সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক জোর তৎপরতায় সরকারে অস্বস্তি

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে দেশীয় উদ্যোগের পাশাপাশি ব্যাপক তৎপরতা শুরু করেছে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলো।untitled-1_69115 এরই মধ্যে বিদেশি কূটনীতিকদের তৎপরতার পাশাপাশি জাতিসংঘ দৃশ্যমান তৎপরতা শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক এ সংস্থার মহাসচিব বান কি মুন ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ইস্যু নিয়ে কাজ করতে তার আস্থাভাজনদের দায়িত্ব দিয়েছেন। চলতি সপ্তাহেই ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসছে। এসব আন্তর্জাতিক উদ্যোগ বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও দুই জোটের বাইরে থাকা অন্য প্রায় সব রাজনৈতিক দলগুলো ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও এ বিষয়ে এখনো অবস্থান স্পষ্ট করছে না সরকার। বরং সরকার এক রকমের অস্বস্তির মধ্যেই পড়েছে আন্তর্জাতিক এ সব তৎপরতায়। বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে আলোচনা করতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম-সংক্রান্ত দফতরের দায়িত্বে থাকা সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসার কথা ছিল। অবশেষে এর কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এ প্রতিনিধি দল আসলেও এতে থাকছেন না তারানকো। এদিকে দেশের সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে সংকট নিয়ে আলোচনার উদ্যোগ নিতে বলার পর সরকারের পক্ষ থেকে সেই সম্ভাবনাও নাকচ করে দেয়া হয়েছে। একইভাবে সংকট নিরসনে সরকারের অনিহার কারণে জাতিসংঘের উদ্যোগও অনিশ্চয়তায় পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। গতকাল রোববারও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন কখনোই আলোচনা হবে না। আর বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, বিএনপি নেত্রীর আন্দোলনে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র রয়েছে। জানা গেছে, সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রীরা কোনো ধরনের আলোচনায়ই বসতে চাচ্ছেন না। তারা মনে করছেন আলোচনায় সম্মত হলে সরকারের বিপর্যয় ঘটবে। তাতে আরেকটি নতুন নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে হতে পারে, যেটা তাদের জন্য বিপর্যয়ই বলা যায়। কারণ, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আগে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল এটা নিয়ম রক্ষার নির্বাচন। সে কারণে এখন বিরোধী জোটের সঙ্গে আলোচনায় বসলেই নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যেতে হতে পারে। আর এ আশঙ্কা থেকেই সরকার শত চাপের মুখেও সংলাপের দিকে যেতে চাইছে না। এক্ষেত্রে বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, সরকার অনড় অবস্থানে থাকলে কী ঘটবে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ভাগ্যে। আর এ অচলাবস্থার সমাধানই বা হবে কোন পথে? সরকারের প্রভাবশালী একজন মন্ত্রী জানিয়েছেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে জানাজানি হয়েছে জাতিসংঘের মহাসচিবের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসছেন। কিন্তু তাদের বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে এখনো সরকারের কাছে লিখিত কোনো তথ্য নেই। আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরকে অবগত করা হয়নি। জাতিসংঘের এ প্রতিনিধি দল প্রকৃতপক্ষে কী ইস্যুতে কথা বলবেন তা জানার পরই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে সরকার তাদের সঙ্গে কি ধরনের কৌশল নিয়ে অগ্রসর হবে। তবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম অবশ্য আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় আলোচনার পক্ষে মত দিয়েছেন। তিনি শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘জার্নি’ নামের একটি সংগঠন কর্তৃক আয়োজিত ‘চলমান রাজনৈতিক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষা ব্যবস্থা’ শীর্ষক সেমিনারে দেয়া বক্তব্যে বলেছেন, বিএনপির সঙ্গে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় আলোচনা হতে পারে। এক্ষেত্রে তিনি কিছু শর্তও দিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করে বলেছেন, বিএনপি-জামায়াত মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে বিচ্যুত হয়ে দেশে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে। এ অবস্থায় কোনো আলোচনা হতে পারে না। যদি তারা অন্যায় স্বীকার করে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে তাহলে আলোচনা হতে পারে।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সাবেক সদস্য ও বর্তমান উপদেষ্টা এডভোকেট ইউসূফ হোসেন হুমায়ুন বলেছেন, বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারা একেক সময় একেক ধরনের শর্ত জুড়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, বিএনপি নেতা মেজর অবসরপ্রাপ্ত হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বলছেন, সরকার পদত্যাগ করে নির্বাচন না দেয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। অন্য নেতা বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে। বিএনপি সমর্থক একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী বলছেন, জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করার কথা। আসলে বিএনপি কী চাচ্ছে তারা তা এখনো নিজেরাই ঠিক করতে পারছেন না। আওয়ামী লীগের প্রবীণ এ নেতা অবশ্য আলোচনার পক্ষেই নিজের অবস্থানের কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, শর্ত দিয়ে কোনো আলোচনা হতে পারে না। যেকোনো আলোচনা বা সংলাপ হতে হয় শর্তহীন। তিনি প্রশ্ন করে বলেন, বিএনপি সহিংস কর্মসূচি কি বন্ধ করেছে? সহিংসতা আর সংলাপ একসঙ্গে চলতে পারে কী? তিনি বলেন, রাজনৈতিক এজেন্ডার বাইরেও আলোচনা হতে পারে। আলোচনা যদি হয় তাহলে সেটা একটি অর্থবহ আলোচনাই হওয়া উচিত বলে মনে করেন আওয়ামী লীগের এ উপদেষ্টা। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জাতিসংঘের পক্ষ থেকে যে প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে আসার কথা রয়েছে তাদের এজেন্ডাগুলো সম্পর্কে অবগত নয় তার দল। রাজনৈতিক সংকটের বাইরেও তাদের কর্মকাণ্ড থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলের তৎপরতা দেখে দলীয় অবস্থান ঠিক করবে আওয়ামী লীগ। এদিকে বাংলাদেশের চলমান অচলাবস্থায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত কূটনীতিকরা ইতিমধ্যে নানামুখী তৎপরতা শুরু করেছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার সংক্রান্ত একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে তাদের ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। এ প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেবেন ইউরোপীয় পার্লামেন্টের মানবাধিকার সংক্রান্ত কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট রোমানিয়ার ক্রিস্টিয়ান ড্যান প্রেদা। এ সফরের ইউরোপীয় পার্লামেন্টের এ প্রতিনিধি দলটি বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনা করলেও তাদের মূল আলোচ্য বিষয় হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে করণীয় নিয়ে। ইইউ’র এ প্রতিনিধি দলটি ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবেন। এসময়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে তাদের সাক্ষাতের কথা রয়েছে। পাশাপাশি তারা বাংলাদেশের বিশিষ্ট নাগরিকদের সঙ্গে কথা বলবেন। সবশেষে একটি প্রেসব্রিফিং এর মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করবেন তারা। ইতিপূর্বে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী, আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, আন্দোলনরত ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সংসদের বিরোধী দলীয় নেতাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত কূটনীতিকরা। সংকট নিরসনে নিজস্ব পরিভাষায় সরকার ও বিরোধী পক্ষকে সতর্কও করেছেন তারা। সূত্র : শীর্ষ নিউজ ডটকম

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*