শীতে চালের পিঠা-পুলির স্বাদ যেন অমৃতসম

নিউজগার্ডেন ডেস্ক , ১৫ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার: বাংলা ষড়ঋতুতে শীতের আমেজে নতুন চালের পিঠা-পুলির স্বাদ যেন অমৃতসম। গ্রামবাংলার এই উৎসবের প্রধান অনুষঙ্গ রসপিঠা। আর এই পিঠা যে খেজুর রসে পুষ্ট হয়, এ কথা অজানা নয় কারো। বলা হয় ‘শীতের যশ খেজুরের রস’।
শীতের আগমনী বার্তা থেকেই খেজুরগাছ থেকে রস আহরণের প্রস্তুতি শেষ করে ফেলেন গাছিরা। খেজুরগাছ ছেঁটে-চেঁছে প্রস্তুত করে গোধূলিবেলায় তাতে মাটির হাঁড়ি পেতে দেয়া হয়। সারা রাত গাছ থেকে কাঠি বেয়ে পড়া রসে ভরে ওঠে মাটির হাঁড়ি। সূর্যোদয়ের পরপর কুয়াশার চাদর ভেঙে খেজুরগাছ থেকে পূর্ণ হাঁড়ি নামিয়ে গাছিরা চলে যায় লোকালয়ে টাটকা রস বিক্রি করতে।
পৌষ শেষে মাঘে এসে কনকনে শীত নেমেছে বটে, তবে খেজুর রস আহরণ চলছে আরো অনেক আগে থেকে। ভোজনরসিক বাঙালির কাছে খেজুর রস আর রসের পিঠার আবেদন অশেষ। জেঁকে বসা শীত আর কাঁচা খেজুর রস গ্রাম কি মফস্বল শহরে যেন পরস্পর পরিপূরক।
খেজুর রসের পিঠার এই বিলাসিতা একরকম মিশে আছে বাঙালির কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে। গ্রামাঞ্চলে গৃহস্থের বাড়ি বাড়ি ঘটা করে চলে শীতের আবেশে রসের পিঠা দিয়ে নাইওর-জামাই বরণের উৎসব।
গ্রামের বউ-ঝিরা খেজুর রস আগুনে জ্বাল দিয়ে পাতলা-ঝোলা গুড়, নলেন গুড় ও পাটালি তৈরি করে। জ্বালে জ্বালে তৈরি হয় খয়েরি রঙা মিষ্টি তরল। স্থানীয়ভাবে ‘লোচা’ বলে পরিচিত এই তরল সাধারণত খই-মুড়ি, ভাত-রুটি দিয়ে ভোজন করা হয়। এ ছাড়া খেজুর রসে তৈরি হয় পিঠা-পায়েশ। অনেকে ভোরে গাছির হাঁড়ি থেকে সতেজ রস কিনে কাঁচা পান করে।
সম্প্রতি শোনা যায়, খেজুর রসে বাদুড়ের সংস্পর্শ থেকে নিপাহ্ ভাইরাস নামের একধরনের প্রাণঘাতী অসুখের কথা। মিষ্টি খেজুর রসের স্বাদে রাতের বেলায় বাদুড় হাঁড়ির মুখ বেয়ে থাকা নলের মধ্যে চুমুক দিয়ে রস খায়। দেশের উত্তর-দক্ষিণাঞ্চলে গেল বছর বেশ কিছু রোগী শনাক্ত করা হয়েছে যাদের শরীরে বাদুড় সংক্রমিত নিপাহ্ ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
তবে সব বাদুড়ের দেহে এই ভাইরাসের অস্তিত্ব থাকে না। তবু প্রাণ সংশয়ের আশঙ্কায় খেজুর রস খাওয়ায় কিছুটা শর্তারোপ করে দিয়েছেন চিকিৎসকরা। আগুনে জ্বাল দিয়ে খাওয়া যাবে খেজুরের রস। অনেকে আবার বাদুড়ের উপদ্রুব থেকে রেহাই পেতে গাছে বাঁধা হাঁড়ি ঘিরে দেয় এক ধরনের জাল দিয়ে।
শীত মৌসুমে খেজুর রস আহরণকারীদের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য বাড়লেও নেই আর আগের মতো ব্যবসার জৌলুশ। খেচুর গাছ কাটার (রস আহরণের চাঁছা) পেশায় প্রায় ৩৫ বছর ধরে আছেন ষাটোর্ধ্ব মুর্শিদ মিয়া। উপজেলার টাঙ্গাব ইউনিয়নের পাঁচাহার গ্রামের এই প্রান্তিক মানুষটির ভাষ্যমতে, এক যুগ আগেও পরিবারের সদস্যরা মিলে শীত মৌসুমে ৭০-৮০টি গাছ থেকে খেজুর রস সংগ্রহ করতেন। এখন আর তেমন গাছ পাওয়া যায় না। তবে আদি পেশাটি ছাড়তেও পারছেন না।
একই পেশায় নয় বছর ধরে আছেন রশিদ মোড়ল (৩৫)। খেজুর রস ছাড়াও তিনি তালের রস বিক্রি করেন। এ দিয়েই জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।
শীতের এই কয় মাস গাছে গাছে হাঁড়ি ঝুলতে দেখা গেলেও এরপর আর খেজুরগাছের তেমন কদর থাকে না গৃহস্থের কাছে। কোথাও কোথাও রাক্ষুসে ইটভাটাগুলো হাঁ করে গিলছে খেজুর গাছ। ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে চাহিদা থাকায় গ্রামাঞ্চলে দিন দিন কমছে খেজুরগাছ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*