রাজনীতির কারণে অর্থনীতি পর্যুদস্ত

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০৪ জানুয়ারী ২০১৭, বুধবার: রাজনৈতিক বক্তব্যের দিকে তাকালে তা উন্নয়নের স্রোত ও ঢেউয়ে পরিপূর্ণ মনে হয় যা থেকে প্রকৃত অবস্থা যাচাই করা খুবই কঠিন। কারো যদি কোনো প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ থাকে, দেশের কর্মসংস্থান পরিস্থিতির বাস্তব অবস্থা নিয়ে, বিনিয়োগ, অবকাঠামো, সামাজিক সাম্য, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, শিক্ষার মান ইত্যাদি বিষয়ে তাহলে এমন দায়িত্ব নিয়েও বিব্রত হতে হয়।
কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তরে প্রকৃত উত্তরদাতারা যা কিছুই বলুক না কেন তা সত্যি কি না এমন প্রমাণ দেওয়ার সামর্থ্য তারা রাখেন না। নববর্ষের প্রথম দিন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার একটি খবরের শিরোনাম ছিল ‘ব্যাংকিং খাত একটি সুস্থির বছর কাটাল’। গত বছরে দেশের ব্যাংক্ংি খাতের প্রকৃত অবস্থা কেমন ছিল, এ খবরে উম্মোচন হয়েছে কি?
ব্রিটেনে সোনালী ব্যাংকের কার্যক্রম দুর্নীতির খপ্পরে বিপন্ন, ফেনীর এক স্বর্ণ ব্যবসায়ী রুপালী ব্যাংক থেকে প্রয়োজনীয় দলিলাদি ছাড়াই দেড় বিলিয়নের বেশি নগদ টাকা তুলে নিয়েছেন, এ বছরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন টাকায় পৌঁছেছে, গত ফেব্রুয়রিতে এটিএম কার্ড কেলেঙ্কারী ছিল ব্যাংকিং খাতে এক বড় ধাক্কা এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এ যাবতকালের বৃহত্তম সাইবার চুরিতে ৮১কোটি ডলার হাওয়া এমন সব খবর চোখের সামনে চলে আসে।
ব্যাংকিং খাতে এধরনের ‘উন্নয়ন’ সত্ত্বেও জনগণের করের টাকায় পরিচালিত বিএসএস পরিবেশিত খবরটিতে বলা হয়েছে, কোনো বড় ধরনের দুর্নীতির ঘটনা ঘটেনি। খবরে আরো বলা হয়েছে, বরং সরকার সাড়ে তিন বিলিয়ন টাকার তহবিল সোনালী ব্যাংককে যোগান দিয়েছে এবং আরো ২৬ বিলিয়ন টাকা কেলেঙ্কারীতে ধরাশায়ী বা অঘটন পটিয়সী বেসিক ব্যাংককে দেয়া হচ্ছে।
যখন সাংবাদিকতাকে অনুসরণ করা হয়, পেশাগত দায়িত্ব নিয়ে উভয়সঙ্কটে পড়তে হয়, এক নিরন্তর প্রশ্ন যে কারো মনে ঘুরপাক খেতে থাকে কেবল, কোনটি সত্য ? শুধু বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নয় কিংবা প্রতিবাদীদের বক্তব্যের কতটা ভিত্তি রয়েছে তা নিয়েও নয়, তারচেয়ে বরং বেশি আজকের দিনে যা সত্যি হয়ে দাঁড়িয়েছে তা হচ্ছে সংগঠিত একটি প্রচারণা আপনাকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করছে। আপনাকে যা বলা হচ্ছে, তা মিথ্যা হলেও আপনাকে সেটাই সত্যি হিসেবে মেনে নিতে হচ্ছে।
এটা রীতিমত গবেষণার বিষয় যে, পশ্চিমা বিশ্বই এধরনের পদ্ধতি জনমতকে এমনভাবে গঠন করার জন্যে চাপিয়ে দিয়েছে কি না। পশ্চিমা বিশ্বই এ পদ্ধতি আরোপে সবার চেয়ে অগ্রগামী হয়ে আছে সাদাকে কালো বা কালোকে সাদা হিসেবে অলঙ্কারশাস্ত্রের বিষয়বস্তু করার ঘোরতর পথনির্দেশক হিসেবে। নাকি ঔপনিবেশিক আমলের পর আফ্রো-এশীয় রাজনীতিবিদদের এ এক বিকল্প ধারা যা প্রোপাগান্ডা হিসেবে প্রতিধ্বনি তুলছে।
