লেখা ও সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার করায় ৫ শিক্ষার্থীকে নোটিশ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১১ মে ২০১৯, শনিবার: যৌন নির্যাতনে অভিযুক্ত শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত লেখা ও সংবাদ ফেসবুকে শেয়ার করায় পাঁচ শিক্ষার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীরা সবাই ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে ফেসবুকে ‘অশালীন’ স্ট্যাটাস দেওয়ায় তদন্তের ভিত্তিতে এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আর যাদের লেখা শেয়ার দেওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে তাদের একজন জোবাইদা নাসরিন বলেছেন, ‘গণমাধ্যমে প্রকাশিত নিউজ/ মতামত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার দায়ে কাউকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এদিকে এ ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির সভাপতি বলেছেন,‘আপনার সম্পর্কে কেউ খারাপ কথা বললো, আর আরেকজন লাইক দিলো, দোষ তো দুজনেরই।’
নোটিশ পাওয়া পাঁচ ছাত্র হলেন— সিএসই বিভাগের মো. মেহেদী হাসান, বিষ্ণু চন্দ্র সরকার, মো. মেজবাউল হাসান, মো. রাশেদুজ্জামান শিকদার ও সুকান্ত কুমার ঘোষ। বৃহস্পতিবার (৯ মে) বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মো. নূরউদ্দিন আহমেদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নোটিশ জারির তারিখ থেকে পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে রেজিস্ট্রার বরাবর নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, গত এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহকারী অধ্যাপক মো. আক্কাস আলীর বিরুদ্ধে দুই ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হলে ৭ এপ্রিল থেকে (রোববার) শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করে ওই শিক্ষকের স্থায়ী অপসারণের দাবিতে আন্দোলনে নামে। এর প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মো. আব্দুর রহিম খানকে সভাপতি ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক ড. মো. বশির উদ্দিনকে সদস্য সচিব করে চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটি ১৮ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বোর্ডের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় শৃঙ্খলা বোর্ড অভিযুক্ত শিক্ষক সহকারী অধ্যাপক প্রকৌশলী মো. আক্কাস আলীকে আজীবনের জন্য বিভাগীয় প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি প্রদান করাসহ জানুয়ারি-জুন ২০১৯ হতে জুলাই-ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত ৮টি সেমিস্টারের জন্য অ্যাকাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা বলছেন, বৃহস্পতিবার তারা কারণ দর্শানোর নোটিশ পেয়েছেন। তদন্ত কমিটি তাদেরকে ডেকে কথাও বলেছে। দেশের প্রথম সারির দৈনিকের কোনও কলাম শেয়ার করলে সেটি কেন দোষের হবে, তদন্ত কমিটি অভিযুক্তদের সে বিষয়ে জানিয়েছে।
শোকজ হাতে পেয়ে শিক্ষাজীবন নিয়ে শঙ্কায় থাকা এই শিক্ষার্থীরা বলছেন,বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের নাম প্রকাশ করে মিডিয়ায় কোনও কথা বলা আমাদের পক্ষে সম্ভব না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারণ দর্শানো নোটিশ পাওয়া এক শিক্ষার্থী বলেছেন, তদন্তু কমিটি ডেকে নিয়ে আমাকে অভিযুক্ত করার কারণ জানিয়েছে। কিন্তু যখন নোটিশ দিয়েছে তখন কোন স্ট্যাটাসের জন্য আমাকে দোষী করা হচ্ছে, তা কিন্তু সুনির্দিষ্ট করে বলেনি। আমি নিজে সেটি রেজিস্ট্রার স্যারকে জানালে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত কমিটি বলতে পারবে। তদন্ত কমিটির সঙ্গে যোগাযোগ করে মৌখিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত হলেও কাগজে-কলমে বিষয়টি সুনির্দিষ্ট নেই।
কারণ দর্শানোর বিষয়টির সত্যতা স্বীকার করে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার ড. মো নূরউদ্দিন আহমেদ বলেন,‘বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু ঘটনা নিয়ে শিক্ষার্থীরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ায় সেটা কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং বিষয়টি নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির সুপারিশক্রমে তাদেরকে শোকজ নোটিশ পাঠানো হয়।’ বিশ্ববিদ্যালয় পরিসরে কলাম শেয়ার দেওয়ার জন্য শোকজ নোটিশ দেওয়া যুক্তিযুক্ত কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কোনও লেখা শেয়ারের জন্য এটা করা হয়েছে কিনা, আমি সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারবো না। তবে অশালীন স্ট্যাটাসের জন্য করা হয়েছে বলে আমি জানি।’
সেসময়ে (এপ্রিলে) ‘শিক্ষাঙ্গনে যৌন নির্যাতন বন্ধ করবে কে’ শিরোনামে একটি কলাম লেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক জোবাইদা নাসরিন। তিনি বলেন,
‘গণমাধ্যেমে প্রকাশিত নিউজ/ মতামত সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার দায়ে কাউকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া কোণোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ, প্রকাশিত রিপোর্ট বা মতামতের দায়ভার একেবারেই রিপোর্টার, সম্পাদক এবং লেখকের। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এই ধরনের শাকজ করে তাদের দুর্বলতাই প্রকাশ করেছে এবং এই শোকজ প্রত্যাহারের দাবি জানাচ্ছি।’
বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে আপত্তিকর লেখা বা মন্তব্য ছাত্ররা কী মনে করে শেয়ার দিলো, সেটা তাদের কাছ থেকে লিখিতভাবে জানতে চাওয়াই প্রধান উদ্দেশ্য উল্লেখ করে তদন্ত কমিটির সভাপতি ড. আব্দুর রহিম খান বলেন,‘বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আপত্তিকর কথা লেখা, শেয়ার করা, লাইক দেওয়া এটা তো খারাপ। একজন লিখলো এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কার্যক্রম হয়, যেটা আর কোথাও হয় না। আর কোনও বিবেচনা না করে আমাদের কোনও ছাত্র সেটা শেয়ার দিলো। এটা তো আমরা চাই না। সে চিন্তাভাবনা করুক, আমাদের বলুক। না জেনে-শুনে চট করে শেয়ার দিয়ে দিলো কীভাবে।’ তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রতো কচি খোকা না যে, সে যা মনে আসবে চট করে করে ফেলবে। সে তো এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই ছাত্র। আমার বাপের সম্পর্কে কেউ খারাপ কথা বললো, আর আমি চট করে শেয়ার দিয়ে দিলাম। এটা কী হয় নাকি? এটাই আমরা তাদের কাছে লিখিতভাবে জানতে চাই, কেন তারা কী মনে করে শেয়ার দিলো।’
স্ট্যাটাস শেয়ার করার কারণে এই নোটিশ কিনা প্রশ্নে আব্দুর রহিম খান বলেন,‘স্ট্যাটাস ছাড়াও কিছু আপত্তিকর কথাবার্তার জন্য তাদের শোকজ করা হয়েছে। শিক্ষকরা অভিযোগ করায় তার ভিত্তিতে এটা করা হয়েছে। পত্রিকায় লেখার দায় লেখকের, না যিনি শেয়ার করেন তার, এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কমিটির সভাপতি বলেন, ‘আপনার সম্পর্কে কেউ খারাপ কথা বললো, আর আরেকজন লাইক দিলো, দোষ তো দুজনেরই।’
পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তারা উত্তর দিলে শৃঙ্খলাবোর্ড বসবে, যদি মনে করে বেশি খারাপ কথা লিখেছে তাহলে শৃঙ্খলাবোর্ড শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে, না হলে হয়তো ধমকি-ধামকি দিয়ে ছেড়ে দেবে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*