শিশুদের কৃমি জনিত কারণে সৃষ্টরোগ ও তার প্রতিকার

ডা. মোসাম্মৎ সিতারা খানম
কৃমি সংক্রমণ আমাদের দেশে একটি মারাত্মক সমস্যা। শিশুদের স্বাস্থ্য বিশেষভাবে এই সংক্রমণের কারণে মারাত্মক হুমকীর মুখোমুখি।
কৃমি পরজীবি। এরা বিভিন্ন পথে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে এবং স্থায়ী আবাস গড়ে এবং বংশ বিস্তার ঘটায়। তারপর অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
আমরা অনেক জাতের কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হই। তার মধ্যে এগুলো সবচেয়ে বেশি যেমন বড় কৃমি বা জড়ঁহফ ড়িৎস,  সূতা কৃমি বা ঞযৎবধঃ ড়িৎস, বড়শী কৃমি বা যড়ড়শ ড়িৎস,
খাবার এবং পানির মাধ্যমে কৃমির ডিম আমাদের শরীরে প্রবেশ করে। ডিম থেকে শূককীট এবং শূককীট বৃদ্ধি পেয়ে পূর্ণবয়স্ক কৃমিতে পরিণত হয় এবং বংশ বৃদ্ধি শুরু করে। এই চক্রটি কিন্তু আমাদের শরীরের মধ্যে ঘটতে থাকে।
মলত্যাগের সাথে কৃমির ডিমগুলো আমাদের শরীর থেকে বের হয়। তারা খাদ্য ও পানির সাথে মিশে পুনরায় আমাদের পাকস্থলীতে চলে আসে। শুধুমাত্র বড়শীকৃমি বা হুক ওয়ার্ম পায়ের তালুর চামড়া দিয়ে আমাদের শরীরে প্রবেশ করে।
যেখানে সেখানে পায়খানা করলে, স্বাস্থ্য-সম্মত পায়খানা ব্যবহার না করলে, খাবারের আগে ও মলত্যাগের পর ভাল করে সাবান বা ছাই দিয়ে হাত পরিষ্কার না করলে, খালি পায়ে পায়খানায় গেলে, খাবার খোলা রাখলে, মাছ মাংস অল্প সিদ্ধ করে খেলে, শাক-সবজি, ফলমূল ভাল করে না ধুয়ে কাঁচা খেলে, হাতের নখ কেটে পরিষ্কার না করলে, পায়খানার রাস্তা চুলকিয়ে মুখে হাত দিলে মানুষের শরীরে কৃমি সংক্রমণ হয়।
বড় কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হলে কাশি, বুকে শনশন শব্দ, ক্ষুধামন্দা, বদহজমে, পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া এমনকি শিশুদের ক্ষেত্রে অন্ত্রনালী বন্ধ হতে পারে। ডাক্তারী পরিভাষায় যাকে  ওহঃবংঃরহধষ ঙনংঃৎঁপঃরড়হ বলা হয়।
সূতা কৃমি বা ঞযৎবধঃ ড়িৎস আকারে ছোট প্রায় আধ ইঞ্চি লম্বা এবং সাধারণত: শিশুদেরই হয়। পায়খানার রাস্তার চারদিকে চুলকানী এবং আঙ্গুলের মাধ্যমে এই কৃমির ডিমগুলো কাপড়-চোপড়, বিছানাপত্র এবং খেলনার মধ্যে ছড়ায়। সেখান থেকে ডিমগুলো নিজেদের মুখে বা নতুন ব্যক্তির মুখে ঢুকে পড়ে।
সূতাকৃমি যাদের আছে তাদের পায়খানার রাস্তার চারিপার্শ্বে প্রায়ই বিশেষ করে রাত্রে চুলকানী হয় কারণ রাতের বেলায়ই স্ত্রী কৃমিগুলো ডিম পাড়ার জন্য এই জায়গায় আসে। এই কৃমির ফলে পেট ব্যথা, অনিদ্রা, খিচুঁনী এসব উপসর্গ দেখা যায়।
বরশী কৃমি বা হুক ওয়ার্ম অতিমাত্রায় ক্ষতিকারক। এই কৃমির ডিমগুলো মলত্যাগের সাথে শরীরের বাইরে আসে। ডিম থেকে শূককীট হয়। এই শূককীট মানুষের পায়ের চামড়া ভেদ করে শরীরে প্রবেশ করে এবং রক্ত ও লসিকানালীর সাহায্যে ফুসফুসে পৌঁছে। তারপর শ্বাসনালীতে উঠার পর মানুষ তা গিলে ফেলে। শূককীটগুলো অন্ত্রের ঝিল্লিকে আক্রান্ত করে রক্ত চুষে চুষে খায়। এই কৃমির আক্রমণে প্রধানত: আক্রান্ত ব্যক্তি রক্তশূন্যতায় ভোগে। এছাড়া কোষ্ঠকাঠিন্য বা কোন সময় পাতলা পায়খানা, জ্বর জ্বর ভাব, শ্বাস ত্যাগের সময় বুকে শন শন শব্দ, সমস্ত শরীর ফুলে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গ দেখা যায়। এছাড়া ফিতা কৃমি বলে এক ধরনের কৃমি আছে। ফিতা কৃমি সাধারণত: গরুর মাংস এবং শুকরের মাংস ভোজীদের মধ্যে হতে দেখা যায়। এগুলো অনেক সময় ১৫-৩০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়। গরুর মাংস বা শুকরের মাংস সঠিকভাবে সিদ্ধ হলে এ জাতীয় কৃমি দ্বারা আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।
প্রতিরোধ এবং চিকিৎসা
সাধারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা যেমন-পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, নখ ছোট রাখা, দাঁত দিয়ে নখ না কাটা, ফলমূল ভালভাবে ধুয়ে খাওয়া, অযথা মুখে বা নাকে খোঁচাখুঁচি না করা, বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির ব্যবহার, পায়খানার পর সাবান বা ছাই দিয়ে হাত পরিষ্কার করা ইত্যাদি যতœসহকারে মেনে চললে অনেকাংশে কৃমির সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকা যায়।
চিকিৎসার জন্য আজকাল বাজারে অনেক ওষধই রয়েছে যেগুলো নিরাপদে খাওয়া যায়। আগের যুগে বেশী গরমে অথবা আকাশে মেঘ থাকলে অভিভাবকেরা তাদের সন্তানদেরকে কৃমির ঔষধ সেবন থেকে বিরত রাখতেন, আজকাল এগুলো কোন সমস্যাই নয়। বাজারে কৃমির ঔষধ পাওয়া যায়। এগুলো শরীরের ওজনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে চিকিৎসকের পরামর্শ মতে খেতে হয়। তবে সবধরনের কৃমির ঔষধ গর্ভাবস্থায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যবহার করতে হবে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: