সমৃদ্ধ নরসিংদীর অর্থনৈতিক অঞ্চল বর্তমান অন্তরায় প্রযুক্তিদক্ষ জনবল

মো. আবুল হাসান ও খন রঞ্জন রায়, ১১ মে ২০১৭, বৃহস্পতিবার: জেলা হিসেবে নরসিংদীর পরিচিত নতুন হলেও এ অঞ্চলের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন ও চমকপ্রদ। ইতিহাস বেত্তাদের মতে প্রায় পাঁচ হাজার বছরের পুরোনো ঐতিহ্যবাহী ইতিহাস এ জেলাকে ঘিরে রয়েছে। জেলার উত্তরাঞ্চলে সাম্প্রতিককালে আবিস্কৃত হয়েছে নব্য-প্রস্তরযুগের প্রতœ নির্দশন, মৌর্য ও গুপ্ত মুদ্রা এবং পরবর্তীকালে খড়গ, বর্মন বংশীয় রাজাদের তাম্রলিপি, মধ্যযুগীয় মুসলিম মোগল সুলতানদের স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, শিলালিপি, স্থাপত্য ও বিভিন্ন রকমের প্রতœতাত্ত্বিক নির্দশন। এ জেলায় রয়েছে মধ্যযুগীয় কয়েকটি দুর্গের ধ্বংসাবশেষ, অনেক দীঘি, মঠ, মন্দির, প্রাচীন মাজার ও মসজিদ। বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন ভূ-খণ্ডগুলোর মধ্যে এ অঞ্চল অন্যতম।
বৃহৎ ঢাকা জেলার নারায়ণগঞ্জ মহকুমার বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার অর্ন্তগত নরসিংদী, রায়পুরা, মনোহরদী ও শিবপুর থানা এবং পরবর্তীতে নবগঠিত বেলাব ও ঢাকা সদর উত্তর মহকুমার কালিগঞ্জ থানার পূর্বঞ্চল নিয়ে গঠিত পলাশ থানা সমন্বয়ে ১৯৮৪ সালে গঠিত হয় নরসিংদী জেলা।
এই জেলার নরসিংদী ও পলাশ-ঘোড়াশাল শিল্পাঞ্চল বাংলাদেশে অন্যতম বার্ধিষ্ণু এলাকা। ষাটের দশকের প্রথম দিকে এই এলাকার উত্তরণ ঘটে শিল্পাঞ্চল হিসেবে। সেই সময়কালে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় বেশ কিছু পাটকল, বস্ত্রকল, তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, সারকারখানা ইত্যাদি। অবশ্য শিল্পাঞ্চল হিসেবে এর যাত্রা শুরু আরো আগে, বহু আগে। ভারত বিভক্তির পূর্বেই এই অঞ্চলে স্থাপিত হয় দেশবন্ধু চিনিকল এবং চরসিন্দুরে । বর্তমান পলাশ থানার সুলতানপুর থেকে ঘাঘরা পর্যন্ত বিস্তৃত জনপদ এবং নরসিংদী সদর থানা ষাটের দশক থেকে শিল্প এলাকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এবং পর্যায়ক্রমে সমৃদ্ধি ও বিস্তৃত লাভ করছে।
এ উপমহাদেশ বিভক্তির পূর্ব থেকে নরসিংদী ও রায়পুরা থানা দু’টি তাঁত শিল্পের জন্য প্রসিদ্ধ। দীর্ঘকাল হতে বাবুরহাট বাজার তাঁতের কাপড়ের বাজারজাতকরণের জন্য প্রখ্যাত। একসময় এটিকে এদেশের ‘ম্যানেচেষ্টার’ হিসেবেও অভিহিত করা হোত। সময়ের ব্যবধানে নানা প্রতিকূলতা ও ঘাতপ্রতিঘাতে এই শিল্প এখন ধ্বংসোম্মুখ হলেও ক্রমহ্রসমান দেশীয় তাঁত শিল্পের ঐতিহ্য এখনও বিদ্যমান।
গত ৪ ফেব্র“য়ারি নরসিংদীর সদর উপজেলার মাধবদী এসপি ইনস্টিটিউশন মাঠে আয়োজিত রাজস্ব সংলাপ অনুষ্ঠানে নরসিংদীর ২০০ নতুন করদাতা নিবন্ধিত হয়। এর মধ্যে ৩০ জন করদাতাকে সনদ প্রদান করা হয়। সংলাপে নরসিংদীর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সভাপতি জানান নরসিংদী বস্ত্র অঞ্চলে, দেশের ৮০ ভাগ বস্ত্র এই জেলা থেকে উৎপাদন ও বাজারজাত হয়ে আসছে।
রাজধানী ও সন্নিকটের এলাকাগুলোতে শিল্প স্থাপনের যুৎসই জায়গা খুঁজে পাওয়া যখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে তখন আশার আলো সৃষ্টি করেছে নরসিংদীতে শীতলক্ষ্যা পাড়ের প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। সরকার ঘোষিত ১০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটি গড়ে তোলা হচ্ছে নরসিংদীর পলাশডাঙ্গা এলাকায়। ঢাকা-গাজীপুর ও নরসিংদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা করা হবে কনটেইনার টার্মিনাল। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রাজধানী লাগোয়া এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে পুঁজি বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। এখানে গড়ে তোলা যাবে মোটর গাড়ির যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা। থাকবে ইস্পাত ও অধাতু নির্মিত পণ্য ইলেকট্রিক্যাল-ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, এয়ার ক্রাফট, মোবাইল, গাড়ি, টেক্সটাইল মিল, টিভি যন্ত্রাংশের পাশাপাশি থাকবে প্লাস্টিক পণ্য, কাপড় ও কৃষিভিত্তিক শিল্পসহ শতাধিক কারখানা। একই সঙ্গে এখানে গড়ে তোলা হবে অত্যাধুনিক-প্রযুক্তিনির্ভর হাইটেক পার্ক। এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে শীতলক্ষ্যা নদীপথে নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দর ও মেঘনা নদী হয়ে মংলা এবং চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের সঙ্গে থাকবে সরাসরি সংযোগ। ঘোড়াশাল-ডাঙ্গা-পাঁচদোনা ও ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের সঙ্গেও এলাকার সংযোগ গড়ে তোলা হবে। থাকবে ঘোড়াশাল রেলস্টেশনের সঙ্গে সংযোগ। কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ইতিমধ্যে ৫০ একর জমি কেনা হয়েছে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্যও কেনা হয়েছে ২০০ একর জমি। আর এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও কনটেইনার টার্মিনাল ঘিরে পুরো নরসিংদী, গাজীপুরের শীতলক্ষ্যা নদীঘেঁষা কিছু অংশ, নারায়ণগঞ্জ ও আশপাশের চিত্র পাল্টে যাওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
নরসিংদীর পলাশডাঙ্গায় নির্মিতব্য অর্থনৈতিক অঞ্চল দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য আর্কষণ বলে বিবেচিত হবে। তা লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। অর্থনৈতিক এলাকাকে ঘিরে গড়ে উঠবে নানা ধরনের কলকারখানা। দেশের একটি শীর্ষ স্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের গা ঘেঁষে ৫০০ বিঘা এলাকাজুড়ে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ে তোলার কাজ শুরু করেছে। রাজধানী এবং চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের সঙ্গে নৌপথে সরাসরি যোগাযোগ এবং সড়ক ও রেলপথে ধারেকাছের সব এলাকার সংযোগ থাকায় এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবেও গড়ে উঠবে।
আধুনিক শিল্পের উৎপাদনে যে কাঁচামাল, বিজ্ঞানের যে মৌলিক জ্ঞান, প্রযুক্তির যে উদ্ভাবন, যে যন্ত্রপাতি, কলাকৌশল, শক্তির যে উৎস ব্যবহৃত হয়, সেখানে একটাই লক্ষ্য থাকে, তা হলো উৎপাদনমূল্য হ্রাস, উৎপাদিত সামগ্রীর গুণগত মান বৃদ্ধি, সবচাইতে অল্প সময়ে এবং সবচাইতে সহজে প্রাপ্তিযোগ্য কাঁচামালের ব্যবহার এবং দক্ষ কারিগর নিয়োগ। বস্তুত শিল্পকারখানায় যারা কাজ করেন, শ্রমিক, বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, ব্যবস্থাপক, অর্থনীতিবিদ তাদের সবাইকে নব আবিস্কৃত প্রযুক্তিজ্ঞান অর্জন করে ও বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে সমসাময়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
বর্তমান যুগ হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রসার না করতে পারলে আমরা পিছিয়ে যাব। অনেক ব্যয়, মেধাশ্রম বিনিয়োগ করা হলেও প্রযুক্তিজ্ঞান সম্পন্ন দক্ষ জনবলের অভাবে এক সময় রুগ্ন হয়ে মৃত্যুবরণ করবে। বিনিয়োগকারী ব্যাংকের ঋণ শোধ না করতে পারলে ঋণ খেলাপীতে পরিণত হবে। বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে আমাদের সমকালীন ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিল্পে বিনিয়োগ উদ্ভাসিত করতে হলে, অতীত ও বর্তমান পটভূমির দিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের ব্যাপকভাবে প্রযুক্তি শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে। নরসিংদী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা আইন সংসদে পাশ করতে হবে। আর তা সম্ভব না হলে পাচঁ হাজার বছরের পুরোনো সমৃদ্ধ ইতিহাস ধারার মতো  ক্ষয়িচ্ছু জনপদ শব্দটি উত্তরোত্তর জনপ্রিয় হবে। সচল শিল্প রুগ্ন হবে। সামর্থবান গুটিকয় শিল্প, বিদেশ থেকে প্রযুক্তিদক্ষ জনবল ডলারমূল্যে আমদানি করবে। আমরা আমদানি নির্ভর জাতির কালিমা থেকে রপ্তানিমুখি দেশে উত্তরণ বাস্তবায়ন স্বপ্নব  থাকবে। লেখক: আহবায়ক ও সদস্য সচিব বিশ্ববিদ্যালয় বঞ্চিত জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় বাস্তবায়ন পরিষদ

Leave a Reply

%d bloggers like this: