মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী ঐতিহাসিক ফতেহপুরসিক্রী

সোহেল মো. ফখরুদ-দীন : আগ্রার তাজমহল পরিদর্শন শেষে আমি সহ বাংলাদেশের আরো আটজন ভ্রমণ সহযাত্রী নিয়ে এককালের বিখ্যাত মুসলিম ও মোগল স্থাপনা ফতেহপুরসিক্রী দেখার জন্য রওনা হই। ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৫ দুপুরে আমরা একটি ভাড়া করা তাপ অনুকূল বাস যোগে ফতেহপুরসিক্রীর প্রধান গেইটে পৌঁছি। আমার সাথে এই যাত্রায় বাংলাদেশের আরো যারা Fatehpur Sikriছিলেন, বন্ধুবর আবদুর রহিম, ডায়মন্ড সিমেন্ট লিমিটেডের পরিচালক লায়ন আলহাজ্ব হাকিম আলী, এম এ মারুফ, মিসেস মারুফ, মঞ্জুর মোর্শেদ সোহেল, ফাহমিদুল হাসান তাহমিদ, শেখ মনছুর, শেখ জাহিদ। আমরা গেইট থেকে অন্য আরেকটি ভ্রমণ বাস নিয়ে দুর্গের ভিতরে প্রবেশ করি। এক পাশে মিউজিয়াম, অন্যপাশে সাধারণ জনগণের জন্য বিশাল পরিত্যক্ত দুর্গ। আমরা পরিত্যক্ত দুর্গ দিয়ে প্রবেশ করলাম। একে একে স্থাপনা আর স্থাপনা। পাহাড়ের উপরে ফতেহপুরসিক্রী। পাহাড় থেকে পুরো রাজ্য ও রাজ্যের বিভিন্ন অংশ দেখা যাচ্ছে। এক অদ্ভুত স্মৃতিময় ফতেহপুরসিক্রী। আগ্রার তাজমহল থেকে ২৩ মাইল পশ্চিমে ঐতিহাসিক ফতেহপুরসিক্রীর অবস্থান। ১৫৬৯ থেকে ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফতেহপুরসিক্রী মোগল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে সিক্রীতে বিখ্যাত দরবেশ শেখ সলীম চিশতী বাস করতেন। আকবর ঐ দরবেশের একজন ভক্ত ছিলেন। পুত্র সন্তান না হওয়ায় সম্রাট আকবর মাঝে মাঝে সিক্রীতে গিয়ে তাঁর দোয়া প্রার্থনা করতেন। একদা সলীম চিশতী তাঁকে জানান, আল্লাহ তাঁর প্রার্থনা মঞ্জুর করেছেন এবং তাঁর একাধিক পুত্র সন্তান হবে। অতঃপর ১৫৬৯ খ্রিস্টাব্দে এক পুত্র জন্মগ্রহণ করলে সম্রাট আকবর সলীম চিশতীর নামানুসারে তাঁর নাম রাখে সলীম (পরবর্তীকালে সম্রাট জাহাঙ্গীর)। অধিকাংশ ইতিহাসবিদ সলিমকে সেলিম বলে উল্লেখ করেছেন। মুরাদ ও দানিয়েল নামে সম্রাট আকবরের আরও দু’পুত্র জন্মে। সলীম চিশতীর উপর আকবরের অগাধ বিশ্বাস ও ভক্তি ছিল। তাঁর দোয়াতে জ্যেষ্ঠপুর শাহজাদা সেলীম এর জন্ম হয়েছে এই বিশ্বাসে সম্রাট আকবর রাজদরবার সিক্রীতে স্থানান্তর এবং তথায় সুরম্য নগরী নির্মাণের কাজ শুরু করেন। ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে গুজরাট জয়ের পর নতুন নগরের নামকরণ করেন ফতেহাবাদ কিন্তু লোক মুখে ফতেহপুর নাম চালু হয়। সম্রাট ১৫৬৯ থেকে ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ফতেহপুরসিক্রীতে বাস করেন। ১৫৮২ খ্রিস্টাব্দে ফতেহপুর হ্রদের বাঁধ ভেঙ্গে সমস্ত শহর ডুবে গেলে সম্রাট আগ্রায় দরবার স্থানান্তর করেন।Fatehpur Sikri (1)
সম্রাট এক কোটি ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে প্রায় ১ দশমিক পঁচাত্তর বর্গমাইল এলাকার উপর ফতেহপুর নগরটি প্রতিষ্ঠা করেন। নগরীট ১৫৮৩ খ্রিস্টাব্দে পরিত্যক্ত হলেও অদ্যপি মোগল স্থাপত্যের উজ্জ্বল নিদর্শনরূপে বিদ্যমান। এককালে এখানে ২৯০০টি অট্রালিকা ছিল। ফতেহপুর সিক্রীর দূর্গে তখন ৬০ হাজার সৈন্য বাস করতো। দিল্লীর লালকেল্লা ও আগ্রার দুর্গ প্রসাদের চেয়ে ফতেহপুর দুর্গ আকারে অনেক বড় এবং অধিক জাঁকজমকপূর্ণ ছিল। নগরীর প্রধান প্রবেশ পথের পার্শ্বে বিরাট বিরাট হস্তী মূর্তি রয়েছে।
১৫৭১ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট আকবর ফতেহপুর জামে মসজিদ নির্মাণ করেন। এটা উপমহাদেশের অন্যতম বৃহত্তম মসজিদ। ৫৪২৪৩৮ পরিমাণ স্থানে বিশাল অভ্যন্তরীণ প্রাঙ্গণযুক্ত। তিনদিকে কক্ষ শ্রেণী এবং প্রত্যেক ধারের মধ্যস্থলে আয়তাকার ফটক। মসজিদের প্রধান কক্ষের উপর বৃহত্তম কেন্দ্রীয় গম্বুজ। প্রত্যেক ধারের কোণেও গম্বুজ আছে। গম্বুজের মধ্যবর্তী স্থানে ছোট ছোট কিয়সক-এর সারি। সমগ্র অভ্যন্তর ভাগে কড়ি ও খিলানের অদ্ভুত সমন্বয় নির্মাণ শিল্পের পরিপূর্ণতার নিদর্শন।
জামে মসজিদের দক্ষিণ দিকের ফটকের নাম বুলন্দ দরজা। সম্রাট আকবর ১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দে দাক্ষিণাত্য বিজয়ের স্মারক হিসেবে এটা নির্মাণ করেন। ফটক হলেও এটা স্বতন্ত্র ও বৈশিষ্ট্যপূর্ণ সৌধ। ৪২ ফুট উচ্চ সোপানশ্রেণীর পর ১৩৪ ফুট উচ্চ। রাস্তা থেকে মোট উচ্চতা ১৭৬ ফুট। সম্মুখে ৮৬ ফুট চওড়া একটি কেন্দ্রীয় দ্বারপথ ও এর দুপাশে কোণাকুণিভাবে পেছনে সরানো আরও দুটি রাজপথ। এর সম্মুখভাগের কারুকার্য মনোরম।
১৫৭২ খ্রিস্টাব্দে সলীম চিশতীর মৃত্যু হলে আকবর বহু অর্থ ব্যয়ে তাঁর কবরের উপর সুন্দর সমাধি সৌধ নির্মাণ করেন। মাজার গৃহের ভেতরের কারুকার্য অতি সুনিপুণ। সলীম চিশতীর সমাধির উত্তর প্রান্তে ইসলাম খানের সমাধি সৌধ। ইসলাম খান ছিলেন শেখ সলীম চিশতীর পৌত্র। সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে তিনি ১৬০৮ থেকে ১৬১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত বাংলার সুবাদার ছিলেন। ইতিহাসের ছাত্রমাত্রই জানেন ইসলাম খান ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে এপ্রিল মাসের প্রথমদিকে ঢাকায় রাজধানী স্থাপন করেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীরের নাম অনুসারে এর নাম রাখেন জাহাঙ্গীরনগর। ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে ভাওয়ালে শিকার করতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। ২১ আগস্ট এই উদ্যোগী দৃঢ়চিত্ত ও সফলকাম শাসনকর্তার মৃত্যু হয়। ইসলাম খানের লাশ প্রথমে ঢাকা পুরাতন হাইকোর্টে হযরত খাজা শরফুদ্দিন ওরফে খাজা চিশতী বেহেশতীর মাজারের পাশে সমাহিত করা হয়। পরে এটা ফতেহপুর চিক্রীতে স্থানান্তরিত করা হয়।Fatehpur Sikri (2)
সম্রাট আকবর অম্বরের রাজা বিহারীমলের কন্যা যোধবাঈকে বিয়ে করেছিলেন। যোধবাঈ সম্রাটের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। তাঁর বসবাসের জন্য সম্রাট ফতেহপুরসিক্রীতে যোধবাঈ প্রসাদ নামে একটি মনোরম প্রসাদ নির্মাণ করেন। এ প্রসাদটি ১৫৬৯-৭০ এ নির্মিত হয়। ৩২ ফুট উচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত ৩২০২৪৫ পরিমিত স্থানে অবস্থিত, পূর্ব প্রাচীরে ফটক-দালান, উত্তর প্রাচীরে হাওয়া মহল ও দক্ষিণ প্রাচীরে øানাগর ইত্যাদি। অভ্যন্তরে