রামুতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের স্বর্গপুরী উৎসব

অজিত কুমার দাশ হিমু, কক্সবাজার : কক্সবাজারের রামু অঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের স্বর্গপুরী উৎসব এখন সার্বজনীন উদসবে পরিণত হয়েছে। এ উদসবের প্রতিপাদ্য Ramu-Sarghapuri-pic-02.05হচ্ছে প্যাঁচঘর যা সংসার জীবনের পেঁচঘরের মত অত্যন্ত জটিল এবং চক্রময়। এই জটিলতা ও জীবন চক্রকে অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে অতিক্রম করে সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছাতে আমরা বাংলাদেশী হিসেবে একই অঞ্চলভুক্ত মানুষ। আমরা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সুন্দর অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ দেখতে চাই। সারি সারি সাজানো বাগান। কেউ গাইছে আবার কেউ নৃত্যরত। এখানে কোনো রকম দুঃখ কাউকে স্পর্শ করতে পারে না। এই হলো স্বর্গের কল্পিত রূপ। কোনো লোক চাইলেই বহু আকাংক্ষিত এ স্বর্গে পৌঁছাতে পারে না। সংসার চক্রে ঘুরতে ঘুরতে জীবদ্দশার ভালো কর্মের প্রভাবে একপর্যায়ে মানুষ স্বর্গে আরোহণ করতে সক্ষম হয়, আবার পুনর্জন্মগ্রহণ করে মর্ত্যলোকে ফিরে আসে। এমনি ভাবেই ঘুরতে ঘুরতে প্রাণীকুল এক সময় নির্বাণ সুখ লাভ করে। এ ধারণা থেকেই কক্সবাজারের রামু উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারে কৃত্রিম স্বর্গ তৈরি করে দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালায় স্বর্গপুরী উৎসব ও ব্যুহচক্র মেলা উদযাপন করে আসছে। শুক্রবার (১ মে) বিকালে উপজেলার উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারে স্বর্গপুরী উৎসব ও ব্যুহচক্র মেলার আলোচনা অনুষ্ঠানে আলোচকরা এ কথা বলেন। ভোরে প্রভাতফেরী সহকারে বুদ্ধপূজা, সকালে ভিক্ষুসংঘের পিন্ডদান, জাতীয় ও ধর্মীয় পতাকা উত্তোলন, অষ্টপরিষ্কার সহ মহাসংঘদান, ধর্ম দেশনা, অতিথি ভোজন, দুপুরে স্বর্গপুরী উদ্বোধন, দলীয় সঙ নৃত্য, বিকালে ব্যুহচক্র প্রদক্ষিণ ও আলোচনা সভা, সন্ধ্যায় বিহারের প্রয়াত অধ্যক্ষ প্রজ্ঞামিত্র মহাথের’র নির্বাণ সুখ ও দেশ-জাতি এবং বিশ্বশান্তি কামনায় সমবেত প্রার্থনার মাধ্যমে দিনব্যাপী স্বর্গপুরী উৎসব সম্পন্ন করা হয়। রাতে অনুষ্ঠিত হয় সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান। সম্প্রীতি অঞ্চল রামুর উত্তর মিঠাছড়ি গ্রামের স্বর্গপুরী উৎসব হাজারো বৌদ্ধ নারী-পুরুষের মিলনমেলা ও বিভিন্নধর্মের লোকজনের অংশ গ্রহণে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সার্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়। বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সাবেক সভাপতি ও সরকার কর্তৃক সমাজ সেবায় একুশে পদক প্রাপ্ত, রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের’র সভাপতিত্বে বিকালে বিহার প্রাঙ্গনে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। স্বর্গপুরী উৎসব বিহারের সাবেক অধ্যক্ষ প্রয়াত প্রজ্ঞামিত্র মহাথের’র প্রতি উৎসর্গ করা হয় এবং সম্প্রতি পাশ্ববর্তী বন্ধুপ্রতিম দেশ নেপালে সংঘঠিত প্রলয়ংকরী ভূমিধ্বসে নিহতদের উদ্যেশে পূণ্যরাশী দান করেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। অনুষ্ঠানে সম্প্রতি একুশে পদক প্রাপ্ত বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের অধ্যক্ষ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের ও রামু উপজেলা পরিষদের নব নির্বাচিত চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলমকে সংর্বধনা প্রদান করা হয়। উত্তর মিঠাছড়ি প্রজ্ঞামিত্র বনবিহারের অধ্যক্ষ সারমিত্র মহাথের পূণ্যময় এ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন। রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহারের আবাসিক পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু’র মঙ্গলাচরণে ও সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত আলোচনা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ৩১ বীর রামু সেনানিবাসের মেজর এম এ ফখরুল ইসলাম খান প্রধান অতিথি ও রামু উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান রিয়াজ উল আলম, ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) মাহমুদুল করিম, রামু ডিগ্রী কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ আবদুল হক, কক্সবাজার সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ টেলিভিশন কক্সবাজারের সংবাদ প্রতিনিধি জাহেদ সরওয়ার সোহেল, রামু প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি খালেদ শহীদ ও গর্জনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রমুখ বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন। শিল্পী রাজিব বড়–য়ার পরিচালনায় অনুষ্ঠানে উদ্বোধনী সংগীত পরিবেশন করেন স্থানীয় শিল্পীরা। অনুষ্ঠানে উৎসব উদযাপন পরিষদের পক্ষ থেকে পুষ্পস্তবক ও সম্মাননা স্মারক দিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেয়া হয়। প্রসঙ্গত, উত্তর মিঠাছড়ি বিমুক্তি বিদর্শন ভাবনা কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক করুণাশ্রী থের, প্রজ্ঞামিত্র ভিক্ষু-শ্রামণ প্রশিক্ষণ ও সাধনা পরিবেণ পরিচালক শীলমিত্র থের প্রমুখ ভিক্ষু সংঘ অনুষ্ঠানে ধর্ম দেশনা করেন। অনুষ্ঠানে পঞ্চশীল প্রার্থনা করবেন, উদযাপন পরিষদের উপদেষ্টা কল্যাণ বড়–য়া। বিহারে অধ্যক্ষ সারমিত্র মহাথের বলেন, রামু উপজেলা উত্তর মিঠাছড়ি গ্রামে ১৯৬৭ ইংরেজিতে রাখাইন সম্প্রদায় বৌদ্ধ বিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। কালের বিবর্তনে রাখাইন সম্প্রদায় এলাকা থেকে চলে গেলে এ অঞ্চলে বসবাসকারী বড়–য়া বৌদ্ধরা বিহার রক্ষণাবেক্ষণ করে আসছেন। দীর্ঘ বছর ধরে গ্রামবাসীর উদ্যোগে বিহার অধ্যক্ষের পরিচালনায় বিহার প্রাঙ্গনে ব্যুহচক্র মেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। বিহারে তৎকালীন অধ্যক্ষ প্রজ্ঞামিত্র মহাথের ১৯৮২ ইংরেজি থেকে ওই ব্যুহচক্র মেলাকে স্বর্গপুরী নামে উৎসবে রূপান্তর করেন। প্রতিবছর ব্যুহচক্র মেলা ও স্বর্গপুরী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বিগত সময়ে কয়েক বছর স্বর্গপুরী উৎসব আয়োজন করতে পারিনি। এ বছর আবারো ৩০তম স্বর্গপুরী উৎসব হিসেবে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে হাজারো মানুষ এ উৎসবকে সফল করে তোলেন। কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা সহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বৌদ্ধদের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী এ উৎসবে যোগ দিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*