সংলাপে না বসেও সংকটের সমাধান সম্ভব

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : স্বনামধন্য ব্যক্তিদের শেষ পর্যায়ে এসে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের মধ্যে একটা অসহায়ত্ব ও দ্বিধান্বিত মনোভাব ফুটে উঠেছে। তারা একটি জাতীয় সংলাপ অনুষ্ঠানের জন্য রাষ্ট্রপতিBadarudduza মো. আবদুল হামিদের সাহায্য প্রার্থনা করছেন, যেন তিনি এ ব্যাপারে নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখেন। এই তো কদিন আগে রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর মতো আইনশৃংখলা বাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য সবকিছু করার নির্দেশ দিলেন। আমরা যে কোনো সম্মিলিত প্রচেষ্টার সাফল্য দেখতে চাই এ আশায় যে, তারা যা করছেন তা বুঝে শুনেই করছেন। তবে সংলাপে বসলেই সাফল্য আসবে এমনটি ভাবার কোনো কারণ তো কেউ দেখে না। সমস্যার সমাধানের বিষয়টি শিক্ষিত সুশীল সমাজের চিন্তাভাবনায় আসা উচিত। দেশের ভালো-মন্দ কেবল রাজনীতিকদের ব্যাপার হতে পারে না, বিশেষ করে যে রাজনীতিকরা মুখ দেখাদেখির সংস্কৃতিতে বিশ্বাস করেন না। প্রধানমন্ত্রী তো তাদের উদ্যোগের প্রতি কোনো গুরুত্ব দিতেই নারাজ। দেশের ব্যাপারে শিক্ষিত লোকদের ভূমিকা নিয়ে পরিহাস করতেও অসুবিধা হচ্ছে না। কিছু শিক্ষিত লোকের স্বার্থসর্বস্ব ভূমিকার জন্যই দেশ আজ এত অসহায়। জনগণের নির্বাচন মোকাবেলায় ভীত-সন্ত্রস্ত রাজনীতিকরা আজ নিজেদের সার্থক রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখছেন। নিরবচ্ছিন্ন সহিংসতা আমাদের জাতীয় জীবন ধারাকে সর্বতোভাবে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে। প্রতিদিন নিহত হচ্ছে মানুষ, অগ্নিদগ্ধ হচ্ছে এবং জনজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বাড়ছে। অগণিত মানুষের জীবনহানি এবং অবর্ণনীয় দুর্দশা জনমনে তীব্র হতাশার সঞ্চার করছে। পুলিশের বাড়াবাড়ির ন্যায্যতা দেখানোর জন্য দুটি ধারায় সন্ত্রাস চলছে এবং জ্ঞাত ও স্বীকৃত রাজনৈতিক সমাধান এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রাপ্ত হিসাব মতে ৮৮ জন প্রাণ হারিয়েছে। গুপ্ত হত্যায় কতজন কিভাবে জীবন হারিয়েছে তা জানার উপায় নেই। গণতান্ত্রিক আদর্শ ও মূল্যবোধ চর্চার জন্য যে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই বাংলাদেশের মানুষকে আজ প্রাণ দিতে হচ্ছে নির্বাচনের দাবিতে। প্রতিদিন বণিক সম্প্রদায়ের একটি অংশ এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন জাতীয় অর্থনীতির কী ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে, কতজন মানুষের প্রাণহানি ঘটছে এবং পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সঠিক সমাধানের লক্ষ্যে অবাধ নির্বাচনের দাবি না তুলে, যার প্রতিশ্র“তি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিয়েছিলেন, সবাইকে দোষারোপ করা আসলে ভণ্ডামি ও নিষ্ঠুর পরিহাসের শামিল, যার পরিণতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। বিভক্ত রাজনীতিতে রাস্তার হিংসাকে অত্যন্ত কঠিনভাবে নিন্দা করা আর এক তরফাভাবে নির্বাচনের দাবি এড়িয়ে যাওয়াকে নিন্দা না করা শান্তি প্রতিষ্ঠার সহায়ক হতে পারে না। গত বছরের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন ছিল কেবল শাসনতান্ত্রিক দাবি মেটানোর জন্য একতরফা নির্বাচন, একথা ওই সময় আন্দোলন থামানোর জন্য শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছিলেন। তখন একথাও বলা হয়েছিল, সব দলের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে নতুন একটি মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হবে। বস্তুত, পরবর্তী সময়ে একটি পরিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিষ্কার ও সুনির্দিষ্ট আশ্বাস জাতিকে প্রদান করার কারণে বিরোধী দলগুলো বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এক বছর অপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রীকে সময় দিয়েছে সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ ঘোষণার। এখন সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের অজুহাত দেখানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, নির্বাচন প্রশ্নে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সঙ্গে সরকার কোনো বৈঠক করতে পারে না, কারণ তারা হচ্ছে শত্রু ও সন্ত্রাসী। তারা মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সমর্থক নয় বলেও চিহ্নিত করা হচ্ছে। সারকথা হচ্ছে, সরকার সমর্থকরা একথা স্বীকার করে নিতে প্রস্তুত নন যে, ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন সরকারকে কোনো বৈধতা দেয়নি। জোর যার মুল্লুক তার এ শক্তি তত্ত্বকেই সরকার দেশব্যাপী উৎসাহিত করছে। সারা দেশের মানুষ আজ কোনো না কোনো ধরনের নৈরাজ্য ও নির্যাতনের শিকার। পুলিশকে সরকার রক্ষার রাজনৈতিক যুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। আইনশৃংখলা বাহিনীর বড় কর্তাদের কেউ কেউ তাই এমন বক্তব্য দিচ্ছেন যাতে মনে হয় সরকার রক্ষার জন্য জনগণের প্রয়োজন নেই তারাই যথেষ্ট। পেট্রলবোমার আঘাতে, পুলিশের অত্যাচারে এবং সহিংস সংঘাতে প্রতিদিন দেশজুড়ে লোক মরছে, সম্পদহানি ঘটছে। নিরাপত্তার দায়িত্বে নিয়োজিত অফিসারদের প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনভাবে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করার আদেশ দিয়েছেন। জনগণের প্রতি পুলিশের কোনো দায়িত্ব আছে বলে মনে হয় না। এটা নিতান্তই বেদনাদায়ক যে, নতুন কোনো ইস্যুর জন্য নয় শুধু, নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছিলেন সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার প্রশ্নে আজ দেশ গৃহযুদ্ধের মতো আত্মবিধ্বংসী পরিস্থিতি মোকাবেলা করছে, যেখানে রাজনৈতিক নেতৃত্বের নয়, পুলিশি শক্তির প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে। নিরপরাধ মানুষ সবচেয়ে বেশি অসহায়ত্বে ভুগছে এবং উভয় পক্ষ দ্বারা তারাই হয়রানির শিকার হচ্ছে। মারাত্মক অভিযোগ শোনা যাচ্ছে; কিন্তু নিরাপত্তার ভয়ে কেউ মুখ খুলছে না। এসব সহিংসতা, হত্যা ও ভোগান্তির যা সরকারকে ব্যর্থ করে দিচ্ছে মুহূর্তেই তার অবসান ঘটাতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে, এজন্য তার কোনো সংলাপে বসার প্রয়োজন হবে না। প্রধানমন্ত্রীর একজন ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং সাবেক আমলা প্রকাশ্যে প্রকৃত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হতে পরামর্শ দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনের দাবির জন্য জনগণকে সশস্ত্র যুদ্ধের মোকাবেলা করতে হবে কেন, যার প্রতিশ্র“তি প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ভয় দেখানো হচ্ছে এবং ভুলে যাওয়া হচ্ছে, সেদিনের মুক্তিযুদ্ধ ছিল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জনযুদ্ধ। একথা