ঘটনা যাই ঘটুক, ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত এ সময়ে একটি মিথ্যা ধারণা থেকে দৃশ্যমান ফায়দা তুলে নেয়ার মত আর কাউকে পারদর্শী দেখা যাচ্ছে না। তার বাকোয়াজ বক্তব্য প্রধান ধারার মিডিয়ায় উপস্থাপনের মধ্যে দিয়ে এমন এক ধরনের আশাবাদ সঞ্চারিত হচ্ছে যা তৃতীয় বিশ্বে অনেক দেশের রাজনীতিবিদ, ওই কুখ্যাত বক্তব্যের মধ্যে নিজেদের প্রতিমূর্তি দেখতে পাচ্ছেন।
যে বৃত্তে রাজনীতি অর্থনীতির পরিপূরক তাদের মধ্যেকার সম্পর্ক বিচ্যুত হচ্ছে অথচ নতুন এক সম্পর্ক তৈরি করে কেন্দ্র ও বৃত্তের চলমান বহতা নদীর মত ধরে রেখেছে। বিশ্বায়ন সুযোগ সৃষ্টি করেছে কিভাবে ধারণা আমদানি করে মত কিংবা জনমতকে নিপূণভাবে পাল্টে দেওয়া যায়। এটা বাংলাদেশ হোক আর ট্রাম্পের দেশ হোক কিছু যায় আসে না। তাই ট্রাম নির্বাচনে জয়লাভ করার সঙ্গে সঙ্গে ঢাকা থেকে সংবর্ধনা বার্তা তার কাছে যথাসময়ে পৌঁছে গেছে।
ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণা টিম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহার করেছিল তাদের উস্কে দিতে যারা মার্কিন রাজনীতি সম্পর্কে ইতিমধ্যে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। একই সঙ্গে প্রধানধারার মিডিয়াকে আজ্ঞাবহ করে রাখার জন্যে রাজনীতিবিদরা যে কৌশল অবলম্বন করেন যা জনমতকেও অনেক সময় নিগ্রহ বা বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দেয়।
যখন প্রধানধারার মিডিয়াগুলো উন্নয়ন কি এমন কোনো প্রশ্নই তোলে না, যখন গণতান্ত্রিক একটি সরকার থেকে সবাই বঞ্চিত হয় অথবা বন্দুকযুদ্ধে যখন নিহতদের মৃত্যুগল্প উঠে আসে, আক্রান্ত পরিবারগুলো যখন অসহায় বোধ করতে থাকে তখন মানুষ কখনো তার অধিকার রক্ষায় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যে যে তথ্যের প্রবাহ প্রয়োজন তা তার কাছে কখনো পৌঁছায় না।
এধরনের স্থিতাবস্থা বরং তাদেরকেই উৎসাহিত করে যারা নিশ্চিন্ত আছেন ও তাদের অনুসারী পরগাছাদেরকেও। তারা মনে করে বিভ্রান্ত মানুষ বিশ্বাস করতে যেয়ে কেবল চিরদিন বিভ্রান্তই থাকে। পশ্চিমা প-িতরা সত্যবিমুখ রাজনৈতিক সময়ে যা বলেছেন, তা এখন আমাদের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
আমাদের প্রকল্পের কোনো অভাব নেই। এধরনের একটি প্রকল্প হচ্ছে বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের তালিকায় যে ১৭৬তম স্থানে রয়েছে তাকে ২০১৯-২০২০ সালের মধ্যে ১০০তম স্থানে নিয়ে আসা। কেন সেই সময়ের মধ্যে তা করতে হবে? তার আগেই নয় কেন? কারণ তখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর নির্বাচনের সামনেই রাজনৈতিক দলগুলো ভোটারদের জন্যে তাদের ইশতেহারে প্রত্যাশা আরো বাড়িয়ে দেন। যা নিন্দুকেরা মূলা অথবা গাজর হিসেবে অভিহিত করে। রাজনৈতিক দলগুলো মনে করে ভোটারদের ইশতেহারের মাধ্যমে কিছু মূলা অথবা গাজর দেওয়া উচিত।
কিভাবে তা দেয়া হবে? ক্যাবিনেট সেক্রেটারি বলেছেন, তারা এমন সব অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করছেন, যা বাস্তবায়ন করা হলে বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ বিনিয়োগে সহায়ক পরিবেশ এনে দেবে।
এধরনের উদ্যোগ কতটা গ্রহণযোগ্য যখন দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তা উপস্থাপন এবং সুশাসনের অভাবে বা কোন কোন কারণে ব্যবসাবান্ধ¦ পরিবেশ সৃষ্টি হতে পারছে না তা চিহ্নিত করা হয় না। এর ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আস্থা ফিরে আসছে না। এসব বুঝে ওঠা কি খুব জটিল? যদি বাস্তব পরিস্থিতি কেউ উপলব্ধি করতে চায়।
যদি ক্যাবিনেট সেক্রেটারি গ্যারান্টি দিতে পারেন যে কোনো দুর্নীতি থাকবে না, তাহলে বিশ্বব্যাংকের তালিকায় বাংলাদেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের সূচক পরিবর্তন হতে শুরু করবে। কারণ নির্মাণ অনুমোদনে, বিদ্যুত সংযোগে, সম্পদ রেজিষ্ট্রেশনে, কর প্রদানে কোনো সমস্যাই আর থাকবে না। যদি বিনিয়োগকারীরা চাঁদাবাজীর হাত থেকে রেহাই পান তাহলে দেশে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের রাতারাতি উন্নতি হবে।
যাইহোক এধরনের উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে রাজনৈতিক প্রচারণার চেয়ে তার যৌক্তিকতাকে শাসকদের উপলব্ধি করতে হবে। ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে এধরনের উন্নয়নের বিজ্ঞাপন কখনো গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করতে পারে না যা বস্তুনিষ্ঠ ও সৎ অথচ গুরুতর সাংবাদিকতা দিতে পারে। শুধু বিজ্ঞাপন দিয়ে ভোক্তাদের মন জয় সাময়িক সময়ের জন্যে করা যায় কিন্তু অধিকাংশই ভীত হয়ে পড়েন যেমন ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজ্ঞাপনে অনেকে হয়েছিলেন।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ট্রাম্পের মিথ্যাকে মিথ্যা হিসেবে অভিহিত করতেও রাজি নয়। মিডিয়াটির প্রধান সম্পাদক গেয়ার্ড বেকার বলেছেন, তার যুক্তি যে বিবৃতি দিলেই তা ‘নৈতিক অভিপ্রায়’ হিসেবে সকলেই মেনে নেবে। নিউ ইয়র্ক টাইমস কার্যকরভাবে ট্রাম্পের বক্তব্যকে অযাচিতভাবে তথ্যের অপব্যবহার বলে চিহ্নিত করেছে। অবশ্য হিলারি ক্লিনটনের বিরুদ্ধে অভিযোগ শেষ পর্যন্ত এফবিআইয়ের তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।
বৈশ্বিক প্রবণতার মধ্যে কিছু মিডিয়া ভীত হয়ে মিথ্যা শব্দটি ব্যবহার করতে চায় না। কারণ এতে যে ঝুঁকি নিতে হয় যা স্পর্শকাতরভাবে নিরাপত্তাকে ব্যাহত করতে পারে।
এটা অবশ্যই জনগণের প্রতি সাংবাদিকদের দায়িত্বকে শেষ করে দেয় না এবং ইতিহাস বলে, জটিল ও ঝামেলা সৃষ্টি করতে পারে এমন সত্যকে উম্মোচন করে দেয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় ভয় পেয়ে যারা মুক্ত ও স্বাধীন মিডিয়াকে ঘৃণা করে তাদের সঙ্গে আপোষ করে শেষ রক্ষা হয় না। সত্যিই সবসময় একটি ভাল বিকল্প।
খাজা মাইন উদ্দিনের প্রতিবেদন থেকে অনুবাদ

Leave a Reply

%d bloggers like this: