রাজনীতিতে আন্দোলন-সংগ্রামই

সালাহউদ্দিন বাবর, ২২ মে ২০১৭, সোমবার: প্রচলিত রাজনীতিতে ক্ষমতা পাওয়া এবং ক্ষমতায় স্থায়ী হওয়ার আন্দোলন-সংগ্রামই লক্ষ করা যায়। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে রাজনীতিকেরা জনকল্যাণ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় কী নীতি-আদর্শ ও নৈতিকতা অনুশীলন করবেন, সে সম্পর্কে তাদের কাছ থেকে তেমন কোনো দিক-ধারণা পাওয়া যায় না। নির্বাচনের প্রাক্কালে জনগণের জন্য নির্বাচনী ইশতেহার নামে একটি ‘পবিত্র’ পুস্তিকায় একগাদা প্রতিশ্রুতি থাকে বটে, কিন্তু সেই ‘পবিত্র’ পুস্তিকা পবিত্র বলে হয়তো তুলে রাখা হয়। আর তা দেখা ও স্মরণ করা হয় না। সম্ভবত নির্বাচনের আগে রেওয়াজ পালনের জন্যই এমন ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের এ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তারা কিছু স্মরণ করতে পারেন না। সেই রুটিন কর্মটিই এখনো প্রতিপালিত হয়ে আসছে। যেমন একটি প্রবাদ রয়েছেÑ কাজীর গরু কেতাবে আছে, কিন্তু গোয়ালে নেই। নির্বাচনী ইশতেহারে সন্নিবেশিত প্রতিশ্রুতিগুলো পরে বেমালুম ভুলে যাওয়া হয়, আর কখনো তা নিয়ে উচ্চবাচ্য করা হয় না। নিছক কথার কথা বলে তা মূল্যহীন হয়ে যায়। সময়ের পরিক্রমায় বহু ক্ষেত্রেই পরিবর্তন দেখা গেলেও এ ক্ষেত্রে কোনো হেরফের হয় না। রাজনীতির এই ধারার অবশ্যই পরিবর্তন হওয়া দরকার। নিছক ক্ষমতা দখল ও স্থায়ী করার যে কৌশলী রাজনীতিতে চলছে, এই ঐতিহ্য থেকে সরে আসতে হবে। রাজনীতির অঙ্গনে বিতর্ক হবে কোন দল ক্ষমতায় গিয়ে কতটা কল্যাণমুখী কাজ করবে এবং দেয়া প্রতিশ্রুতির কতটা রক্ষা করবে।
এই পটপরিবর্তন ঘটলে সমাজ ও রাষ্ট্রে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। শুভ সূচনা হবে একটি নতুন অভিযাত্রার। রাজনীতি হোক মানুষের কল্যাণে নিবেদিত। বর্তমান ধারার রাজনীতি দেশের মানুষের অধিকার ও জীবনযাত্রাকে মসৃণ করছে না। এ ছাড়াও বহু সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। মানুষের জন্য রাজনীতি না হয়ে হচ্ছে রাজনীতির জন্য মানুষ। এই নীতি এখন অনুসৃত হচ্ছে। রাজনীতি যদি মানুষের জন্য হতো, তবে সে ক্ষেত্রে সততা নৈতিকতা নীতিবোধ প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করত। কিন্তু এখন আর বিপরীত হচ্ছে। ব্যক্তিস্বার্থের কারণে সামগ্রিক স্বার্থ বিপন্ন হচ্ছে। দুর্নীতি স্বজনপ্রীতি অনৈতিকতা প্রাধান্য পাচ্ছে। তাতে দেশের মূল্যবোধ, উন্নয়ন অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। যেকোনো রাজনীতি তা অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও যখন তা অন্য কোনো রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রভাবিত করা হয়, তখন দেশের নেতাদের যোগ্যতা ও দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। বিদেশী রাষ্ট্রের অযাচিত ও অবাঞ্ছিত প্রভাববলয় বাড়তে থাকলে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে পারে। তাতে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের স্বার্থ এবং স্বাতন্ত্র্য গৌণ হয়ে পড়ে। রাজনীতিতে সামগ্রিক স্বার্থের ব্যাপারটি ফিরিয়ে আনতে হবে। তাহলে জনগণ সুফল পাবে, হতাশা কাটবে, দেশ এগিয়ে যাবে। এটা করতে পারলে রাজনীতি আর পেশা হিসেবে থাকবে না। জনসেবায় রূপান্তরিত হবে।
রাজনীতিতে যারা ভূমিকা রাখবেন, তাদের একটি বিশেষ উদ্দেশ্য থাকতে হয়। রাজনীতিকে মনে করতে হবে একটি মহত্তর আদর্শ। নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের প্রাধান্য দিতে হবে। সব মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকা প্রয়োজনীয়  মানবিক গুণ। কিন্তু যারা রাজনীতি করবেন, তাদের এই গুণ শুধু থাকলেই চলবে না, তা সব সময় বিকাশমান থাকতে হবে। আমাদের দেশে আগে যারা রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, সারা জীবন যারা রাজনৈতিক অঙ্গনে বিচরণ করতেন, তাদের ধ্যানধারণা ছিল জনগণের পাশে থেকে তাদের সুখ-দুঃখে শরিক থাকা। এখন রাজনীতিতে এই ধারা আর অবশিষ্ট নেই। পাল্টে গেছে অতীতের সেসব মূল্যবোধ। আগে যারা রাজনীতিতে জড়িয়ে থাকতেন, পেশাও ছিল ভিন্ন আর আচরণেও ছিল পার্থক্য। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যাবে, যারা রাজনীতি করতেন তারা ছিলেন শিক্ষক, অধ্যাপক, মধ্যবিত্ত কৃষিজীবী ও আইনজীবী। বাংলাদেশে রাজনীতিতে যারা বরণীয় পুরুষ, সেসব মানুষের বেশির ভাগই ছিলেন উপরোল্লিখিত শ্রেণীর প্রতিনিধি। হালে এর পরিবর্তন ঘটেছে। তাদের রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়তে হয়েছে। এসব ব্যক্তির রাজনীতিতে ত্যাগ ও সাধনা ছিল। এসব গুণীজনের নেতৃত্বেই দেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে।
এখন ত্যাগ আর সাধনার রাজনীতি নেই। সে স্থলে ভোগের বিষয়টি মুখ্য হয়ে উঠেছে। যদি পরিসংখ্যান নিয়ে আলোচনা হয়, তবে দেখা যাবে, দেশের রাজনীতিতে ত্যাগী সাধক রাজনীতিবিদ ও কর্মীর প্রভাব দিন দিন কমে যাচ্ছে। পক্ষান্তরে ব্যবসায়ী শ্রেণীর প্রভাব বাড়ছে। ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা ছিল ১৫ শতাংশ। ১৯৭৯ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫ শতাংশ। ১৯৯৬ সালে সংসদে ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি ছিল ৪৮ শতাংশ। ২০০১ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫১ শতাংশে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মোট সংসদ সদস্যের ৬৩ শতাংশই ছিলেন ব্যবসায়ী। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৯ শতাংশ। এতে প্রমাণ হয়, ক্রমান্বয়ে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে ব্যবসায়ীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেড়ে চলেছে এবং প্রকৃত ও সাধক রাজনীতিকদের সংখ্যা কমছে। ফলে রাজনীতির চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য পাল্টে যাচ্ছে। ত্যাগের রাজনীতি অপসারিত হয়েছে, স্থান দখল করছে ভোগবাদিতা। রাজনীতির ক্ষেত্রে এই দর্শনের পরিবর্তন ঘটায় রাজনীতি এখন অর্থ উপার্জনের যন্ত্রে পরিণত হয়েছে। অতীতে দেখা যেত তৃণমূল থেকে রাজনীতিক ও রাজনীতির ধারা গড়ে উঠত। অনেক ত্যাগতিতিক্ষা আর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তাদের আসতে হতো। এখন আর তা নয়। ওপর আরোপিত রাজনীতিক তারা। ত্যাগতিতিক্ষার কোনো পরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। রাজনীতির এই নব্যধারাকে সরিয়ে আবার সাবেকি নিয়মে ফিরে আসতে না পারলে রাজনীতি কলুষমুক্ত হবে না।
আগের রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা একই নীতির আদর্শে আবদ্ধ থাকতেন বলে তাদের মধ্যে ছিল সম্প্রীতির সম্পর্ক। দলের নীতি এবং জনকল্যাণে তারা থাকতেন নিবেদিত। নিজেদের পকেটের পয়সা দিয়ে তারা রাজনীতি করতেন। কোনো কিছুর বিনিময় বা প্রাপ্তির আশায় রাজনীতি করতেন না। নেতাদের নির্দেশনা, দেশ ও জনগেণর স্বার্থকে তারা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন। কোনো লোভলালসা তাদের সেই পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারত না। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের আদর্শের প্রতি তাদের কোনো মোহ বা আগ্রহ ছিল না বটে, কিন্তু পরস্পর সহমর্মিতা ও সুসম্পর্ক বজায় রেখে তারা চলতেন। প্রতিটি দল জনসমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের সাথে প্রবল প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতো, কিন্তু পরস্পর প্রতিহিংসাপরায়ণ ছিল না। রাজনীতিতে পরস্পর কুশল বিনিময় সংলাপের প্রচলন ছিল। জাতীয় দুর্যোগ বা জাতীয় ইস্যুতে তারা ঐক্যবদ্ধ থাকত। অথচ আজ রাজনীতিতে আগের সেই চল এখন নেই। সব কিছু পাল্টে গেছে। দলের নেতাকর্মী বিভিন্ন গ্রুপ বা উপদলে বিভক্ত হয়ে আছেন। এই বিভক্তি শুধু নির্দিষ্ট কোনো স্থানে বা অঞ্চলে, এমন নয়। দলের বিভিন্ন স্তরে এবং এলাকায় তা ছড়িয়ে আছে। এই বিভক্তির জের হিসেবে নেতাকর্মীদের পারস্পরিক সম্পর্ক ঐক্য সূত্রে আর বাধা নয়, শতধাবিভক্ত। পরস্পর শ্রদ্ধা সহমর্মিতার পরিবর্তে সংঘর্ষ-সঙ্ঘাতে তারা জড়িয়ে পড়ছেন। ভাবতে অবাক লাগে, এসব সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের ফলে এক কর্মী অপর কর্মীর হাতে নিহত হচ্ছেন। আগে যেমন নেতাকর্মীরা দলের নীতি-আদর্শে উদ্বুদ্ধ হতেন, এখন ক্ষমতা প্রতিপত্তি অর্থসম্পদের জন্য তারা মরিয়া। এখন রাজনীতির লক্ষ্য নিছক বৈষয়িক। রাজনৈতিক কর্মীরা রাজনীতিতে জড়িত হন জনসেবা বা নীতির বাস্তবায়নের জন্য নয়, সমাজে যেকোনোভাবে হোক নিজের আসন পোক্ত করাই এখন উদ্দেশ্য। এখন রাজনৈতিক দলের মধ্যে সম্পর্ক সাপে-নেউলের মতো। সামাজিক যোগাযোগ বা পরস্পর সংলাপের কোনো রেওয়াজ আর নেই। কোনো বিষয়েই আর জাতীয় ঐক্য তৈরি হয় না। রাজনীতির উল্লেখিত মৌলিক বিষয়গুলোর যদি পরিবর্তন না ঘটানো যায়, তবে দেশে সুস্থধারার রাজনীতি বিকশিত হতে পারবে না।
দেশে আজ মূল্যবোধ নৈতিকতা ও সুশিক্ষার অভাবে নানা অনিয়ম-অনৈতিকতা ও কুশিক্ষার প্রসার ঘটেছে। এতে সুনাগরিক ও সুশিক্ষিত সুশৃঙ্খল জনশক্তি গড়ে উঠছে না। এসব সৎগুণের অনুপস্থিতিতে নানা উপসর্গ সমাজে বিস্তৃত হচ্ছে। ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শিক্ষার অভাবে এখন ধর্মের নামে বিশেষ করে ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা করে উগ্রবাদ ও প্রতিহিংসাপরায়ণ বিষবাষ্প দেশের একশ্রেণীর তরুণকে বিপথগামী করেছে। তাদের ভ্রান্ত কর্মকাণ্ডে নানা স্থানে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে। এতে বহির্বিশ্বে দেশের ভাবমর্যাদা ুণœ হচ্ছে এবং দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। এসব বিভ্রান্ত তরুণের ভুলের খেসারত দিতে দেশে বিভিন্ন প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। দেশের আইনশৃঙ্খলার অবনতিতে জনগণের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও নৈতিকতার অনুশীলন না থাকায় সমাজে অপরাধপ্রবণতা বেড়েছে। কুশিক্ষার কারণে এবং আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার অভাবে দেশে যোগ্য দক্ষ নাগরিক তৈরি হচ্ছে না। আগামীতে দেশের গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য উপযুক্ত নাগরিকের অভাবে দেশ পিছিয়ে পড়বে। নৈতিকতার অভাবে আমানতদারিতার সঙ্কট দেখা দিয়েছে, রাষ্ট্রের সর্বত্রই নৈতিকতার অভাবে নানা সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে। অথচ আগে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অভাবে এতটা সমস্যা ছিল না। দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো অভাব নেই, কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষালয়ের ঘাটতি ব্যাপক। জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। চর্চার প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে। যারা এখন শিক্ষকতা পেশায় জড়িত, যাদের নিজেদের যোগ্যতা মানোত্তীর্ণ নয়। প্রযুক্তিহীন, নৈতিকতাবিহীন শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো আলোচনা বা এসবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে কোনো তর্কবিতর্ক নেই।
সুশাসন কথাটি রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত একটি শব্দ। জনগণ তাদের মনোনীত প্রতিনিধিদের সরকারে পাঠায় দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য। অর্থাৎ সরকার এভাবে দেশ পরিচালনা করবে, যাতে মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে উন্নয়ন, অগ্রগতি, সুবিবেচনা ও ন্যায়বিচার পাবে। দেশ প্রশাসন চলবে নীতি-আদর্শ ও আইনের আওতায়। কেউ বঞ্চনার শিকার হবে না। বিধিবিধান অনুসারে সে তার প্রাপ্য পাবে কোনো ব্যতিক্রম ছাড়া। সব ধরনের মৌলিক অধিকার তারা ভোগ করবে বাধাবিপত্তি ছাড়াই। সব নাগরিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে ধর্ম-বর্ণ-ভাষা নির্বিশেষে আইনানুগ আচরণ পাবে। পাবে জানমালের নিরাপত্তা। সুশাসনের এই বিষয়গুলো এখন তাত্ত্বিকভাবে উপস্থিত থাকলেও বাস্তবে কিন্তু এর চর্চা নেই। ক্ষমতাসীনদের মধ্যেই সুশাসনের প্রতিষ্ঠা সম্ভব। তা ছাড়া সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আর যাদের ভূমিকা রয়েছে, তাদের এ ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ এবং ব্রতী হওয়ার জন্য সরকারকেই প্রয়াস চালাতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সরকারের আচরণ এ ক্ষেত্রে যেমন সহায়ক নয়, তেমনি অন্য যাদের সুশাসনে দায়দায়িত্ব রয়েছে তাদের এ কাজে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেই। সুশাসন নিশ্চিত করার ব্যাপারে সরকারের যে অঙ্গ রয়েছে, সেসব সংস্থাকেও ন্যায়নিষ্ঠা নির্দেশ দেয়ার ব্যাপারে সরকারের পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ করে বলে সব মহলেই অভিযোগ রয়েছে।
এখন প্রশাসনের যে কর্মকাণ্ড তা পদে পদে সুশাসনের মূল চেতনার বিপরীত। যেমন বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম চলছে, তার যেন কোনো শেষ নেই। যারা এসব অত্যাচারের শিকার তাদের স্বজনেরা দুঃখ, ক্ষোভ ও আতঙ্কিত জীবন যাপন করছে। তা ছাড়া সাধারণ মানুষও ভয়ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জবীন যাপন করছে। কখন না এমন বিপদ তাদের ঘাড়ে এসে পড়ে। সম্প্রতি একটি বিষয় সমাজে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা হলো নারী ও শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতন। সংক্রামক ব্যাধির মতো তা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। দেশব্যাপী খুন, জখম ও সন্ত্রাসের ঘটনা প্রশাসনের সামনে ঘটছে। আর এসব অপকর্মের সাথে সমাজের ক্ষমতা ও প্রভাবশালীরাই জড়িত। ফলে আইনের শাসন সেখানে আর কার্যকর হয় না। এসব অঘটনের শিকার মানুষের দীর্ঘ নিঃশ্বাসে দেশের বায়ু ভারী হয়ে উঠেছে। মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগ তথা আদালত এখন আর ভালো নেই। তাই দেশের প্রধান বিচারপতি আক্ষেপ করে বলেন, দেশে এখনো পূর্ণ আইনের শাসন নেই। তিনি বলেন, অন্যান্য দেশে প্রধান বিচারপতিরা এত কথা বলেন না। কারণ, সেসব দেশে আইনের শাসন রয়েছে। কিন্তু আমাদের বলতে হয়, আমাদের কথা বেশি বের হয়। কারণ, এখনো দেশে পূর্ণ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পায়নি। দেশে সবার জন্য সমান আইন হওয়া উচিত। না হলে সরকারের ভিশন ২০২১ বা ২০৪১ বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়বে। এমন পরিস্থিতির অবসান হওয়া প্রয়োজন।
দেশের রাজনীতিতে যে ভাষা এখন প্রচলিত, তাতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা বিনয় আর নেই। একে অপরের দিকে যে বাক্যবাণ ছুড়ে দেয়, সেখানে ভদ্রতার লেশমাত্র থাকে না। গণতন্ত্রের ভাষা পরিশীলতা হয়ে থাকে। সে ভাষায় আক্রমণ থাকে কিন্তু শালীনতা অতিক্রম করে না। ব্যক্তিগত আক্রমণ তাতে থাকে না। অথচ এখন রাজনীতিকেরা প্রতিপক্ষকে যে ভাষায় কথা বলেন, অনেক ক্ষেত্রে তা ভদ্রতা সহনশীলতার মাত্রা অতিক্রম করে। দলে দলে নীতি কর্মকাণ্ড নিয়ে কথা হয় স্বল্প। এর পরিবর্তে অকারণ বিতর্ক হয় বেশি মাত্রায়। আইনসভায় নানা বিষয়ে যে আলোচনা ও বিতর্কের অবতারণা হয়ে থাকে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে, এসব আলোচনা-বিতর্ক হওয়াই রেওয়াজ। কিন্তু তেমন আলোচনা হয় কদাচিৎ। তার চেয়ে বরং বিরোধী দলের অকারণ সমালোচনা করতে ক্ষমতাসীন দলের আইনসভার সদস্যদের উৎসাহ লক্ষ করা যায়। অবাক হওয়ার বিষয়, এসব আলোচনা ও বক্তব্যে ব্যক্তিগত আক্রমণই থাকে বেশি। আর সে আক্রমণ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভদ্রতা ও শালীনতার মাত্রা অতিক্রম করে। আইনসভার মূল্যবান সময় এভাবেই অপচয় হয়ে থাকে। অথচ আগের আইনসভার আলোচনার প্রসিডিং যদি দেখা যায়, তবে আমরা দেখতে পাবো সে আলোচনার বিষয় এবং বাচনভঙ্গি অত্যন্ত উন্নত। তাই আগের সেই দিনগুলোতে আমাদের ফিরে গিয়ে আগের সেই বাক্য-আলাপের প্রচলন করি।
দেশের দুর্নীতি অনিয়ম ইদানীং খুবই বিস্তৃত হয়ে পড়েছে। এতে শিউরে ওঠার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। দুর্নীতির আবর্তে যখন সব কিছু তলিয়ে যাওয়ার অবস্থা, তখন যাদের রাষ্ট্রতরীর দুর্নীতি-অনিয়ম প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা, সেসব সংস্থার কর্তাদের নির্লিপ্ততা অবলোকন করে নিরোর কথা স্মরণে আসছে। ভেসে উঠছে রোম দগ্ধ হওয়ার ইতিহাস। দেশের হাল যেন অনেকটা সেই রোমের মতো। দুর্নীতি চলছে বাধাহীনভাবে। দুর্নীতির সাথে যারা জড়িত তাদের ক্ষমতা প্রতিপত্তি এতটা ব্যাপক যে, তাদের কালো হাত এতটা উচ্চতে পৌঁছতে পারে যে তা কল্পনার বাইরে। এই কালো হাত এতটা বেপরোয়া যে, সব নিয়মকানুনকে তারা তোয়াক্কা করেন না। এ এক শক্তিধর মহীরুহ।
সম্প্রতি বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রসার নিয়ে বোমা ফাটিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংস্থা গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি। তাদের প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত দশ বছরে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে দেশী মুদ্রায় তিন লাখ ৫৮ হাজার কোটি টাকা। এ হিসাবে প্রতি বছর গড়ে পাচার হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এভাবে দেশের যে বিপুল অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে তার একটি মাত্র কারণ দুর্নীতি। এভাবে দেশের সম্পদ পাচার রোধ করতে হলে অবশ্যই দুর্নীতি রোধ করতে হবে। এ ছাড়া ভিন্ন কোনো পথ নেই। আমরা লক্ষ করেছি, সরকারের শুভ উদ্যোগও দুর্নীতির কারণে তা থেকে জনগণ কোনো উপকার পায় না। এখানে একটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, দুস্থ মানুষের ১০ টাকা কেজি চাল বিক্রির ব্যবস্থা করেছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের সমর্থকেরা দুর্নীতি করে এই উদ্যোগ ভেস্তে দিয়েছে। এই চাল সামর্থ্যবান সমর্থকেরা দুস্থদের কাছে বিক্রি করতে না দিয়ে নিজেরাই নিয়ে নিয়েছে। দেশে এবার প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিপুল পরিমাণে শস্য নষ্ট হয়ে গেছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে এই দুর্যোগ দেখা দিয়েছে। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে এবার খাদ্য ঘাটতির কারণে অভাব উঁকি দিতে পারে। দুর্নীতি যদি রোধ করা না যায় এবং এখন থেকেই সতর্ক না হওয়া যায়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সমাজ থেকে দুর্নীতি রোধে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নেয়া উচিত।
অর্থপাচারের অনিয়ম নিয়ে তদন্ত করবে বাংলাদেশ ব্যাংক। এমন ঘোষণা এসেছে তাদের কাছ থেকে। কিন্তু বছরের পর বছর অর্থ পাচার হয়ে আসছে, তার কোনো খবর তাদের কাছে ছিল না। বিদেশী সংস্থা এ খবর দেয়ার পর এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, এতকাল কোথায় ছিলেন। শুধু বাংলাদেশ ব্যাংক নয়, যারা দুর্নীতি নিরোধের জন্য কাজ করেন তারাই বা কী করেছেন? বাংলাদেশ ব্যাংক এখন বলছে, পাচার হওয়া অর্থ সম্পর্কে তারা অনুসন্ধান বা তদন্ত করবে। কিন্তু নিজেদের রিজার্ভ থেকে বিপুল অর্থ লোপাট হয়েছে, সেই তদন্তের প্রতিবেদন কোথায়। অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে বলা হয়েছিল, তারা তদন্ত করবে এবং তার রিপোর্ট পেশ করবে। রিপোর্ট যথারীতি তৈরি ও পেশ হয়েছে, কিন্তু প্রকাশ করা হয়নি। সম্ভবত এ কারণে তা প্রকাশ করা হয়নি, এতে অনেক জারিজুরি বেরিয়ে আসবে। তখন আর সামাল দেয়া যাবে না।
বর্তমান সময়ে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতির কথা বলা হলো, তার প্রতিবিধানের পথ হচ্ছে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠান। ইদানীং লক্ষ করা যাচ্ছে সর্বত্র একটা অস্থিরতা, ক্ষোভ ও হতাশা। এটা কোনোক্রমেই ভালো লক্ষণ নয়। যাদের হাতে দেশ পরিচালনার ভার তাদের হতাশা ও ক্ষোভ কান পেতে শুনতে হবে। বিপর্যয় প্রতিরোধে সবাইকে নিয়ে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*