একটি বর্গাকৃতি প্রাঙ্গণের চতুষ্পার্শে নির্মিত সৌধশ্রেণী অধিকাংশই দ্বিতল। উপর ও নীচের কক্ষসমূহ স্বাধীনভাবে ভিন্ন ভিন্ন বাসোপযোগী ব্লক হিসেবে নির্মিত এবং সংযোগপথ দ্বারা বিভক্ত। শীতকালে নীচের কক্ষগুলি গরম রাখার ব্যবস্থা ছিল। প্রাসাদটির নির্মাণ-শিল্পে পশ্চিম ভারতীয় মন্দিরের স্থাপত্যের ছাপ বিদ্যমান। আর তুর্কী সুলতানার প্রাসাদটি যেন প্রকাণ্ড একটি মণিকোঠা। প্রসাদটি সম্ভবত তুর্কী বংশজাত সেলিমা সুলতানার বাসগৃহ ছিল। এই সেলিমা সুলতানা বৈরাম খানের পতœী ছিলেন। বৈরাম খানের মৃত্যু হলে আকবর সেলিমা সুলতানাকে বিয়ে করেন। প্রসাদটির ভেতর ও বাহির অত্যাশ্চর্য উৎকীর্ণ অলংকার দ্বারা সজ্জিত। জীবজন্তু পশুপাখী গাছপালা ও ফুলফলের জীবন্ত প্রাকৃতিক দৃশ্যের প্যানেল বা খোপ সারাটি ইমারতের গায় বিদ্যমান। পঞ্চতল বিশিষ্ট পাঁচমহল (সম্রাটের দরবার ভবন), দ্বিতল দিওয়ান-ই-খাস এবং বীরবলের (প্রধানমন্ত্রী) প্রসাদ সম্রাট আকবরের অবিস্মরণীয় কীর্তি।
সম্রাট আকবর তাঁর অন্যতম পতœী মরিয়ম জামানীর বসবাসের জন্য সোনাহসা মকান বা স্বর্ণ ভবন নির্মাণ করেন। এটা অত্যন্ত সুরম্য ও স্থাপত্য শিল্প নিদর্শন। এর অভ্যন্তরস্থিত পারসিক শিল্প কারুকার্য উল্লেখযোগ্য।
খাওয়াবগাহ, দিওয়ানি-আম, ছোটদের মক্তব, ফৈজী ও আবুল ফজলের বাড়ি, ওয়াক্তিয়া মসজিদ, হাসপাতাল, দস্তাবেজখানা, তুর্কী গোছলখানা, বাবুর্চিখানা, আস্থাবল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ইত্যাদি নিয়ে ফতেহপুর সিক্রী ছিল একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নগরী।
এ ছাড়া ফতেহপুরসিক্রীর নহবতখানা, নাগনা মসজিদ, হারুন মহল, টাকশাল, আকবরের রাজকুমারগণের প্রসাদ স্থাপত্য শিল্পের চরম বিস্ময় হয়ে আজও টিকে আছে। সম্রাট আকবর যেন তাঁর সমস্ত ঐশ্চর্য ঢেলে দিয়েছিলেন এই ফতেহপুরসিক্রীতে সেলিম চিশতীর মাজারে। আপন পীরের প্রতি এমন সম্মান প্রদর্শন পৃথিবীতে বিরল।
ভারতে স্থাপত্য কলার সমঝদার ও ক্ষমতাবাদ সক্রীয় পৃষ্ঠপোষকগণের মধ্যে সম্রাট আকবরের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। তাঁর নির্মিত ভবনগুলোর মধ্যে হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্য রীতির মিলন ঘটেছে। দুই স্থাপত্য রীতির মধ্যে মিলন ঘটাতে গিয়ে কোথাও মুসলিম রীতি প্রাধান পেয়েছে। ফতেহপুরসিক্রী আকবরের এই মহৎ শিল্প প্রীতির প্রতিফলন বলে পরিগণিত হয়ে থাকে। হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের জন্য তিনি যে রীতিনীতি অনুসরণ করে চলতেন তাঁর স্থাপত্য কার্যের মধ্যে তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়। মনোরম অট্টালিকা ও ভবনগুলির নির্মাণে তিনি উদারহস্তে শ্বেতপাথর ব্যবহার করেন। ফতেহপুরসিক্রীর সর্বত্র সেই চিহ্ন বিদ্যমান রয়েছে। এককালে যে ফতেহপুরসিক্রী লন্ডন শহরের চেয়েও জনবহুল ছিল, আজ তা জনমানবহীন মৃত শহর। তবুও প্রাচীন স্থাপত্য ও ঐতিহ্যমণ্ডিত নগরের গুণ কীর্তি নিয়ে সূর্যের কিরণের মতো এক সময়ের ঐতিহ্যের আলো ছড়াচ্ছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: