রেলওয়ের শত একর জমির নিয়ন্ত্রক কাউন্সিলর প্রার্থী পাহাড়তলীর হিরণ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : চট্টগ্রামের পাহাড়তলীর রাজা মোহাম্মদ হোসেন হিরণ। বাংলাদেশ রেলওয়ের কমপক্ষে ১০০ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে তার নিয়ন্ত্রণে। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের জায়গায় অবৈধভাবে গড়ে ওঠা দোকানপাট, ভাড়া বাড়ি, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অফিস, সিএনজি ও রিকশার গ্যারেজ-Hiron Pic-21-04-15
সবকিছু নেপথ্যে থেকেই পরিচালনা করছেন তিনি। জমি দখলে রেখে প্লট করে বিক্রিও করছেন সাবেক এই ওয়ার্ড কাউন্সিলর। তার নিয়ন্ত্রণে ওই এলাকায় রয়েছে মাদক ব্যবসাও। সম্প্রতি রেলওয়ের শতবর্ষী গাছসহ অর্ধশতাধিক গাছ কাটার অভিযোগের তীরও হিরণের বিরুদ্ধে। হত্যা, ভূমি দখলসহ তার বিরুদ্ধে রয়েছে বেশ কয়েকটি মামলা। হিরণ এসব মামলায় জামিনে রয়েছেন। তবে অবৈধ প্রক্রিয়ায় রেলওয়ের জমিতে স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয়ভাবে কিছুটা সহানুভূতিও অর্জন করেছেন বলে জানা যায়। এক্ষেত্রে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে ভোটের হিসাব-নিকাশকে। উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য না থাকলেও চট্টগ্রামে প্রায় দেড় যুগে ধনকুবের বনে যান খুলশী থানা আওয়ামী লীগের এই নেতা। ঝাউতলায় তার তিন তলা একটি বাড়িও রয়েছে। সম্প্রতি ঝাউতলায় তার বিরুদ্ধে একটি গোডাউন দখলের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য মোহাম্মদ হোসেন হিরণের সঙ্গে গতকাল দিনভর যোগাযোগ করেও পাওয়া যায়নি। তার ঘনিষ্ঠজনরা জানান, হিরণ নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত। তাই তার ফোন বন্ধ রয়েছে। রাত পর্যন্ত তার মোবাইলে চেষ্টা করেও কথা বলা সম্ভব হয়নি। জানা যায়, স্থানীয় বিহারি ও হিজড়া সম্প্রদায়ের ‘তথাকথিত’ অভিভাবকত্বের পাশাপাশি হিরণের রয়েছে নিজস্ব ক্যাডার বাহিনীও। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ একাধিকবার উচ্ছেদ অভিযানে গিয়ে পিছু হটেছেন তার অনুগত ক্যাডার, বিহারি ও হিজড়াদের প্রতিরোধের মুখে। গতকাল সরেজমিন ঘুরে সরকারি ভূমি দখলের এসব চিত্র প্রত্যক্ষ করা গেছে। কিন্তু বস্তিবাসীর অনেকেই ভয়ে হিরণের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলতে চাননি। স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের শাসনামলে হিরণ পুরো এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন। ক্ষমতার পালাবদলে ওই এলাকার নতুন ভাগ্য নির্ধারক হয়ে যান চট্টগ্রাম মহানগর জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস কে খোদা তোতন। মূলত হিরণ-তোতনের মধ্যে এক ধরনের গোপন সমঝোতা রয়েছে। অবৈধ স্থাপনা থেকে বিশাল অঙ্কের রোজগার হওয়া এসব অর্থের একটি অংশ তোতনের পকেটেও যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) পূর্বাঞ্চলের চিফ কমান্ড্যান্ট মো. আমিনুর রশীদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরেই পাহাড়তলীসহ বিভিন্ন জায়গায় রেলওয়ের জমি দখল করে রেখেছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। রেল কর্তৃপক্ষ তাদের উচ্ছেদের চেষ্টাও করছে। কিন্তু তারপরও প্রভাবশালীদের নাম ভাঙিয়ে রেলওয়ের বিশাল জায়গা নামে-বেনামে দখল করে রাখা হয়েছে।’ চট্টগ্রাম বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা (উপ-সচিব) মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘চট্টগ্রামে অনেকগুলো অবৈধ স্থাপনা রয়েছে। গত ছয় মাসে প্রায় ৪-৫ একর জায়গা থেকে উচ্ছেদও করা হয়েছে। এ সময় হিজড়াসহ বিভিন্ন লোক বাধার সৃষ্টি করলেও উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তবে বেশির ভাগ জায়গাই স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের কব্জায় থাকায় উচ্ছেদ অভিযান ব্যর্থ হয়। উচ্ছেদের পরই রাতের অন্ধকারে আবারও বসতি স্থাপনা ঘর তোলে দখলদাররা।’ জানা যায়, দখল করা এসব জমি নিয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আফসারুল আমিনের কাছে চিঠিও পাঠান। পরে তিনি বস্তিসহ রেলওয়ের ‘অবৈধ’ জমি উচ্ছেদের উদ্যোগ নিলে হিরণ তাতে বাদ সাধেন। পরে সাবেক এই মন্ত্রীকে বোঝানো হয়, ভোটের আগে এসব বস্তি উচ্ছেদ করা হলে নির্বাচনে প্রভাব পড়বে। এরপর বস্তি উচ্ছেদে আর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এর আগে ঝাউতলা, পাহাড়তলী এলাকায় রেলওয়ের স্টেট বিভাগ কয়েক দফা অবৈধ বস্তিসহ নানা স্থাপনা উচ্ছেদের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু হিরণ সুকৌশলে রেলের অবৈধ স্থাপনায় বসবাসরত দেড় শতাধিক হিজড়া, বিহারি, রোহিঙ্গাসহ নিজস্ব ক্যাডারদের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। হিজড়াদের ‘আপত্তিকর’ অবস্থায় প্রতিরোধের মুখে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ পিছু হটে যায়। জানা যায়, অবৈধ স্থাপনায় প্রায় পাঁচ হাজার দোকানপাট, ইট ও কাঁচা বাড়ি, ক্লাব, বেসরকারি অফিস, রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে মাসিক ভাড়া আদায় করে হিরণের ক্যাডাররা। এ ছাড়া ওইসব স্থাপনা থেকে এককালীন ১ থেকে ৩ লাখ টাকা করেও তোলা হয়। কাগজপত্রে ব্যক্তি মালিকানা না থাকলেও আধা পাকা ইটের বাড়ি কিংবা প্লট করে বিক্রিও করা হচ্ছে। উত্তরে পশ্চিম খুলশী ও জালালাবাদ আবাসিক এলাকা, দক্ষিণে টাইগারপাস কলোনি, পূর্বে এম ই এস কলেজের উত্তর পাশ এবং পশ্চিমে মাস্টার লেইন কলোনি ঘেরা পাহাড়তলীর ১৩ নম্বর ওয়ার্ড। আয়তন প্রায় ছয় বর্গমাইল। এখানে জনসংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার। ভোটার সংখ্যা ৫০ হাজার ৯৯৪ জন। এর মধ্যে হিজড়া, রোহিঙ্গাসহ ভাসমান মানুষের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। আর্থিক সুবিধা নিয়ে এদেরই মূলত অবৈধ জায়গায় পুনর্বাসন করছেন হিরণ। সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, হিরণের দখল করা জমির মধ্যে নিবেদন ক্লাব, যুবলীগ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, জাতীয় পার্টি, যুবদল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয় গড়ে তোলা হয়েছে। রেলওয়ে ডিপ্লোমা অফিসের পাশেই গোয়ালঘর তুলে রাখা হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে মুখ খুলতে পারছেন না রেলওয়ে কর্মকর্তারা। ‘অবৈধ’ স্থাপনায় ওয়ারলেস কলোনি হাইস্কুল, ঝাউতলা কাঁচা বাজার, ওয়ারলেস এক নম্বর মোহাম্মদীয়া মাদ্রাসা, ওয়ারলেস সাত নম্বর রশীদীয়া মাদ্রাসা, সেগুনবাগিচা এক নম্বর খলিলপাড়া মাদ্রাসা, একাধিক মসজিদসহ বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে। সব প্রতিষ্ঠানেরই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকায় মোহাম্মদ হোসেন হিরণ। জানা যায়, রেলওয়ের প্রভাবশালী কর্মচারী শাহজাহানসহ বেশ কয়েকজনের সঙ্গে রয়েছে হিরণের সখ্য। মূলত রেলওয়ের নানা তথ্য শাহজাহানসহ ওইসব কর্মচারীই পাচার করেন হিরণকে। এ ব্যাপারে তার বিরুদ্ধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগও রয়েছে। পাহাড়তলী এলাকায় জাহাঙ্গীর নামে এক সিএনজি চালক জানান, ‘হিরণ পাহাড়তলী এলাকার রাজা। শত শত একর রেলওয়ের জমি তার নামে-বেনামে ভোগদখলে। কিন্তু তার ভয়ে কেউ মুখ খুলতে চান না। তার বিরুদ্ধে কথা বললে ক্যাডার বাহিনীর আক্রমণের শিকার হতে হয়।’ জানা যায়, আসন্ন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ওই ওয়ার্ডে হিরণের একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ২০-দলীয় জোটের মাহফুজুল আলম। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই মাহফুজুল আলমকে এলাকায় যেতে দেননি হিরণ। তার স্ত্রীসহ পরিবারের সদস্যরা প্রচারণা চালালেও তাদের ওপর হামলা করে পোস্টার ব্যানারসহ সব প্রচারপত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। মারধরও করা হয় তাদের। এ বিষয়ে তার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত অভিযোগও করেন মাহফুজুল হোসেনের স্ত্রী খায়রুল জান্নাত। চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপি সভাপতি আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিএনপি-জামায়াতের কাউন্সিলর প্রার্থীর ওপর নানাভাবে প্রতিপক্ষরা হয়রানি ও হামলা করছে। ১৩ নং পাহাড়তলী ওয়ার্ডে কাউন্সিলর, তার পরিবার ও যারা প্রার্থীর পক্ষে গণসংযোগ করতে গিয়েছিল তাদের ওপর হামলা হয়েছে। ১৩ নং পাহাড়তলী ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী মাহফুজুল আলমের ভাই মাহবুব আলম বলেন, প্রতিপক্ষ প্রার্থী রেলের ভূমিদস্যু মোহাম্মদ হোসেন হিরণের বিরুদ্ধে লিখিতভাবে নির্বাচন কমিশনের রিটার্নিং অফিসার বরাবরে অভিযোগ দিয়েও কোনো কাজ হয়নি। এর পর থেকেই পরিবারের ওপর হামলা, পুলিশের উপস্থিতিতেই বাড়িঘর ভাঙচুরসহ নানা ধরনের হয়রানি করছে। রেলওয়ের কেন্দ্রীয় শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান আখন্দ বলেন, রেলের অধিকাংশ জায়গা তো অবৈধ দখলেই আছে। এগুলোর সঙ্গে রেলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জড়িত নন। সাধারণত যে দল ক্ষমতায় থাকে, তারাই এসব দখল করে। রাজনৈতিক দলের নেতাদের নিয়ন্ত্রণেই বিভিন্ন বস্তিবাসী আর সন্ত্রাসীরা বসবাস করছেন। সূত্র : বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*