যাপারে জেলা বিএনপির সভাপতি রহমাতুল্লাহ পলাশ জানান, নেতাকর্মীদের বিপদে ফেলে তো আর রাজনীতি করা যায় না। পরিবেশ পেলে কে না রাজনীতির মাঠে থাকতে চায়। সময় হলে অবশ্যই তারা মাঠে থাকবেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। পুলিশ জানায়, ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারির পর জামায়াত-শিবির জেলাজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা চালায়। এ সময় আওয়ামী লীগের ১৭ জন নেতাকর্মীকে কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যা করা হয়। শতাধিক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি-ঘর ব্যবসা-প্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়। এ দাবি আওয়ামী লীগের। এসব অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা জামায়াতের এক সিনিয়র নেতা জানান, জামায়াত-শিবিরের হাতে কেউ নিহত হয়নি। বরং তাদের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মীকে পুলিশ ও আ’লীগ হত্যা করেছে। ২০ দলীয় জোটের অধিকাংশ নেতাকর্মীকে নানাভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি। কারাগার সূত্রে জানা গেছে, সাতক্ষীরা কারাগারের ধারণ ক্ষমতা ৪০০ জনের। কিন্তু এখন চারগুণ বন্দী থাকছেন সব সময়। সর্বশেষ বৃহস্পতিবারের (৩ এপ্রিল, ২০১৫) হিসেব অনুযায়ী বন্দীর সংখ্যা ১ হাজার ৪৭০ জন। এ ব্যাপারে জেলা জামায়াতের প্রচার সম্পাদক এস এম আজিজুর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ এখন বাকশালী চরিত্রে আবির্ভূত। তারা বিএনপি-জামায়াত কেবল নয় কোনো রাজনৈতিক দলকে মাঠে নামতে দিচ্ছে না। পুলিশকে ব্যবহার করে বিরোধী পক্ষকে দমনপীড়ন করছে। যেটি কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের চরিত্র হতে পারে না। ’নতুন নতুন মামলা আবিষ্কার করে জনপ্রিয় নেতাকমীদের গ্রেফতার করছে। তিনি দাবি করেন, এ পর্যন্ত তাদের ৩৩ জন নেতাকর্মীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে জীবন দিতে হয়েছে। দেড় শতাধিক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। এখনো অনেক নিরীহ লোককে ধরে হয়রানি করা হচ্ছে। তাদের অনেক নেতাকর্মী মামলা-হামলার ভয়ে পলাতক জীবনযাপন করছেন। এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার (এসপি) চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর বলেন, ‘পুলিশ রাজনৈতিক দলের কোনো নেতাকর্মীকে হয়রানি বা গ্রেফতার করছে না। যারা সহিংসতার সঙ্গে যুক্ত তাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। ’কর্মসূচি পালনে পুলিশের বাধা প্রসঙ্গে তিনি জানান, জেলা বিএনপির সভাপতি থাকেন ঢাকায়। সাধারণ সম্পাদক থাকেন নিজের ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে। তাদের তো পুলিশ কখনো মাঠেই দেখেনি। হয়রানি তো দূরের কথা। এসপি বলেন, ‘কোনো কর্মসূচিতে পুলিশ হয়রানি করলে তারা আমাদের বিরুদ্ধে দোষ চাপাতে পারতেন।’ কিন্তু নিজেরা মাঠে না থেকে পুলিশের ঘাড়ে দোষ চাপানো ঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। সাতক্ষীরার পুলিশ সুপার চৌধুরী মনজুরুল কবির আরো বলেন, সাতক্ষীরা অনেকটা বিচ্ছিন্ন দ্বীপ হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থা থেকে শান্ত পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনা হয়েছে। যৌথ বাহিনীর অভিযান হয়েছে। তাদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে অনেক সন্ত্রাসীই মারা পড়েছে। সূত্র : শীর্ষ নিউজডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*