মানবতার অগ্রযাত্রার ইতিহাস সমবায়ী মনোভাবের বিকাশ

আমাদের কাছে সমবায় কেবল একটি শব্দ নয়। আবেগ অনুরোগের বা ভাবাবেগের কথা নয়। যাদের জ্ঞান আছে এবং মানব ইতিহাস বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখে পৃথিবীতে আর্থ সামাজিক বিবর্তন ও ক্রমবিকাশের খবরা খবর রাথে এবং বাকা পথে চোখ মেলে না, অন্ধকারের আবর্তে নিমজ্জিত নয় বা ঘোলাপানিতে মাছ শিকারের জন্য সুযোগ সন্ধানী নয় এবং জগত ও জীবনকে নিজের আয়নায় দেখতে পায় তাদের কাছে সমবায় একটি দর্পণ, অগ্রযাত্রার ইতিহাস, সভ্যতার সোপান, উন্নয়নের বাহন, মানবতার স্বপ্ন। সকল দেশের সকল যুগে সকল মানুষের সর্বজন স্বীকৃত, গৃহীত এবং MKl-2লালিত বিশ্বাস বা ধর্ম। সমবায় মানে সমাজ, সংগঠন, সমন্বয় ও পুুঁজিগঠন। উৎপাদনের জন্য পরিকল্পিত ও সংগঠিত বিনিয়োগ। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, বাজারজাতকরণ, সরবরাহ এবং সেবা। সমবায় মানে সঞ্চয়ের শিক্ষা, মিতব্যয়ের শিক্ষা, পরিকল্পিত আয় ব্যয়ের শিক্ষা ও বিজ্ঞানের বাস্তব শিক্ষা। উপার্জনের শিক্ষা, কর্মসংস্থানের শিক্ষা। বেকারত্ব ও দারিদ্রতার অভিশাপ থেকে মুক্তির শিক্ষা। নিজেদের এবং সকলের শান্তি ও প্রগতির শিক্ষা, নিজেদেরকে নিজেরাই আবিষ্কারের শিক্ষা, মানবতার মুক্তির আন্দোলন। আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও নিরাপত্তা, পরিবেশ উন্নয়ন নিজের ও সকলের উপার্জন ও উন্নয়ন। সর্বপোরি দেশ, জাতি ও বিশ্বমানবতার কল্যাণ।
উৎপাদনখাতে বিনিয়োগ এবং কাজের সংস্থান সৃষ্টি করা এসবই সমবায়ের গতিসূত্র। একে অপরকে বুদ্ধি, পরামর্শ ও কাজে সহায়তা দেয়া, বিপদে ঝাঁপিয়ে পড়া, পীড়িতকে সাহায্য করা এসবই সমবায়ী আন্দোলনের মূল বিষয়। সমবায়ের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্য সুলভমূল্যে জনসাধারণের মধ্যে বিতরণ করা সম্ভব। সমবায় নিজেদেরকে আবিষ্কার ও বিকাশের জন্য, স্বাবলম্বী হবার জন্য, স্বনির্ভরতা অর্জনের জন্য। গণতন্ত্র চর্চার জন্য এবং সুন্দর পৃথিবী গড়ার জন্য। সমবায় বঞ্চিত মানুষের আর্থ সামাজিক মুক্তির জন্য এবং মানবতার নিরাপত্তার জন্য। ১৮৪৪ সালে রচডেল যুগে নয়- প্রাক রচডেল এবং পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ধর্মীয় ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে সমবায়ের মাধ্যমে স্বাবলম্বন ও স্বনির্ভরতা অর্জন এবং প্রতিযোগিতা করে বাণিজ্যিকভাবে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার গতিধারা বিশ্ব জুড়ে আজও অব্যাহত রয়েছে।
সমবায় পদ্ধতিটি মহান সৃষ্টিকর্তার এক অমোঘ বিধান। এর প্রমাণ মেলে মহাগ্রন্থ আল কোরআনে-তাঁরই পবিত্র সুস্পষ্ট উচ্চারণ থেকে: “তোমরা ইসলামের রজ্জুকে সম্মিলিতভাবে শক্ত করে ধারণ কর, পরস্পর পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হইও না”। ইসলাম শব্দের অর্থও শান্তি। মানুষ এই শান্তির অন্বেষায়ই সমবায় করে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সমবায়-২’ প্রবন্ধে বলেছেন- ‘দলবেঁধে থাকা এবং দলবেঁধে কাজ করাই মানুষের ধর্ম। এ ধর্ম থেকে বিচ্যুত হলেই মানুষ লোভ, ক্রোধ, মোহের মতো রিপুর শিকারে পরিণত হয়। সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আদিম মানুষের দলবদ্ধ জীবনযাত্রা থেকে এই আধুনিক উত্তরকাল পর্যন্ত ঐক্য ও সমবেত প্রচেষ্টা মানুষের সফলতার এক প্রধান নিয়ামক। পিঁপড়ে মৌমাছি ওরাও সমবায়ী। ঘর বাঁধার জন্য বোলতার কাদা সংগ্রহ, খড়কুটো এনে পাখিদের বাসা তৈরি- এ সব কিছুই সমবায়ের মাধ্যমে সঞ্চয় ও নিরাপত্তার দৃষ্টান্ত।
ভারতীয় উপমহাদেশে সমবায় চর্চার ইতিহাস অত্যন্ত সুপ্রাচীন। প্রাচীন ভারতের সমাজ ব্যবস্থা সম্পর্কে যে পরিচয় পাওয়া যায় তাতে মগধ ও মৌর্য যুগের সামাজিক অর্থনৈতিক সংগঠনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ‘গ্রামীণ সমাজ ব্যবস্থা’। জনসংখ্যার বড় অংশই কৃষি কাজে নিয়োজিত ছিল। আমরা শহরে-নগরে বা গ্রামে যতো দূরে যে যেখানে থাকি এক জোট হয়ে সমবায়ের ডাকে অনুপ্রাণিত হতে পারি। শিক্ষা শিক্ষার্থী-শিল্পী শ্রমিক-কৃষক-কারিগর সকলেই সঞ্চয়ের সোনার কাঠির পরশ ভাবতে শিখায় সমবায়। সমবায়ের কথা মনে রেখে আমাদের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বলেছেন-
মিলিত হইনি তাই আমাদের
দুর্গতি ঘরে ঘরে
সেই দুর্গতি দুর্গ ভাঙিবো
সমবেত পদাঘায়
দুঃখ-জয়ের নবীন মন্ত্র
সমবায়-সমবায়।
সত্যিকার অর্থেই আমাদের জীবন-জাগরণের আসল ভিত্তিই হলো সমবায়। বর্তমান পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সমবায় পদ্ধতিকে আধুনিকায়ন করার প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। দক্ষিণ আফ্রিকায় আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা [আইএলও] নতুনভাবে সমবায় উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করছে। সমবায় সমিতি গঠনের মাধ্যমে কৃষি অকৃষি কিংবা শহর বা গ্রামকেন্দ্রিক সমবায় সমিতি প্রতিটি ক্ষেত্রে অধিকতর উন্নত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অধিক পণ্য উৎপাদন করা সম্ভব।
মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ নিয়েই তাকে চলতে হয়। সমাজের আর দশজন মানুষের সঙ্গে একত্রে কাজও করতে হয়। সমাজের প্রতিটি মানুষ উন্নয়নের জন্য পরস্পর পরস্পরের সহযোগী। মানুষের জীবনে অতি গুরুত্বপূর্ণ দুটি জিনিস হচ্ছে অর্থ ও শিক্ষা। জীবন চলার পথে ডিপ্লোমা শিক্ষার যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে তা সহজেই অনুমেয়। সমবায়ের জন্য প্রয়োজন সঞ্চয়, আর সঞ্চয়ের জন্য প্রয়োজন সঞ্চয়ী মনোভাব। তাই সঞ্চয়ী প্রত্যয় নিয়ে এগিয়ে এলে অর্থনৈতিক ভিত্তি মজবুত হয়।
বর্তমান সমাজে শিক্ষার হার বাড়লেও বাড়েনি ডিপ্লোমা শিক্ষা। অথচ ডিপ্লোমা শিক্ষাই সমবায় সংশ্লিষ্ট উন্নয়নের মূলমন্ত্র। বাংলাদেশের সমবায় আন্দোলনের শতবর্ষের সার্বিক কার্যক্রমের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে আগামী দিনের জন্য একটি আদর্শ সমবায় নীতিমালা, একটি প্রয়োগিক উদারধর্মী, নিয়ন্ত্রণবিমুখ সমবায় আইনী কাঠামো প্রণয়ন করা এবং স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ কাজগুলো করার জন্য ডিপ্লোমা শিক্ষা বোর্ড প্রয়োজন যে বোর্ড দেশ ও বিদেশের অভিজ্ঞতার আলোকে আমাদের দেশের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে বিবেচনায় এনে সমবায় উপযোগী পেশা ও পণ্যভিত্তিক ডিপ্লোমা শিক্ষা কোর্স চালু করবে।
জাতির উন্নতির জন্য যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয় তার জন্য প্রয়োজন হয় দক্ষ জনশক্তির। ডিপ্লোমা শিক্ষা নানাভাবে মানবসম্পদ সৃষ্টিতে সহায়তা করে। জাতীয় জীবনে মানবসম্পদের প্রাচুর্য সৃষ্টি হলে সমৃদ্ধ ও গৌরবান্বিত জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। এক্ষেত্রে ডিপ্লোমা অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ বিষয়ে অধ্যয়ন শেষে এ দেশের তরুণরা বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হতে পারে, যার মধ্যে সমবায় একটি অন্যতমখাত।
বেকারত্বের ভারে ভারাক্রান্ত হচ্ছে পরিবারগুলো এবং এর দায় টানছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র। এই হলো আমাদের বাস্তব দৃশ্যপট। এ পরিপ্রেক্ষিত আগে সৃষ্টি করতে হবে কাজের ক্ষেত্র। সমবায় সমিতির মাধ্যমে সুসংগঠিত উপায়ে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সঞ্চয় ও আমানতের সমন্বয়ের বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে জনশক্তিতে রূপান্তরিতকরা সম্ভব হবে। মধ্যবিত্ত ও নিুমধ্যবিত্ত পরিবারের সঞ্চয় সমন্বয় করে বহুমুখী কর্মক্ষেত্র তথা রোজগারি ক্ষেত্র সৃষ্টি করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ডিপ্লোমা শিক্ষা একতা, জাগরণ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, বিপণন, বিতরণ এ প্রক্রিয়ায় দ্রুত আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন, বেকারত্ব নিরসন সর্বোপরি দারিদ্র্য বিমোচন সম্ভব বিষয়ভিত্তিক ডিপ্লোমা শিক্ষার সমবায়ী তরুণ দ্বারা। আমাদেরও প্রত্যাশা সেই সব জাগ্রত তরুণের।
লেখক: মো. আবুল হাসান, সভাপতি, খন রঞ্জন রায়, মহাসচিব, ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ।

Leave a Reply

%d bloggers like this: