শব্দদূষণ স্বাস্থ্যহানির কারণ

ড. এজাজ মামুন, ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৭, সোমবার: সম্প্রতি শব্দদূষণ নিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদনে গবেষকরা জানিয়েছেন ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তার শব্দের মাত্রা ৬০ থেকে ৮০ ডেসিবেল আর যানবাহনের শব্দের মাত্রা ৯৫ ডেসিবেল। এমনিভাবে প্রতিনিয়ত মাইক বা লাউড স্পিকার থেকে যে শব্দের সৃষ্টি হচ্ছে তার মাত্রা ৯০ থেকে ১০০ ডেসিবেল, স্কুটার ও মোটরবাইক ৮৭ থেকে ৯২ ডেসিবেল, বাস ও ট্রাক ৯২ থেকে ৯৪ ডেসিবেল। এমনকি খাবারের দোকান কিংবা সিনেমা হলেও শব্দের মাত্রা ৭৫ থেকে ৯০ ডেসিবেল। এই শব্দগুলোর সাথে যোগ হয়েছে গাড়ির হর্ন যার মাত্রা হিসেব করলে লাউড স্পিকারকে হার মানাবে। আমাদের দেশে বিভিন্ন উত্স থেকে যে শব্দ উত্সরিত হচ্ছে তা একই রকম উত্স থেকে তৈরি হওয়া শব্দের গড় মাত্রা থেকে অনেক বেশি। যেমন ধরে নেওয়া হয় রাস্তার ট্রাফিক চলাচল থেকে গড় শব্দের মাত্রা ৭৫ ডেসিবেল, খাবারের দোকানের ৪৫ ডেসিবেল। আর রাতে শহরের সব মিলিয়ে শব্দ মাত্রা ৪৫ ডেসিবেলের ঊর্ধ্বে হওয়ার কথা নয় যা ঢাকা শহরের আবাসিক এলাকাতেই ৫৫ থেকে ৭০র মত হবে বলে অনেকের ধারণা। কাজকর্ম, লেখাপড়া, চলাফেরা, বিশ্রাম, ঘুম বলতে গেলে সবকিছুর জন্যেই মানুষ একটা নিদিষ্ট মাত্রার শব্দ সহ্য করতে পারে। এই মাত্রাকে অতিক্রম করলেই আমাদের এমনকি পশু পাখিদেরও জৈব-প্রক্রিয়া ও জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। আট ঘণ্টা ৮৫ ডেসিবেলের উপরের শব্দ (ভারী যানবাহন থেকে প্রাপ্ত শব্দদূষণের সমতুল্য) মারাত্মক স্বাস্থ্যহানির কারণ হতে পারে। আমরা একটু হিসেব করলেই দেখবো বাংলাদেশে আমরা শব্দ বিভ্রাটে কি এক দুর্বিষহ নাগরিক জীবন-যাপন করছি।
ধরে নেওয়া হতো শব্দদূষণ শুধু আমাদের শ্রবণ শক্তিরই ক্ষতি করছে। আদতে তা নয়।, শব্দদূষণ আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করা থেকে শুরু করে শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে উঠা, উচ্চ রক্তচাপ ও হূদরোগসহ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির এমনকি আমাদের জীববৈচিত্র্যের বিলোপের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শিল্প এলাকার শব্দদূষণের কারণে খোদ আমেরিকাতে এসব এলাকার বসতিদের কমপক্ষে দশ শতাংশ শ্রবণশক্তি হারায় কিংবা তা হ্রাস পায়। আর তাদের নানাদের থেকে ২৫০ শতাংশেরও বেশি যুবকেরা শ্রবণ শক্তি হারায়। প্রায় দশ বছর পূর্বের একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে ইউরোপই শুধুমাত্র শব্দদূষণের প্রতিক্রিয়ার হূদরোগে প্রতি বছর ২,১০,০০০ মানুষ মারা যায়। আমাদের দেশে এ ধরনের কোনো সমীক্ষা চোখে পড়েনি বটে। কিন্তু যেখানে আমাদের দেশে শব্দদূষণের মাত্রা অনেক বেশি সেখানে শ্রবণশক্তি হারানো বা কমে যাওয়া ও হূদরোগে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কত তা সংখ্যায় না জানলেও উপলব্ধি করা মোটেই কঠিন না। গবেষণায় দেখা গেছে, অফিস-আদালতে ও অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে এমনকি আমাদের গৃহে শব্দদূষণ মনস্তাত্ত্বিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে ও মারাত্মক শরীরবৃত্তীয় পরিবর্তন ঘটায়, যেমন হূদকম্পন ও রক্তচাপ বেড়ে যাওয়া। এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে শর্করা ও চর্বির মাত্রাতিরিক্ততা ও স্থূলতার মত হূদরোগের মারাত্মক ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত উপসর্গগুলো দেখা দেয়। এমনকি ঘুমের সময় শব্দদূষণ শ্বাস-প্রশ্বাস, দেহের গতিশীলতা ও হূদকম্পনকে প্রভাবিত করে শরীরের অনেক ক্ষতি করে। শব্দদূষণ শিশুদের বিকাশে মারাত্মক ক্ষতির কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে শব্দদূষণ শিশুদের মানসিক চাপজনিত হরমোনকে বাড়িয়ে দেয়, শিশু পাঠে অমনোযোগী হয়ে উঠে। এধরনের হাজারো মারাত্মক স্বাস্থ্যহানির কারণ শব্দদূষণ। তাছাড়া শব্দদূষণ বিরক্তি, আক্রমণাত্মক আচরণ ও অমনোযোগিতার অন্যতম কারণ।
বন্যপ্রাণিদের ক্ষেত্রে শব্দদূষণের প্রভাব আরো বেশি ভয়াবহ। কারণ তাদের শ্রবণশক্তি আমাদের থেকে অনেক বেশি ও তারা জীবনযাপনের জন্যে শব্দের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। প্রতিনিয়ত শব্দদূষণ তাদের জীবনযাপনে বাধার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শব্দদূষণ তাদের খাদ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ব্যাহত করছে, জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের নগর জীবন থেকে।

নাগরিকের সুস্বাস্থ্য ও স্বাছন্দ্যময় জীবনের জন্যে শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি। উন্নত দেশগুলোতে রাস্তা-ঘাট, কল-কারখানাসহ ভৌত কাঠামো নির্মাণে শব্দের মাত্রাকে বিবেচনায় আনা হয় যাতে নাগরিকের সুস্বাস্থ্য আর স্বাছন্দ্য জীবনে কোনো বিঘ্ন না ঘটে। যানবাহন ও কল-কারখানা থেকে যাতে সর্বনিম্ন শব্দদূষণ হয় সেটা নিশ্চিত করা হয় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ ও আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে। কল-কারখানা থেকে অতিরিক্ত শব্দের কারণে শ্রমিকদের যাতে স্বাস্থ্যহানি না ঘটে তা নিশ্চিত করা হয়।
শিশুরা যাতে অসহ্য শব্দের কারণে পাঠে অমনোযোগী না হয় সে জন্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মোদ্দাকথা, শব্দদূষণ থেকে নাগরিকদের যতটুকু সম্ভব মুক্ত রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
আধুনিকতার দিকে বাংলাদেশ এগুচ্ছে। যানবাহন, কল-কারখানাসহ ভৌত-অবকাঠামোর সংখ্যা বাড়ছে। সরকারের একটি অন্যতম দায়িত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের সুস্বাস্থ্য ও স্বাছন্দ্য জীবনের নিশ্চয়তা দেওয়ার জন্যে পরিবেশের অন্যান্য দূষণ নিয়ন্ত্রণের সাথে সাথে শব্দদূষণকেও নিয়ন্ত্রণ করা। আর নাগরিক জীবনে একজন সভ্য নাগরিক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো আমরা যেন অযথাই যত্রতত্র হইচই, মাইকের গগন বিদারী আওয়াজ ও লাউড স্পীকার ব্যবহার থেকে বিরত থাকি। উন্নত দেশগুলোতে গাড়ির হর্নের ব্যবহার নেই বললেই চলে। ট্রাফিক আইন মেনে চললে আর আমাদের সভ্যতাকে একটু বিকশিত করলে বাংলাদেশেও যে গাড়ির হর্নের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে তা নিশ্চিত করে বলা যায়।
লেখক :অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পলিসি বিজ্ঞানী

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*