মালিক-চালকে নৈরাজ্য সিএনজিতে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৫ ফেব্র“য়ারী: মগবাজারের সবজি বিক্রেতা ইস্রাফিল আলম। তিনি সায়েদাবাদ থেকে বাসযোগে গ্রামের বাড়ি মংলায় যাবেন। সঙ্গে তার স্ত্রী ও এক বছর বয়সী ছোট ছেলে। রাত আটটার সময় বাস ছাড়বে। টিকিট কাটা রয়েছে বলে বাস কাউন্টার থেকে বারবার তাগিদ আসছে বাস কাউন্টারে যাওয়ার জন্য। তাই মালিবাগে রেলগেট থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিলেন ২০০ টাকা চুক্তিতে। কারণ চালক মিটারে যাবেন না। riksha
সিএনজিতে ওঠার আগে ই¯্রাফিল এই প্রতিবেদককে বলেন, “সায়েদাবাদ থেকে মংলায় বাস ভাড়া ৩৫০ টাকা। আর মালিবাগ থেকে সায়েদাবাদ ২০০ টাকা। কী করব বাধ্য হয়েই উঠলাম।”
গত বছরের নভেম্বর মাসে সিএনজির নতুন ভাড়া যখন নির্ধারণ করে দেয়া হয়, তখন কয়েকটি শর্ত ছিল সরকারের। এর মধ্যে রয়েছে যাত্রীর চাহিদামতো যেকোনো স্থানে যাওয়া এবং মিটারে যাত্রী পরিবহনে বাধ্য থাকবেন সিএনজিচালকরা।
কিন্তু রাজধানীতে প্রতিদিন সরকারের এসব শর্তকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছেন চালকরা। তারা অবশ্য এ জন্য মালিকদের জমা বেশি নেয়ার কথা বলছেন।
এদিকে বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক মানববন্ধনে চালকরা দাবি করেছেন, গত নভেম্বরে যে জমা ও ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে তা গ্যাস ও অন্যান্য দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারের বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার।
উদোর পিণ্ডি বুঁদোর ঘাড়ে: সিএনজির এই নৈরাজ্যের পেছনে চালক ও মালিকরা পরস্পরের ওপর দোষ চাপাচ্ছেন। চালকরা বলছেন, মালিকরা সরকার-নির্ধারিত অঙ্কের চেয়ে জমা বেশি নিচ্ছেন। আর মালিকদের অভিযোগ, চালকরা নিজেদের মতো করে গাড়ি নিয়ে কোনো কোনো মালিককে বেশি জমা দিচ্ছেন। চালিক-মালিকদের এই স্বেচ্ছাচারের শিকার হচ্ছেন যাত্রীরা।
সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকরা অভিযোগ করে বলছেন, যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া বেশি নেয়া ছাড়া তাদের কিছু করার নেই। মালিকরা প্রতিদিন জমা নেন ১৪০০ থেকে ১৬০০ টাকা। দুই শিফটে গাড়ি ভাড়া দেন তারা। প্রতি আট ঘণ্টার শিফটে জমা নেন ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এই জমার টাকা দিতে না চাইলে গাড়ি দিতে চান না মালিকরা; সেই সঙ্গে আছে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ।
এ প্রসঙ্গে মালিক সংগঠনগুলো বলছে ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, তারা চালকদের বলেছেন ৯০০ টাকার বেশি জমা না দিতে এবং দুই শিফটে গাড়ি না চালাতে। কিন্তু তারা শোনেন না। কেউ যদি গোপনে গ্যারেজ থেকে গাড়ি নিয়ে মালিককে দেড় হাজার টাকা জমা দেয় অথবা দুই শিফটে ১৬০০ টাকা জমা দেয়, তাহলে মালিকরা কেন এই সুযোগ নেবে না।
অন্যদিকে আবদুল্লাহ নামের এক সিএনজিচালক বলেন, “আমার সঙ্গে রাজধানীর মুগদা, মান্ডা, ওয়ারী, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ এলাকায় চলেন, দেখবেন গ্যারেজে কী অনাচার হচ্ছে। সেখানে মোবাইল কোর্ট যায় না কেন? আসলে গরিবের যত দোষ। ”
গ্যারেজে না যাওয়া কিংবা ‘গ্যারেজের অনাচারের’ বিষয়ে ব্যবস্থা না নেয়ার পেছনে অর্থের লেনদেনের বিষয়টি জড়িত বলে অভিযোগ করেন আবদুল্লাহ।
তবে চালকদের এই অভিযোগ মানতে রাজি নয় অটোরিকশা মালিক সমিতি। সমিতির সভাপতি বরকতউল্লাহ ভুলু ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সরকারের নির্দেশ মানছে না সিএনজিচালকরা। তারাই দুই শিফটে গাড়ি চালায়। আর গোপনে মালিককে দেড় হাজার থেকে ১৮০০ টাকা পর্যন্ত জমা দিয়ে থাকে।”
মালিকরা গাড়ি না দিলে চালকরা নেন কীভাবে- এমন প্রশ্নের জবাবে এই নেতা বলেন, “কোনো মালিক ৯০০ টাকা জমা নিয়ে গাড়ি দেননি এমন অভিযোগ নিয়ে কেউ আমার কাছে আসেনি। তাহলে আমি কী করব? শুধু মালিকদের দোষ দিয়ে কী লাভ? চালকদের আগে শোধরাতে হবে।”
রাজধানীতে সিএনজিচালকদের মিটারে না যাওয়া প্রসঙ্গে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাসের ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সিএনজিচালকদের নৈরাজ্য কমাতে রাজধানীতে বিআরটিএ প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি মোবাইল কোর্ট বসিয়ে চালক ও মালিকদের জেল-জরিমানা করছেন। এর থেকে বেশি আর কী করতে পারি। কেউ যদি আইন না মানে তাহলে সেটা তার সমস্যা।”
এদিকে সিএনজিচালকদের জেল-জরিমানার প্রতিবাদে আজ বুধবার রাজধানীর প্রেসক্লাবের সামনে একটি মানববন্ধন করেছে ঢাকা জেলা সিএনজি অটোরিকশা, মিশুক চালক ও শ্রমিক ইউনিয়ন, ঢাকা জেলা ফোরস্ট্রোক অটোরিকশা ড্রাইভার্স ইউনিয়ন।
মানববন্ধনে গত বছরের ১৫ নভেম্বরের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী যে জমা ও ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে তা গ্যাস ও অন্যান্য দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারের বর্তমান সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার দাবি জানানো হয়।
ঢাকা জেলা ফোরস্ট্রোক অটোরিকশা ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সভাপতি রফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে মানববন্ধন কর্মসূচিতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ওসমান আলী।
মানববন্ধনে চালকদের পক্ষে বেশ কিছু দাবি তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে যেসব ধারাবলে শ্রমিকদের হাতকড়া পরিয়ে জেলে পাঠানো হয় সেগুলো ট্রাফিক ও মোটরযান আইন থেকে বাতিল করা, গ্রেপ্তারকৃত সব শ্রমিককে নিঃশর্ত মুক্তি দেয়া, যোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদিত পাঁচ হাজার সিএনজি অটোরিকশার রেজিস্ট্র্রেশন চালকদের দেওয়া, ব্যাংক লোনের মাধ্যমে চালকদের গাড়ি কেনার সুযোগ দেয়া, শ্রম আইন অনুযায়ী মালিক কর্তৃক প্রতিটি শ্রমিকের নিয়োগপত্র ও আইডি কার্ড দেয়া প্রর্ভতি।
মিটারে কেন সিএনজি চালকরা যেতে চায় না এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা জেলা ফোরস্ট্রোক অটোরিকশা ড্রাইভার্স ইউনিয়নের সিনিয়র সহসভাপতি মো. ফারুক চৌধুরী ঢাকাটাইমস টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সরকারের সঙ্গে ৯০০ টাকায় যে দফা হয়েছে, সেই সভায় কোনো চালক যাননি। মালিকদের গায়ে চালকদের পোশাক পরিয়ে তাদের সেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তিনি আরো বলেন, “১০ টাকা বেশি চাইলে চালককে জেল দেওয়া হয়। আর মালিকরা যখন গ্যারেজ ভাড়া, পুলিশের চাঁদা ইত্যাদির নামে প্রতিদিন ত্রিশ টাকা, চল্লিশ টাকা আদায় করছেন, তখন কোথায় থাকে মোবাইল কোর্ট?” সিএনজি অটোরিকশা মালিকদের শ্রমিক হয়রানি ও অতিরিক্ত জমা নেওয়া বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।

Leave a Reply

%d bloggers like this: