সম্ভাবনাময় দোহাজারীকে জেলা করা এখন সময়ের দাবী

কামরুল হুদা :Kamrul-pic-1 সম্ভাবনাময় দোহাজারীকে জেলা করা এখন সময়ের দাবী। দক্ষিণ চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায়ী এলাকা দোহাজারী। দোহাজারীতে হেড কোয়ার্টার করে একটি নতুন জেলা এখন সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর প্রয়োজনের তাগিদে দোহাজারীকে জেলা করা এখন সরকারের একান্ত প্রয়োজন বলে সচেতন জনগণ মনে করেন। কারণ ১৯৮৪ সনে সিপিডিএ-১১১/১ (২)/৮৪ স্মারকে গঠিত জেলা, উপজেলা/ থানার সীমানা নির্ধারণ কমিশন চট্টগ্রামে আরো একটি নতুন জেলা গঠনের সুপারিশ করে, স্থানীয় দাবীর প্রেক্ষিতে। উক্ত সুপারিশের ভিত্তিতে সাবেক মন্ত্রি পরিষদ সচিব এম. এম. জামান প্রশাসন পুনর্গঠন সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি (নিকার)’র সভায় যে সার সংক্ষেপটি পেশ করেন তার পরিশিষ্ট-ডি-এর ০৫ নম্বর প্রস্তাবে (পৃষ্ঠা-২৭) দোহাজারীকে সদর দপ্তর করে দক্ষিণ চট্টগ্রমে একটি নতুন জেলা সৃষ্টির প্রস্তাব/ সুপারিশ করেন। প্রস্তাবে দক্ষিণ মহকুমার ৭ টি উপজেলার মধ্যে কর্ণফুলী নদী তীরবর্তী আনোয়ারা, কর্ণফুলী, বোয়ালখালী বাদ দিয়ে পটিয়া, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালী এই পাঁচটি থানা নিয়ে নতুন জেলা গঠনের কথা বলা হয়েছিল। বিভিন্ন বাঁধার মুখে দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলায় উন্নীত হতে পারেনি, এখন একটি নতুন জেলা করা সরকারের পক্ষে কোন ব্যাপারও নয় বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন। এখন এলাকার সর্ব মহলে দাবী উঠেছে অন্তত পক্ষে দোহাজারীকে জেলা হেড কোয়ার্টার করে দক্ষিণ চট্টগ্রামে একটি নতুন জেলা করে এই এলাকার উন্নয়নে বর্তমান সরকার এগিয়ে আসবেন। Dohazari-7
প্রায় দেড় হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তন ও ৩০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত দক্ষিণ চট্টগ্রামকে (৫ উপজেলা) জেলায় উন্নীত করা হচ্ছে না। ফলে ব্যাহত হচ্ছে, সাধারণ প্রশাসন, ভূমি প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন বা অপরাধ নিয়ন্ত্রণ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজ সেবার কার্যক্রম এবং বিচারিক কাজ। চট্টগ্রাম মহানগর এখন জনভারে জর্জরিত। গ্রামে ব্যবসা বা কাজ না থাকায় মানুষ শহরে ভীড় করছে। এই বিবেচনাতেও দক্ষিণ চট্টগ্রামকে পৃথক জেলা করে চট্টগ্রাম মহানগরকে ভারমুক্ত এবং গ্রামে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে অবিলম্বে জেলা ঘোষণার উদ্যোগ গ্রহণ এখনই জরুরী।
মন্ত্রিপরিষদের প্রস্তাবনা অনুযায়ী দক্ষিণ চট্টগ্রামকে জেলা ঘোষণার ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্বীয় অভিব্যক্তি প্রকাশ করছি যে, দোহাজারীকে জেলা সদর করে পটিয়ায় জেলা জজ কোর্ট স্থাপন এবং বাঁশখালী উপজেলার সাথে যোগাযোগ সহজ করার জন্য সাতকানিয়া কেরাণীহাট থেকে বাঁশখালী পর্যন্ত রাস্তাটিকে সুপ্রশস্ত করা হউক যাতে যাতায়াতকালে সময় কম লাগে। কেননা, সরকার উক্ত দুই উপজেলার জনসাধারণকে এই দুইটি বিষয়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক নিশ্চয়তা প্রদান করলে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে জেলা ঘোষণার অন্তরায় দূরীভূত হতে পারে।Dohazari-6
নতুন জেলা সৃষ্টির প্রয়াসকে বাঁধাহীন করতে এর কাঠামো থেকে পশ্চিম পটিয়ার একাধিক ইউনিয়ন নিয়ে কর্ণফুলী থানা অথবা চানখালী খালকে চিহ্নিত করা যায় নতুন জেলার উত্তর সীমানার শেষাংশ হিসেবে। এই পর্যায়ে নতুন জেলায় আয়তন হবে দেড় হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তন ও ৩০ লাখ জনসংখ্যা।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে সংসদীয় আসন-৪টি, উপজেলা-৫টি, ইউনিয়ন-৬৯টি, মৌজা/ গ্রাম-৪১৮টি, প্রধান সড়ক পথ হবে চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়ক (এশিয়ান হাইওয়ে) রেলপথ চট্টগ্রাম-দোহাজারী ও নৌপথ বা বন্দর হবে শঙ্খ নদী (বান্দরবান-দোহাজারী- বঙ্গোপসাগর রুট)।Dohazari-5
প্রায় ৫শ বছরের পুরনো উপ-শহর দোহাজারীকে পাশ কাটিয়ে বিভিন্ন সময়ে অনেক থানা-উপজেলা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণ চট্টগ্রামের দোহাজারীকে বরাবরই অবহেলা করা হচ্ছে। ১৯৮৫ সালে তৎকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দোহাজারী নামে একটি নতুন উপজেলা গঠনের প্রস্তাব দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করে। পরবর্তীতে ওই বছরের ১১ আগস্ট চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এ বিষয়ে শুনানি হয়। এতে কমিশন দোহাজারীকে উপজেলায় উন্নীত করার সুপারিশ করেন। একই বছর তা বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি ‘দোহাজারী উপজেলা’ গঠন সংক্রান্ত প্রস্তাব সুপারিশ ও অনুমোদন করে। পরে এ ব্যাপারে সরকারি গেজেট নোটিফিকেশন প্রকাশ করা হলেও এখনো দোহাজারীকে উপজেলা রূপান্তর করা হয়নি।Dohazari-4
উল্লেখ্য, মোগল শাসনামলের ১৬৬৬ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪৩ এর ২য় বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৭১ সনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকালে দোহাজারী এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। সুবে বাংলার উপ-অধিনায়কের দুর্গ ছিল দোহাজারীতে। একই ধারাবাহিকতায় ২য় বিশ্বযুদ্ধের সময়কালেও দোহাজারী ছিল ব্রিটিশের পূর্বাঞ্চলীয় প্রধান সামরিক ঘাঁটি। তদানীন্তন পাকিস্তান শাসন আমল ১৯৬৭ সালে পরিচালিত এক জরিপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার ‘চট্টগ্রাম (সদর) দক্ষিণ মহকুমা’ কার্যালয় সদর থেকে দোহাজারীতে স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবের ভিত্তিতে দোহাজারীকে থানায়/ উপজেলায় উন্নীত করা এখন প্রক্রিয়াধীন বলে জানা যায়। সর্বশেষ মন্ত্রী পরিষদের প্রস্তাবের ভিত্তিতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৫টি থানা ও উপজেলা নিয়ে একটি নতুন জেলা গঠন এবং উহার সদর দফতর দোহাজারীতে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে খবরে প্রকাশ।
দোহাজারী বাংলার প্রাচীনতম জনপদ। পুরো বঙ্গের ইতিহাসে দোহাজারীর ইতিহাস জড়িত। আজকের প্রতিষ্ঠিত জনপদের ন্যায় দোহাজারীর ছিল ঐতিহ্য ও গৌরব। যেখানকার যোদ্ধাদের গর্জনে এক সময় দোহাজারী থেকে আজকের মায়ানমার (বার্মা) পর্যন্ত কম্পিত হতো।Dohazari-3
বাংলার শাসনকর্তাদের ইতিহাস আজ এ প্রজন্মের অনেকে জানে না। প্রাচীন চট্টগ্রামের ইতিহাসে বিশেষ উল্লেখযোগ্য ব্যাক্তি হিসেবে আঁধু খাঁ’র নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখা থাকবে। তাঁর পুত্র শেখ জামাল খাঁ ও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। আঁধু খাঁ’র পিতা ছিলেন সর্দার বাহার খাঁ। আঁধু খাঁ’র সহোদর নবাব মোজাফফর খাঁ ১৬৮৮ সালে চট্টগ্রামের শাসক ছিলেন। মোঘল শাসনামলে চট্টগ্রাম থেকে টেকনাফ পর্যন্ত আঁধু খাঁ ও তাঁর বংশধরগণ এর নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বাংলার সুবেদার নবাব শায়েস্তা খাঁ শঙ্খ নদীর তীরে দূর্গ স্থাপন করেন। দুই হাজার সৈন্যের সেনাপতি আধু খাঁ ও লক্ষন সিংহ ছিলেন দূর্গের অধ্যক্ষ। সেনাপতি আধু খাঁ ও লক্ষন সিংহ উভয় হাজারী সেনাপতির দায়িত্বে দূর্গের ভার অর্পন করা হয়। পরবর্তীতে দুই সেনাপতির দূর্গকে কেন্দ্র করে ঐ এলাকার নামকরণ হয়ে যায় দো-হাজারী। আরকানীরা নদীর দক্ষিণ দিকে অবস্থান করে প্রায়ই আক্রমন করত। আধু খাঁ আরকানীদের হামলা প্রতিহত করতে শঙ্খ নদীর উত্তর তীরে দূর্গ নির্মাণ করেন। দূর্গটি দোহাজারী রেল স্টেশন হতে ১ মাইল পূর্বে নদীর উত্তর পাড়ের কিল্লাপাড়ায় অবহেলায় অনাদরে পড়ে আছে। প্রাচীন দোহাজারীর পশ্চিম পাশে ২য় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বিমান বন্দর, দোহাজারী চাগাচর এ. রহমান বাড়ীর পাশে ফজর আলী খাঁ প্রতিষ্ঠিত আধু খাঁ’র মসজিদ, দোহাজারী অস্ত্রাগার (বারুদ খানা), যুদ্ধের সৈন্য দূর্গ’র প্রাচীন অংশ ও রাশিয়ার ফিল্ড উল্লেখযোগ্য। Dohazari-2
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলে মুসলিম জনবসতি, স্থাপন ও স্থাপনা, এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, রাস্তাঘাট, দীঘি, মসজিদ, হাট-বাজার প্রতিষ্ঠা, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা, আরকানি দস্যুদের চিরদিনের মত বিতাড়িত করে সুবাহ বাংলার অন্যতম সমৃদ্ধশালী নগর প্রতিষ্ঠা ও দোহাজারী সহ লোহাগাড়ায় কেল্লা নির্মাণ করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।
আধু খাঁর পুত্র শের জামাল খাঁ ১৭৫৬ সালে আরাকানিদের তুমুল যুদ্ধে পরাজিত করেন ও নাফ নদী পর্যন্ত মোঘল সাম্রাজ্যভুক্ত করেন। এর পূর্বে দোহাজারী পর্যন্ত ছিল চট্টগ্রামে সুবাহ বাংলার সীমানা। মোঘল সেনাপতি আধু খাঁ’র সহোদর নবাব মোজাফফর খাঁ ছিলেন চট্টগ্রামের মোঘল শাসক (১৬৮৮ সালে)। জানা যায় তারা দু’ভাই সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে উত্তর ভারতের রোহিলা খণ্ডের পাঠান বংশীয় সর্দার বাহাদুর খাঁর পুত্র ছিলেন। আধু খাঁ দোহাজারীকে একটি সমৃদ্ধ জনপদ ও নগরীতে পরিণত করেছিলেন। ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-সাহিত্যে দোহাজারী খ্যাতি লাভ করে। এখানে অনেক মসজিদ, প্রাসাদ নির্মিত হয়, সে যুগের প্রথা অনুযায়ী কবি-সাহিত্যিকদের আগমনে রাজসভার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। শঙ্খ নদীর তীরবর্তী দোহাজারী ছিল প্রাকৃতিক সোন্দর্যমণ্ডিত একটি অনুপম স্থান, যাকে মধ্যযুগের প্রখ্যাত কবি নসরুল্লাহ খাঁন তাঁর শরীয়তনামা কাব্যে দোহাজারীকে স্বর্গের সাথে তুলনা করেছেন। Dohazari-1
দক্ষিণ চট্টগ্রামের মত স্ট্র্যাটেজিক জায়গা পৃথিবীর কোথাও নেই, এটাকে ধারণ করে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে বিশ্বমানের পর্যটন নগরী হিসাবে গড়ে তুললে দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামকে স্পেসিফিক স্পেশিয়াল জোন হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। সোলার প্যানেল বসিয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে গ্রীণ টাউনে পরিণত করলে এ এলাকার জনগণ উপকৃত হবে। দক্ষিণ চট্টগ্রামকে নিয়ে ষড়যন্ত্র চলছে, এটা থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এলাকা এই দক্ষিণ চট্টগ্রাম, এই বঙ্গোপসাগরের নীচে আছে প্রচুর তৈল ও গ্যাস। দক্ষিণ চট্টগ্রাম হল বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবেশ দ্বার।
দক্ষিণ চট্টগ্রামে প্রচুর অর্থনৈতিক সম্ভাবনা থাকলেও উদ্যোগের অভাবে সেগুলোকে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এত উর্বর মাটির দেশ দুনিয়ার অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেই মাটি এবং কোটি কোটি হাত বা শ্রম শক্তি আজ অবসাদে অকর্মণ্য হয়ে আছে। তাই আমরা আশা করব, দেশ ও দশের স্বার্থে সরকার অবিলম্বে দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার গোড়াপত্তন করতে উদ্যোগী হবেন, মন্ত্রিপরিষদের প্রস্তাব ও সুপারিশের ভিত্তিতে। লালুটিয়া ও হাতিয়াখোলায় প্রচুর খাস ভূমি সমৃদ্ধ পর্যটন অঞ্চলে জেলা সদর স্থাপিত হলে এটি হবে ভারতের দার্জিলিংয়ের মত একটি উন্নত জনপদ।sangu
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার জাতীয় মহাসড়ক শঙ্খ নদীর উপর নির্মিত দোহাজারী সেতুর উভয় তীরে সাতকানিয়া ও চন্দনাইশ উপজেলাধীন সড়ক সংলগ্ন এলাকায় জেলা পর্যায়ের অন্যান্য কার্যালয় স্থাপিত হলে জনগণের জন্য সুবিধাজনক হবে। উল্লেখ্য যে, দোহাজারী সড়ক বিভাগ ও দোহাজারী হাইওয়ে পুলিশ থানার অধিক্ষেত্র কর্ণফুলী সেতুর দক্ষিণ তীর এবং চিরিঙ্গা সেতুর উত্তর সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃত। দক্ষিণ চট্টগ্রাম এলাকার বনাঞ্চল নিয়ে ‘দক্ষিণ বন বিভাগ’ নামে জেলা পর্যায়ের পৃথক একটি বিভাগ সৃজন করা হয়েছে যার অধিক্ষেত্র অনুরূপ, পূর্বে অবস্থিত বান্দরবান পার্বত্য জেলা বনবিভাগ।
বিদেশি পর্যটক টানতে দোহাজারী জেলায় এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন গড়া যেতে পারে। কক্সবাজারের মত দোহাজারীতে এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন স্থাপন করলে দোহাজারী হয়ে উঠবে দুবাই শহর। তখন বিভিন্ন দেশ থেকে চাকুরী করার জন্য মানুষ ছুটে আসবে চট্টগ্রামের দোহাজারীতে। অন্যদিকে দোহাজারী শংখ নদীর দু’পাশে জেটি নির্মাণ করলে, ব্যবসা বাণিজ্যের দ্বার আরো উম্মেচিত হবে। দোহাজারি থেকে কক্সবাজার হয়ে বান্দরবানের ঘুমধুম পর্যন্ত রেললাইন স্থাপন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার জেলার পর্যটন স্পটগুলোকে সার্কুলার রোডের মাধ্যমে সংযুক্ত করাও একান্ত প্রয়োজন। Dohazari-Rail-Line
দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০০৯ সালের ১৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ১৮টি নতুন পৌরসভার ঘোষণা দেয়া হয়। এর মধ্যে দক্ষিণ চট্টগ্রামের দোহাজারীর নামও রয়েছে। সংসদ অধিবেশনে বিষয়টি উত্থাপনের পর দোহাজারী এলাকার জনসাধারণের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে। গত ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব শাহীন আকতার স্বাক্ষরিত এক স্মারক কপি জেলা প্রশাসক, চট্টগ্রাম বরাবরে প্রেরণ করেন। সেখানে প্রস্তাবিত এলাকার মোট লোকসংখ্যা, প্রতি বর্গকিলোমিটারের লোকসংখ্যা, প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ, অকৃষিজীবী, অধিবাসীর শতকরা হার, অকৃষি প্রকৃতির জমির শতকরা হার, সুস্পষ্ট তফসিল (ইউনিয়নের নাম, মৌজার নাম, জে এল নং, দাগ নং গুলো সংক্ষিপ্ত আকারে) স্ক্র্যাচ ম্যাপসহ, বিগত তিন বছরের গড় রাজস্ব আয়, দাগ নম্বরগুলো পরস্পর সংযুক্ত কিনা? এবং এলাকাটি সেনানিবাস বহির্ভূত কিনা ইত্যাদি তথ্য মতামতসহ প্রেরণের জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করেন। উল্লেখ্য, বিগত ১৯৯৬-২০০১ সনে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রয়াত রাষ্ট্রপতি আলহাজ মো. জিল্লুর রহমান স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী থাকার সময় গত ২০০১ সালের ১৫ মে এক জনসভায় দোহাজারীকে পৌরসভায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন; কিন্তু সরকারের মেয়াদের শেষ প্রান্তে এ প্রতিশ্র“তির বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে ৪ দলীয় ঐক্যজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। তৎকালীন স্থ্ানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর সে ঘোষণার ফলশ্র“তিতে বর্তমান শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার দোহাজারীকে পৌরসভায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ৫টি ইউনিয়ন নিয়ে আলাদা উপজেলা করার জন্যও দাবি উঠেছিল। Dohazari
দোহাজারী পৌরসভার সীমানার মধ্যে দোহাজারী ইউনিয়নের দোহাজারী, চাগাচর, রায় জোয়ারা, জামিজুরী, হাতিয়াখোলা, দিয়াকুল, সাতবাড়ীয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড (হাছনদণ্ডী), কালিয়াইশের কাটগড় (১ ও ২নং ওয়ার্ড)। এ সব এলাকায় মোট জনসংখ্যা ৫৫ হাজার ৯১৪ জন। প্রতি বর্গকিলোমিটার লোকসংখ্যা ২ হাজার ৩২৯ জন, প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ ও অকৃষিজীবী ৭০ শতাংশ, অকৃষি প্রকৃতি জমির শতকরা হার ৪৪৪৫.৬২, বিগত তিন বছরের গড় রাজস্ব আয় দোহাজারী ২০ লাখ, কালিয়াইশ ৩ লাখ ৯০ হাজার, সাতবাড়ীয়া ৪ লাখ, সেনানিবাস বহির্ভূত, পৌর এলাকার মোট আয়তন ৫ হাজার ৯৩৩ একর বা ৯.২৮ বর্গমাইল বা ২৪.২০ কিলোমিটার। দোহাজারী আলাদা পৌরসভা, উপজেলা ও জেলা হলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অফিস দোহাজারীতে আগে থেকেই রয়েছে, সেগুলো হচ্ছে দোহাজারী সড়ক বিভাগ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগ, দোহাজারী হাইওয়ে (পুলিশ থানা), আন্তর্জাতিক ডেকা চেইন রেড স্টেশন, দোহাজারী ১৩২/ ৩৩ কেবি বিদ্যুৎ সাব স্টেশন, ৩১ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, সিভিল সাপ্লাই/ খাদ্য গুদাম, বিএডিসি, সার, বীজ ও যান্ত্রিক প্রকৌশল স্থাপনা, দোহাজারী ভূমি অফিস, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ, আখেরি রেল স্টেশন দোহাজারী, ব্যাংক, বীমা কার্যালয়, একটি ডিগ্রী কলেজ, একাধিক উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদরাসা, লবণ ক্র্যাশিং মিল, কাঠ প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প ও হস্তশিল্প, নতুন মডেলে দোহাজারী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন রয়েছে। তা ছাড়া দোহাজারী কাঠের জন্য প্রসিদ্ধ বিধায় দোহাজারীতে একটি কাগজের কল/ পেপার মিল, একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপিত হওয়ার সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে।
সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা ফেলে দোহাজারী পর্যটন নগরী হয়ে দুবাই শহরে পরিণত হবে। তখন পর্যটকদের আকর্ষণ করবে এই দোহাজারী। তবে এই শহরের কিছু কিছু অঞ্চলের সৌন্দর্য পর্যটকদের বিশেষভাবে কাছে টানে, বার বার সেখানে যেতে অনুপ্রাণিত করে। এমনই একটি এলাকা লালুটিয়া পাহাড়। দোহাজারীর লালুটিয়া পাহাড় বাংলাদেশের একমাত্র শহর যার সাথে বার্মা ও ভারতের অভিন্ন সীমান্ত আছে। এর চতুর্দিক ঘিরে রয়েছে সবুজ অরণ্য আচ্ছাদিত উঁচু-নিচু পাহাড়, স্বচ্ছ জলরাশি, খাড়া পাহাড় থেকে প্রবাহিত ঝর্ণা ও ছড়া। এখানে পাখপাখালি ও ঝর্ণার কলতানে ছন্দমুখরিত প্রকৃতির মনমাতানো স্নিগ্ধরূপ যে কোন সৌন্দর্য পিপাসু মানুষের হৃদয়কে আলোড়িত করে তোলে। Dohazari-0
এই অনিন্দ্য সুন্দর দোহাজারীতে পর্যটন শিল্প বিকাশের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু এখানে যে দর্শনীয় স্পট আছে তা অনেকের অজানা। যে কারণে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক দোহাজারীর নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এখানকার সবুজ পাহাড়ের উপর নীল আকাশে সূর্যাস্তের রক্তিম কিরণ এবং গোধূলি লগ্নে স্বচ্ছ জলের উপর তার প্রতিফলনের দৃশ্য সত্যিই দেখার মত।
দোহাজারীতে রয়েছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। তাদের বিচিত্র জীবন প্রণালী, এলাকার রমণীদের হাতেবোনা আকর্ষণীয় কাপড় ও পাহাড়িদের আবাসস্থল মাচারবাড়ির স্থাপত্য শৈলী দেখে যে কেউ অভিভূত হবেন।
ইঞ্জিন চালিত বোটে সাঙ্গু নদীর উভয় পাশের প্রকৃতির অপূর্ব রূপ। দুই ধারে সবুজ গাছপালায় ছাওয়া পাহাড়, পাহাড়ি ছড়া দেখতে দেখতে নৌকা ভ্রমণের মজাই আলাদা। পাহাড়ের গায়ে কখনো বা কলাগাছ, কখনো বাঁশ ঝাড়, লেকের ধার ঘেঁষে কাশের ঝোপ। দেখা যাবে নদীর দু’পাশে নৌকাগুলো কখনো মানুষ পারাপার করছে, কখনো বন থেকে আহরিত কাঠ বা লেক থেকে ধরা মাছ বয়ে নিয়ে যাচ্ছে। দূর থেকে দোহাজারী সদরকে দেখে মনে হবে ছবির মত একটা অপূর্ব শহর।
দোহাজারী সদরের সাথে লাগোয়া সাঙ্গু নদীর উপর নির্মিত সেতুতে দাঁড়িয়ে দর্শনার্থীরা স্বচ্ছ জলরাশি ও সবুজ পাহাড়ের দৃশ্যাবলী অবলোকন করে। সাঙ্গু নদীতে চলা অবিরাম পানি চলার দৃশ্য দেখতে দেখতে হৃদয়-মন হারিয়ে যায় সেই অপরূপ নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে। d-8
প্রকৃতির আদিম অকৃত্রিমতায় যে কারো চমৎকার সময় কাটবে এই দোহাজারীতে। তবে পর্যটকদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে হোটেল, মোটেল ও রেস্ট হাউস নির্মাণ এবং লালুটিয়ায় যাবার ব্যবস্থা করা অত্যাবশ্যক। সড়ক নির্মাণ করে গাড়ি চলাচলের উপযোগী করা হলে দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটকের আগমন ঘটবে দোহাজারীতে।
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর দোহাজারী ও আশেপাশের এলাকাগুলো মুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে হানাদারমুক্ত হয় পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের ৫টি থানা। দোহাজারীতে সংগঠিত পাক হানাদার বাহিনীর সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের দু’দিন ব্যাপী সম্মুখ সমরের পর ১৪ ডিসেম্বর দুপুরে হানাদার বাহিনী পালিয়ে গেলে ঐদিনই দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি থানার সর্বত্র উত্তোলন করা হয় বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকা। মুক্ত হয় পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রাম। কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ তীর পটিয়া থানা থেকে শুরু হয়ে চকরিয়া থানার সীমানা পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ এলাকার তৎকালীন d-9পাঁচটি থানা বোয়ালখালী, আনোয়ারা, পটিয়া, সাতকানিয়া ও বাঁশখালী (বর্তমানে ৭টি) ১৯৭১ সালে প্রায় পুরো ৯ মাস পাক হানাদারবাহিনী কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত ছিল। ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর দখল থেকে বৃহত্তর দোহাজারী মুক্ত হওয়ার সাথে সাথে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি থানা (তখন বর্তমান কক্সবাজার জেলা দক্ষিণ চট্টগ্রামের অংশ ছিল) সম্পূর্ণরূপে শক্রমুক্ত হয়। এর আগে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ আক্রমণের সাথে গেরিলা বাহিনীর মরণ পণ আঘাত বিভিন্ন থানায় হানাদার বাহিনীর গড়ে তোলা আস্তানাসমূহ আক্রান্ত হতে থাকে। সেপ্টেম্বর অক্টোবরের প্রথম দিকে প্রতিটি থানায় মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর আক্রমণ জোরদার হয়ে উঠলে পাকবাহিনী তাদের মনোবল হারিয়ে ফেলে। ফলে সেপ্টেম্বর অক্টোবর মাসের শেষ দিকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েকটি থানা বিশেষ করে আনোয়ারা, বাঁশখালী মুক্ত হয়ে যায়। এই দুটি থানা হানাদারমুক্ত হলেও চট্টগ্রাম কক্সবাজার মহাসড়কসহ মূল তিনটি থানা সাতকানিয়া, পটিয়া ও বোয়ালখালীর নিয়ন্ত্রণভার পাকবাহিনীর হাতেই ছিল এবং তা দোহাজারীতে দুইদিনের সম্মুখ যুদ্ধ পর্যন্ত বলবৎ ছিল। মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই পাকবাহিনী দোহাজারীকে ঘিরে দুর্ভেদ্য রক্ষণব্যুহ গড়ে তোলে। যাতে করে পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা যায়।d-10 দোহাজারীতে স্থল, রেল, নৌ ও আকাশপথের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সড়ক বিভাগের কার্যালয়টিকে তাদের প্রধান অফিস হিসাবে বেছে নেয়। একই সাথে পাশাপাশি অবস্থিত সাঙ্গুভ্যালি টিম্বার ইন্ডাস্ট্রিজের বাংলোকে ভিআইপি রেস্ট হাউজ বানিয়ে এবং উক্ত কারখানার বিশাল মাঠকে হ্যালিপ্যাডে রূপান্তরিত করে তাদের দুর্গ গড়ে তোলে। একইভাবে দেওয়ানহাট বিএডিসি কার্যালয়, দোহাজারী উচ্চ বিদ্যালয়, দোহাজারী বিদ্যুৎ ভবনকে ব্যারাকে পরিণত করে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পুরো এলাকায় নির্বিচারে নির্যাতন, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যেতে থাকে। সেপ্টেম্বর অক্টোবরে যখন পাকবাহিনী মুক্তিবাহিনীর আক্রমণে বিভিন্ন থানা থেকে পিছু হটে আসতে থাকে তখন পাক হানাদার বাহিনী তাদের এ দেশীয় দালাল রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনীর সহযোগিতায় ভয়ংকর আক্রোশে পটিয়া সাতকানিয়ার নিরীহ জনগণের ওপর ঝাপিয়ে পড়ে। দালাল বাহিনীর সদস্যরা গ্রামে গ্রামে বিশেষ করে হিন্দু প্রধান এলাকায় গিয়ে ধরে নিয়ে আসতো নিরীহ যুবক যুবতীদের। মুক্তিবাহিনীর চর অজুহাতে ধরে আনা যুবকদের পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হতো। আর মহিলাদের উপর চালানো হতো পাশবিক নির্যাতন। মুক্তিযোদ্ধা অজুহাতে কত বাসযাত্রীকে নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যা করা হয়েছে তার হিসাব পাওয়া দুষ্কর। সে সময় রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল খরস্রোতা শঙ্খনদীর পানিও। এরিই মধ্যে ১১ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর একটি দল শঙ্খ নদীর দক্ষিণপাড়ে কাটগড়, কালিয়াইশ এলাকায় পাকবাহিনীর পরিত্যক্ত ব্যাংকারগুলোর দখল নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ক্যাপ্টেন গুরুংয়ের নেতৃত্বে মিত্রবাহিনীর একটি দল এবং বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) কমান্ডার ইঞ্জিনিয়ার সিদ্দিক আহমদ, সদ্য প্রয়াত ডাঃ বি এম ফয়েজুর রহমান (এমএলএ), প্রাক্তন ছাত্রনেতা প্রয়াত আবুল কাসেম সন্দ্বীপের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের আরো একটি দল যৌথভাবে এসে অগ্রবর্তী মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে যোগ দিয়ে হানাদার বাহিনীর উপর আক্রমণের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। ১২ ডিসেম্বর বিকেল থেকে মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর যৌথ দল সকালে শঙ্খনদীর অপর পাড়ে দোহাজারী উপশহরে অবস্থানরত পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ শুরু করে। এসময় পাকবাহিনীও সমানে জবাব দিতে থাকে। এভাবে বিরামহীন যুদ্ধ চলার পর ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বেলা ২টার দিকে পাকবাহিনী তাদের সব সরঞ্জাম ফেলে সদলবলে পালিয়ে যায়। তিনদিনের এই সম্মুখ সমরে মুক্তিযোদ্ধাদের বড় ধরনের কোন ক্ষয়ক্ষতি না হলেও নিহত হয় হানাদার বাহিনীর ৯ সদস্য (কারো কারো মতে আরো বেশী)। পাক হানাদার বাহিনী যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে দোহাজারী থেকে পালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে মুক্ত হয়ে যায় দোহাজারীসহ পুরো (কক্সবাজার ছাড়া) দক্ষিণ চট্টগ্রাম। সাথে সাথে মিছিল সহকারে রাস্তায় নেমে আসে শত শত মুক্তিপাগল জনতা। বিজয়ের গানে গানে মুখরিত হয়ে উঠে রাজপথ। পৎ পৎ করে উড়তে থাকে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা। d-11
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর দোহাজারীতে বিমান ঘাঁটি গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয় ব্রিটিশ সরকার। এ জন্য তারা স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে জমি লিজ নেয়। অবশেষে তারা দোহাজারীর চাগাচর গ্রামে গড়ে তোলে বিমান ঘাঁটি। তবে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ বাহিনী ওই ঘাঁটি ছেড়ে চলে যায়। এরপর ওই জমির প্রকৃত মালিকরা ফের তা দখলে নিয়ে নেয়। প্রকৃত মালিকদের জমি দখলের সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অসংখ্য ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী এ বিমান ঘাঁটির। ধীরে ধীরে হারাতে থাকে এ বিমান ঘাঁটির ইতিহাস। বর্তমান প্রজন্মের কেউ জানে না চাগাচর গ্রামে বিমান ঘাঁটি থাকার কথা!
চাগাচর গ্রামটি তৎকালীন বার্মার আরাকান রাজ্যের প্রবেশদ্বার ছিল। সে কারণেই ব্রিটিশ বাহিনী এখানে বিমান ঘাঁটি করে পুরো এলাকাকে ওয়ারফ্রন্ট বা রণমুখ হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। বিমান ঘাঁটিটিকে কেন্দ্র করে এখানে গড়ে ওঠে বোমা মজুদকেন্দ্র ও সৈনিক ঘাঁটি। প্রায় চার-পাঁচ বছর এখান থেকে যুদ্ধ পরিচালনা করে ব্রিটিশ বাহিনী। পরে ব্রিটিশদের কাছে জাপানিরা আত্মসমর্পণ করলে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। তখন থেকেই পরিত্যক্ত হয়ে যায় দোহাজারী চাগাচর বিমান ঘাঁটিটি।
চট্টগ্রামের কৃষিভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত দোহাজারীর রূপ এখন পাল্টে গেছে। অথচ সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দোহাজারী অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিজপণ্য ও মৎস্যসম্পদ জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মাছের পরিবর্তে দোহজারীতে এখন অসংখ্য পুকুর কেটে মাছ চাষ করা হচ্ছে। বিলের দিগন্ত বিস্তৃত জমিতে ধান, সরিষা, রসুন, পেঁয়াজ, তরমুজ, বাঙ্গি, মরিচ, কপি, আলু, পটল, লাউ, শিম, গাজর. টমেটোসহ নানা ধরনের ফসল আবাদ হচ্ছে।d-12
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে বিস্তীর্ণ দোহাজারী অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে বিপুল সম্ভাবনাময়। এ অঞ্চলের মাছ যেমন দেশের মাছের ঘাটতি পূরণ করতে পারে, তেমনি এ অঞ্চলের সরিষা চাষ দেশের ভোজ্যতেলের ঘাটতি পূরণে অনেকাংশে সক্ষম হবে। আধুনিক পদ্ধতিতে ইরি-বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসল আবাদ করে দেশের খাদ্য ঘাটতি নিরসনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি পালন, মৎস্য, মৌমাছি, শামুক থেকে মুক্তা, কাঁকড়া, চিংড়ি চাষের মাধ্যমে এ অঞ্চলের চাষিরা তাদের অর্থনৈতিক অবস্থা চাঙ্গা করে তুলতে পারেন। এভাবে দোহাজারী খুলে দিতে পারে অপার সম্ভাবনার দ্বার। বিদ্যমান বিভিন্ন সমস্যার সমাধান হলে দোহাজারী অঞ্চলে উৎপাদিত পণ্য জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
এ অঞ্চলে ক্ষুদ্র কুটির শিল্প স্থাপন করে বেকারদের কর্মসংস্থান করতে পারলে গ্রামীণ অর্থনীতি নতুনজীবন পাবে। সেই সাথে উৎপাদিত কুটির শিল্পজাত দ্রব্য জাতীয় অর্থনীতির বিকাশ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে।
দোহাজারীর কৃষিপণ্যের খ্যাতি দেশে-বিদেশে। আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে দেশে চাহিদা বহুলাংশে মেটানো সম্ভব। দোহাজারী অঞ্চলে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা বিপণনের সুষ্ঠু ব্যবস্থা নেই। এ কারণে কৃষিপণ্য কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। আধুনিক পদ্ধতিতে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জনের দ্বার উন্মোচিত হবে।
বোরো মওসুমে দোহাজারী অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ ধান উৎপাদন করে দেশে খাদ্য ঘাটতি বহুলাংশে পূরণ করা সম্ভব। সুষ্ঠু পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, চাগাচর ও খাগরিয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ সংস্কার করা হলে দোহাজারী অঞ্চলের কৃষকদের ধান উৎপাদনের পরিমাণ বাড়বে। অন্য দিকে বর্ষাকালে উচ্চফলনশীল (উফশী) ও বন্যা সহনশীল ধান চাষ করার ব্যবস্থা করা হলে ধানের উৎপাদন দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। দোহাজারী অঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ ঝিনুক থেকে মুক্তা আহরণ করে এ থেকে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন সম্ভব। সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে আধুনিক পদ্ধতিতে ঝিনুক চাষ ও ঝিনুক থেকে বিপুল মুক্তা আহরণ করা যেতে পারে। সেই সাথে ব্যাপকভাবে কাঁকড়া ও চিংড়ি মাছ উপাদন করা সম্ভব।
কার্তিক-অগ্রহায়ণ মাসে দোহাজারী অঞ্চলের শংখ নদীর আশপাশ থেকে পানি নেমে গেলে সমতল জমি জেগে ওঠে। তখন চাষ হয় সরিষা, রসুন, কালাই, শসা, ক্ষিরাসহ নানা রকম রবি ফসল। এরপর এলাকার কৃষকেরা প্রস্তুতি নেন বোরো ধান চাষে। পৌষ মাঘ মাসেই ধানের চারা লাগানোর কাজ শেষ হয়ে যায়। বৈশাখ মাসেই ধান কাটা শুরু হয়। শুধু ধানই নয়, অপেক্ষাকৃত উঁচু জমিতে আবাদ হয় নানা রকম ফসল। দোহাজারী অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাকৃতিক সম্পদের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলটি উপেক্ষিত হয়ে আসছে। এ অঞ্চলে মাছ চাষ, গবাদিপশু-হাঁস-মুরগির খামার ভোজ্যতেলের জন্য সরিষা চাষ, সরিষা থেকে মধু উৎপাদনসহ নানা রকম সবজি চাষ হয়ে থাকে। তবে উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ সংরক্ষণ এবং বিপণন ব্যবস্থার অভাবে প্রতি বছর কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দোহাজারী অঞ্চলে প্রতি বছর একই জাতের ফসল আবাদ করায় জমির উর্বরতা শক্তি হারাচ্ছে। জমিতে উচ্চমাত্রার কীটনাশক প্রয়োগ করায় তা মাটি ও পানিতে মিশে মাছ এবং অন্যান্য জলজপ্রাণী ও জলজ উদ্ভিদের বংশবিস্তার ব্যাহত হয়ে প্রায় বিলুপ্তির পথে।
অপার সম্ভাবনাময় এই দোহাজারীকে জেলা ঘোষণা করলে দুবাই শহর, সিঙ্গাপুর ও ভারতের দার্জিলিংয়ের মত সমৃদ্ধ নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে এবং দেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ই-মেইল : kamrul.j85@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*