মিল্ক কিংয়ের সুন্দর দুধের প্যাকেটে দুধের নামে বিষ বিক্রি

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৮ জুলাই ২০১৭, মঙ্গলবার: দুধ আদর্শ খাদ্য হিসেবে পরিচিত। সেই দুধ এখন আর দুধ নেই। সেটা এখন মরণ ফাঁদে পরিণত হয়েছে। কারণ মানুষ আসল দুধ বাঁধ দিয়ে, দুধ বানানের কাজে হাত দিয়েছে। অনেকের প্রশ্ন দুধ আবার বানায় কীভাবে? সব সম্ভবের এই বাংলাদেশে দুধ তৈরির কর্মটি গাভী না পুষেও সম্ভব! তাহলে টিভিতে যে খাঁটি দুধের বিজ্ঞাপন দেখি? ওইসব বিজ্ঞাপনের সুন্দর মুখগুলোর সুন্দর হাসির আড়ালে কি তবে শুধুই ধোঁকাবাজি? প্রকৃতপক্ষে আমরা ভেজাল দুধই কিনে খাচ্ছি। এতে প্রমাণ হলো বাংলাদেশের প্রচলিত খাদ্য সংস্কৃতি আমাদের মেধা ও স্বাস্থ্য রক্ষার পথে পর্বত প্রমাণ বাধা। এভাবে মানুষের জীবন নীরবে ধ্বংস করা হচ্ছে। কে দেবে জনগণের স্বাস্থ্যরক্ষার নিশ্চয়তা? তাহলে খাব কি আমরা? বাঁচব কীভাবে আমরা? যা-ই খাই, তা-ই যদি হয় বিষাক্ত। আমাদের দেশের নামিদামি কিছু দুধ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাকি এই ভেজাল দুধের ক্রেতা। তারা তো পয়সা দিয়ে এমন ভেজাল দুধ ফেলে দেয়ার জন্য কেনেন না। অবশেষে নানা হাত ঘুরে আমাদের মতো নিরীহ ভোক্তাদের গাঁটের টাকা খরচ করে কেনা সেই ভেজাল দুধ মা পরম মমতায় তুলে দেন ছেলে-মেয়েদের মুখে। সকলেরই কামনা থাকে আমার শিশু যেন থাকে দুধে-ভাতে। অসুস্থ মানুষের দুর্বলতা কাটাতে খাওয়ানো হয় সেই দুধ। বাড়িতে মেহমান এলে বা কোনো অনুষ্ঠানে সেই দুধে তৈরি মিষ্টান্ন দেয়া হয় আপ্যায়নে। দুঃখ এখানেই যে, আমার দেশের উর্বর মস্তিষ্কগুলো থেকে কি ভালো কিছু বের হতে পারে না? তারা কি তাদের মস্তিষ্কের কিছু অংশও ভালো কাজে ব্যয় করতে পারে না?
দুধ কেবল একটি পানীয় নয়, এটি সুষম খাদ্য। কেননা এতে আমিষ, চর্বি, শর্করা ও নানা ধরনের ভিটামিন, খনিজ পর্যাপ্ত পরিমাণে মেলে। একটিমাত্র পানীয়ে এত ধরনের পুষ্টি-উপাদান বোধ হয় আর পাওয়া যাবে না। অথচ অতি প্রয়োজনীয় ও শিশুদের পছন্দের এই দুধে ভেজালের বেড়াজালে আমরা এমনভাবে আটকে গেছি যে, এখন আসল দুধ চেনাই দুষ্কর হয়ে পড়েছে। সব রকম খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণের কথা বাদই দিলাম। অতি প্রয়োজনীয় ও শিশুদের পছন্দের দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা হয় না যথাযথভাবে। কেউ এর মান নিয়ন্ত্রণে ভরসা পায় না। ইতোপূর্বে বিএসটিআইর সার্টিফিকেট নিয়ে খাদ্যসামগ্রী বিদেশে রফতানির পর নানা অভিযোগ এসেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঝে-মধ্যে একটু-আধটু সক্রিয়, সংবাদ সম্মেলন, ক্যামেরা ট্রয়াল, ক্যামিক্যাল জব্দ, শুধু আর্থিক জরিমানা করেই ক্ষ্যান্ত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, ভেজাল বা দূষিত খাবারে প্রতিবছর ৫ বছরেরও কম বয়েসী প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার শিশুর মৃত্যু হচ্ছে।
বর্তমানে আগের চেয়েও বেশি হারে ভেজাল দুধ তৈরি হচ্ছে। পাল্টানো হয়েছে পদ্ধতিও। আগে তারা নিজেদের বাড়িতে এ কারবার চালালেও অনেকে এখন অন্যের বাড়ি ভাড়া নিয়েছে। গোপন ব্যবসার জারিজুরি ফাঁস হওয়ার ভয়েই মূলত এ পথ তাদের। দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্মটি করে আসছে চট্টগ্রাম ১৮ নং ওয়ার্ড পূর্ব বাকলিয়া ভজ্রঘোনার মুদির দোকানের ব্যবসায়ীরা। তারা মিল্ক কিংয়ের সুন্দর দুধের প্যাকেটের দুধ বিক্রি করছে তারিখ উত্তীর্ণ। মিল্ক কিংয়ের প্যাকেটে উৎপাদনের তারিখ ১/১০/২০১৬ উত্তীর্ণ লেখা আছে ১৭/০২/২০১৭। এ ব্যাপারে বজ্রঘোনার বিভিন্ন দোকানীকে জিজ্ঞেস করলে তারা মুখে কিছু বলতে চায় না। ঐ দুধ দিয়ে চা বানালে চায়ের নিচে এক ধরনের আবরণ পড়ে থাকে। এই দুধ খেলে যে কোন সুস্থ মানুষ অসুস্থ হয়ে যাবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেন বিশেষজ্ঞগণ।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভেজাল দুধ পানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে মানুষের রোগব্যাধির হার বেড়ে যায়। এতে শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়ে মস্তিষ্কের গঠন-প্রক্রিয়া ব্যাহত করাসহ আইকিউ কমে যায়। এমনকি হাড়ের গঠন দুর্বল হয়ে হাড় ভঙ্গুর হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে কেমিক্যাল মিশ্রিত দুধ পান করলে মানবদেহে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে।
বিশ্বের যে কোনো সভ্য দেশে অন্তত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার জন্য আইনকানুন ও তার সুষ্ঠু প্রয়োগের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়। সরকারের ন্যূনতম দায়িত্ব হলো নাগরিকদের খাদ্যপ্রতারকদের হাত থেকে রক্ষার ব্যবস্থা করা। এ জন্য মানুষ কর দেয়। তারপরও যদি খাদ্যের বাজার কিছু মুনাফালোভী ব্যবসায়ীর হাতে ছেড়ে দেওয়া হয় তাহলে মানুষ ভরসা পাবে কোথায়? শুধু আইন করে বা পাহারা বসিয়ে এসব ঠেকানো যাবে না, টুপাইসে ছোট প্রহরী, আর বড় প্রহরীকে ফোর-পাইস দিলে পকেটে ঢোকানো যায়। অতএব, এসব ঠেকানোর কার্যকর উপায় হলো, আমাদের নৈতিকতার পরিবর্তনসহ ভেজাল নিয়ন্ত্রণের আইন সমন্বয় করে তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*