মানব হত্যা একটি মানবতা বিধ্বংসী জঘন্যতম অপরাধ

মেহেদী হাসান, ২০ জুলাই: মানবতার ধর্ম ইসলাম। মানবাধিকারের রক্ষাকবচ হিসেবে ইসলামই হচ্ছে মানবাধিকারের সর্বোচ্চ স্বীকৃতি। ইসলামকে বুঝতে হলে দার্শনিক হতে হয় না। যা মানবিক তা-ই ইসলাম। আল্লাহতাআলার নিকট শিরকের পরে সবচেয়ে গর্হিত ও মন্দ কাজ হত্যা। মানব হত্যা একটি মানবতা বিধ্বংসী জঘন্যতম অপরাধ। যখন কেউ তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে এ অপরাধ করল সে যেন গোটা মানবতার বিরুদ্ধে এ অপরাধ করল। আল্লাহ তাআলা বলেন- ‘একজন মানুষের জীবন বাঁচানো যেমন গোটা মানব জাতির জীবন বাঁচানোর সমতুল্য, ঠিক তেমনি কোন মানুষের জীবন সংহার করা গোটামানব জাতিকে ধ্বংস করার সমতুল্য।’ (আল-কুরআন- ৫:৩২)h
উপরোক্ত আয়াতে কারিমার তাৎপর্য পর্যালোচনা করলে বুঝা যায় যে, হত্যা কতটা মন্দ, গর্হিত, বিবেক বর্জিত ও জঘন্য। রাসুল (সা:) এরশাদ করেন, ‘কোন মুমিনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করার চাইতে দুনিয়াটা ধ্বংস হয়ে যাওয়াই আল্লাহর নিকট অধিকতর সহজ।’ আর অন্যায়ভাবে কেউ যদি কারো প্রাণনাশ করে তবে তার জন্য রয়েছে কড়া শাস্তির হুশিয়ারি। আল্লাহতাআলা বলেন- ‘যে কোন লোক কোন মুমিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে, তার প্রতিফল হচ্ছে জাহান্নাম। সে চিরকালই সেখানে থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রদ্ধ হন এবং তার প্রতি অভিশাপ করেন। উপরন্তু তিনি তার জন্য কঠিন আযাব প্রস্তুত করে রেখেছেন।’ (আল কুরআন- ৪:৯৩)
শুধু মানুষ কেন প্রতিটি প্রাণীর প্রতি ইসলাম মানবিকতার শিক্ষা দিয়েছে। বোখারীর শরীফের হাদিস- একজন পাপিষ্ঠ ব্যক্তি তৃষ্ণার্থ কুকুরকে পানি পান করানোর বদৌলতে জান্নাতবাসী হয়েছেন। এমনকি উদ্ভিদ জগতের প্রতিও ইসলামের শিক্ষা বিদ্যমান। রাসুল (সা:) বলেছেন, ‘বিনা প্রয়োজনে গাছের পাতাও ছিড়ো না। কারণ গাছের পাতাও আল্লাহপাকের জিকির করে।’ পিতা-মাতার খেদমতকে ইসলামে ফরজ করা হয়েছে। আল্লাহতাআলা বলেন- ‘আমার ইবাদতের পর তোমার মা-বাপের এহসান করবে খেদমত করবে।’ অথচ সেই পিতা-মাতাকে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়ে আত্মগোপনে থেকে নিরপরাধ লোককে বোমা মেরে হত্যা, এমন অমানবিকতার নিকৃষ্ট উদাহরণ ইসলামের নামে কোন কিতাবে শিক্ষা দিয়েছে?
জ্ঞানীদের ধর্ম ইসলাম। কোন ধরনের আবেগ ও অজ্ঞতার স্থান ইসলামে নেই। একজন ব্যক্তি ইমানদার হওয়ার প্রথম শর্তই হল কালেমা জেনে বুঝে পড়া ও মেনে নেয়া। যাতে বলা হয়েছে, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোন ইলাহা (সৃষ্টিকর্তা, পালনকর্তা, শাষনকর্তা, আইনদাতা, বিধানদাতা, রিজিকদাতা ইত্যাদি) নেই, মুহাম্মাদ (সা:) আল্লাহর বান্দা ও প্রেরিত রাসুল। যে কাউকে এই কালেমা বুঝতে হলে পড়তে হবে, জানতে হবে। পবিত্র কুরআনের সর্ব প্রথম শব্দই হচ্ছে ‘ইকরা’ অর্থ ‘পড়’। এছাড়া নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত পালন করতে হলেও জানতে হবে, জ্ঞান অর্জন করতে হবে। এখন আবেগতাড়িত হয়ে গলা কেটে মানুষ হত্যা করা ইসলামের কোন জ্ঞানের মধ্যে পড়ে। কোন বিবেকবান মানুষ যাকে আল্লাহ নূন্যতম জ্ঞান দিয়েছেন সে কি এমন বর্বর কাজকে বৈধ বা মানবিক বলতে পারে?
সার্বজনীন ধর্ম ইসলাম। আল্লাহ প্রদত্ত কুরআন ও রাসুল প্রদত্ত হাদীস এই দুই হচ্ছে ইসলাম। এছাড়া মানুষের মনমগজ প্রসূত কোন কিছুই ইসলাম অনুমোদন দেয় না। রাসুল (সা:) এসেছেন দুনিয়ার শান্তি ও আখেরাতে জান্নাতের পয়গাম নিয়ে। আর দু’জাহানে শান্তি ও মুক্তির জন্য তার নির্দেশিত পথই চূড়ান্ত। এমনকি অমুসলিমরাও ইসলামী অনুশাসন মেনে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যান সাধন করতে পারেন।
উদাহরন স্বরুপ, পারিবারিক বন্ধন মজবুত করতে পিতা মাতাকে খেদমত করা ইসলামে ফরজ করা হয়েছে। দারিদ্র বিমোচনের জন্য সুদকে হারাম করে যাকাতের বিধান দেয়া হয়েছে। ইভটিজিং ও ব্যভিচার রোধে পুরুষদের দৃষ্টিকে সংযত ও নারীদেরকে লজ্জাস্থানের হেফাজত করতে বলা হয়েছে। শ্রমিকের অধিকার রক্ষায় ঘাম শুকানোর আগেই পরিশ্রমিক দিতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধ শিক্ষা দিতে আত্মহত্যাকে মহাপাপ বলা হয়েছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় বিচারকদেরকে জাহান্নামের কঠিন আজাবের ভয়াভয়তার কথা বলা হয়েছে একই সাথে মিথ্যা সাক্ষকে হারাম করা হয়েছে। চুরি-ডাকাতি ও ঘুস-দূর্নীতি বন্ধে কঠোর আইন রয়েছে। পৃথিবীর সকল মানুষই নারীর গর্ভজাত সন্তান। এই বিবেচনায় মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহস্ত বলা হয়েছে। সেই সাথে সম্পত্তিতে নারীর অংশ নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়েছে। হত্যা বন্ধে দুনিয়ায় শাস্তির বিধানের পাশাপাশি পরকালে একজন নিরাপরাধ লোককে হত্যার জন্য সারা পৃথিবীর সমস্ত মানুষ হত্যার অপরাধের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এমনকি একজন নিরাপরাধ মানুষ হত্যার সাথে যদি পৃথিবীর সকল মানুষও জড়িত হয় ঐসকল মানুষকেই কেয়ামতের দিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। মানবতার এমন অসংখ্য উদাহরন রয়েছে ইসলামে। অর্থাৎ এক কথায় বলা যায় যা ইসলাম তাই সার্বজনীন। এখন যুক্তির খাতিরে জঙ্গিবাদকে যদি আমরা ইসলাম সিদ্ধ বলি আর পৃথিবীর কয়েক’শ কোটি মুসলমান যেখানেই ভিন্ন মত বা ধর্মের লোক পাবে তাকেই গলা কেটে হত্যা করা শুরু করে তাহলে একবার ভাবুনতো পৃথিবীটা কেমন জাহান্নামে রুপ নিবে?
যে ইসলাম এতটা বিজ্ঞানময়, সার্বজনীন ও মানবতার শিক্ষা দেয় সে ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ হয় কি করে? সম্প্রতি ভারতের একজন শীর্ষ স্থানীয় ধর্মীয় নেতা জঙ্গিদেরকে জাহান্নামের নিকৃষ্ট কুকুর বলে আখ্যা দিয়েছেন। জঙ্গিবাদ যে ইসলাম নয় বরং ইসলামের চূড়ান্ত দুশমন তাঁর বক্তব্যে এটা সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
ধর্মীয় সম্প্রীতিতে বিরল বাংলাদেশ। অন্য যে কোন দেশের মত এ দেশেও রাজনৈতিক বিরোধ রয়েছে। এটি অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু ধর্মীয় সহাবস্থানের অনন্য দৃষ্টান্ত রয়েছে আমাদের। একই সাথে মসজিদ, গির্জা, মন্দির, পেগোডা এমন সম্প্রীতির উদাহরন কেবল এদেশেই সম্ভব। এখানে ঈদ-কুরবান কিংবা পূজা-পার্বনে মুসলিম-অমুসলিমের মধ্যে যে সৌহার্দপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয় তা সত্যিই অবাক করে বিশ্বকে। এমন শান্তি ও সম্প্রীতির দেশে কি হচ্ছে এসব? কেন এ জঙ্গিবাদ? তাহলে কি শকুনের দৃষ্টি পড়েছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমির উপর? মনে হচ্ছে বাংলাদেশের ভাগ্যাকাশে সুনামির পূর্বাভাস। এই জঙ্গি নামক সুনামি অমুসলিমদেরই নয় এরা ইসলামেরও চরম দুশমন। এরা সরকারী দল বা বিরোধী দল শুধু নয় এরা নিশ্চিন্ন করে ছাড়বে পুরো জাতিকে। তাই এখনই দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পাড়ায়-মহল্লায় ঐক্য গড়ে জঙ্গিবাদদের চিহ্নিত করতে হবে। নইলে অত্যাসন্ন সুনামি কোন বাছ-বিচার ছাড়াই ধ্বংস করে ছাড়বে সবাইকে। লেখক: সভাপতি, চট্টগ্রাম অনলাইন প্রেস ক্লাব।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*