গোটা বিশ্ব জানে। এখন কি মুক্তিযুদ্ধ চলবে জনগণের বিরুদ্ধে, জনগণের ভোটের বিরুদ্ধে? সে মুক্তিযুদ্ধ কাদের সহায়তায় কারা করবেন, তা জনগণকে জানতে হবে। দেশে আজ দুটি ধারায় বিভক্ত সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে, যা নিয়ে সরকারের কোনো উদ্বেগ নেই। আন্দোলনকারীদের সন্ত্রাসী তৎপরতা এবং এর বিপরীতে পুলিশি শক্তির অপব্যবহার যে হিংসা ও সন্ত্রাস নির্মূল করার সঠিক পথ নয়, সে উপলব্ধি সরকারের মধ্যে দেখছি না। সবদিকের বিচারে পরিস্থিতি খুবই বিপজ্জনক ও অনিরাপদ। অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, বিরোধী দলের অবরোধ কর্মসূচি স্থানীয় প্রশাসনকে স্থবির করে দিয়েছে। দেশের আর্থিক সম্ভাবনার ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি ফল হবে মারাত্মক, এটি ভেবে তিনি শংকিত। গণতন্ত্র রক্ষায় ও নির্বাচনের ইস্যুতে বাংলাদেশের জনগণের সীমাহীন দুঃখ-দুর্ভোগ পোহাতে দেখে গোটা বিশ্বও উদ্বিগ্ন। দেশ ও দেশবাসীকে যতই মূল্য দিতে হোক না কেন, নির্বাচন অনুষ্ঠান না করার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো অজ্ঞাত শক্তির প্লান-পরিকল্পনা কাজ করছে। তা না হলে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে তো সরকারের জনপ্রিয়তা প্রমাণের বিরাট সুযোগ হিসেবেও দেখা যেতে পারে। নির্বাচনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তো গণতন্ত্র নয়। শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া দুই নেত্রীর বিরোধ মেটানোর ব্যাপারে জাতিসংঘ সম্পৃক্ত থাকবে এ আশ্বাসের একটি ইতিবাচক দিক রয়েছে। স্বনামধন্য ব্যক্তিদের উচিত হবে সাহস করে প্রধানমন্ত্রীকে সরাসরি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে বলা, যার প্রতিশ্র“তি তিনি দিয়েছেন। দেশ ও জাতির বিবেক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা। আমাদের মানবাধিকার সংগঠনগুলোর নেতারাও গা বাঁচিয়ে চলছেন। তারা অগ্নিদগ্ধ করা, লোক মারার এবং সম্পদ ধ্বংস করার সমালোচনা করেছেন এবং এসবের মধ্যে মানবাধিকারের বিলোপ ঘটার কথাও বলছেন। কিন্তু নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের মধ্যে যে সমস্যার সমাধান নিহিত রয়েছে এ কথা তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে না। আমরা প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলছি, আপনি আপনার সর্বোচ্চ কর্তব্য পালন করুন, জনগণকে নিরাপদে ও শান্তিতে থাকতে দিন। কেউ যেন জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার দুঃসাহস না দেখান। যারা যুদ্ধের কথা বলছেন, তারা যে কী ধরনের যোদ্ধা তা সবারই জানা। পুলিশি শক্তির জোরে বড় বড় কথা বলছেন। পুলিশ পক্ষে না থাকলে তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। নিশ্চয়ই জনগণের পুলিশ জনগণের পাশেই থাকবে, অন্য কারও পক্ষে জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না। সম্মানজনক পথে শান্তি ফিরিয়ে আনতে জাতির কাছে দেয়া নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীকে কারও সঙ্গে সংলাপে বসতে হবে না। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতি যদি সম্মান দেখানো না হয়, তাহলে সরকার ও বিরোধী দলের সমঝোতার অনুকূলে কোনো আস্থার ভিত্তি তৈরি হবে না, যা অর্থপূর্ণ সংলাপের জন্য অপরিহার্য। সূত্র : শীর্ষ নিউজ ডটকম মানবজমিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*