মাইজভাণ্ডার ত্বরিকার প্রচার প্রসারে ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী (কঃ) এর ভূমিকা অপরিসীম

লায়ন ডা. বরুণ কুমার আচার্য বলাই, ১ মে ২০১৭, সোমবার: চট্টগ্রামকে বলা হয় বার আউলিয়ার চট্টগ্রাম। এখানে সুফী দরবেশ ও সাধক পুরুষগণ যুগে যুগে মানবতার বাণী প্রচার প্রসারের মাধ্যমে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে মানুষের সম্মুখে পৌঁছে দিয়েছেন। চট্টগ্রামে নবী মুহম্মদ (স) এর সাহাবা দ্বারা ইসলাম এর দাওয়াত এসেছে বলে ইসলামী গবেষণার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। হযরত সাদ ইবনে আবু আক্কাস (র.) প্রথম চট্টগ্রামে পবিত্র ইসলাম ধর্ম প্রচারে আসেন। সুফী দরবেশের বার আউলিয়ার চট্টগ্রামে মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার প্রভাব ও প্রসার হযরত গাউছুল আজম আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর দ্বারা হয়েছে। মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার প্রভাব ভারতীয় উপমহাদেশ ছেড়ে পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও প্রচলিত ও প্রচারিত হয়ে আসছে। মাইজভাণ্ডার ঐশী প্রেমের এক মহান ঠিকানা। “ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী’র (কঃ) জীবনী ও কেরামত” গ্রন্থটি মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকা প্রচার প্রসারে অসাধারণ ভূমিকা রাখবে। মাওলানা ছৈয়দ মছিউল করিম মির্জাপুরী এই গ্রন্থের লেখক ও সাজ্জাদানশীন, মির্জাপুর দরবার শরীফ, গাউছিয়া মছিহ্ মঞ্জিল, ছৈয়দ পাড়া, সরকারহাট, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। গ্রন্থটির শুভেচ্ছা মূল্য ১০০ টাকা। গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে আশেকানে গাউছিয়া হক ভাণ্ডারী মির্জাপুরী খানকাহ্ শরীফ থেকে। প্রকাশকাল ৪ চৈত্র, ১৪২৩, ১৮ মার্চ ২০১৭ ইংরেজি। এই গ্রন্থটির শুরুতে বাণী রূপে কথা লিপিবদ্ধ হয়েছে গাউসিয়া হক মঞ্জিল মাইজভাণ্ডার শরীফ, চট্টগ্রামের সাজ্জাদানশীন রাহবারে আলম হযরত সৈয়দ মোহাম্মদ হাসান মাইজভাণ্ডারী (মঃ) বলেছেন, “মাওলানা সৈয়দ মছিউল করিম মির্জাপুরী (ম.জি.আ), সাজ্জাদানশীন, মির্জাপুর দরবার শরিফ, গাউসিয়া মছিহ্ মঞ্জিল, সৈয়দপাড়া, সরকারহাট, হাটহাজারী, চট্টগ্রাম রচিত ‘সৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী’র (কঃ) ‘জীবনী ও কেরামত’ পুস্তকটি প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করায় আমি আনন্দিত ও গর্বিত। এই সর্বজন শ্রদ্ধেয় আল্লাহর অলির জীবনী সার্বিকভাবে ইসলাম ধর্ম ও মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার শিক্ষা প্রচারে এক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে এটাই আমার বিশ্বাস। বর্তমান সময়ে বিশ্বে ইসলাম ধর্ম এক কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। এই ক্রান্তিলগ্নে মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার মহান শিক্ষা ‘বিশ্বশান্তি’ প্রতিষ্ঠায় এক ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করি। ‘সৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী’র (কঃ) ‘জীবনী ও কেরামত’ পুস্তকটি আমাদের মুসলিম ধর্ম সাহিত্য হিসাবে সুধি সমাজে সমাদৃত হবে মর্মে আমি আশা করি।” হযরত ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী’র (কঃ) হযরত গাউসুল আজম সৈয়দ আহমদ উল্লাহ মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর আপন খালাত ভাই, বেয়াই ছাহেব, পীর ভাই ও জানাযার ঈমাম, হযরত ছৈয়দ গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী (কঃ) প্রকাশ বাবা ভাণ্ডারী’র শ্রদ্ধেয় তালই ছাহেব, হযরত অছিয়ে গাউসুল আজম ছৈয়দ দেলাওর হোসাইন মাইজভাণ্ডারী (কঃ) এর শ্রদ্ধেয় নানাজান, মুফতিয়ে আজম, সুলতানুল মাশায়েখ, আলেমকুল শিরোমণি, সুফীতাত্ত্বিক ও মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার প্রচার প্রসারক শাহ ছুফি হযরত ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী’র (কঃ)। হযরত ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী’র (কঃ) এর জীবনী গ্রন্থের মাধ্যমে তাঁর অসংখ্য কেরামত প্রকাশিত হয়েছে। ঘটনাবহুল এই কেরামতগুলো এই প্রজন্মের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাতে সক্ষম হলে এ প্রজন্ম ইসলাম ও পবিত্র মাইজভাণ্ডারী দর্শন সম্পর্কে আরো সজাগ সচেতন এবং ত্বরিকার প্রতি আনুগত্য লাভ করবে। এই গ্রন্থটিতে ৩২টি কেরামত প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কেরামতগুলো মধ্যে: “সুন্নী ওহাবী মতপার্থক্য: একদা এই অঞ্চলে সুন্নি ও ওহাবী মতবাদের মধ্যে আকিদাভিত্তিক সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। এতে সমাধানের জন্য মির্জাপুর সরকারহাট স্টেশনের দক্ষিণে চারিয়া গ্রামের কোন এক জায়গায় মুনাজারার আয়োজন করা হয়। উক্ত মুনাজারায় আমিন বা বিচারক হিসেবে মনোনিত করা হয় ওস্তাদুল ওলামা ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরীকে। এই আয়োজনে সুন্নী পক্ষের নেতৃত্ব দান করেন ছিপাতলী গ্রামের বাসিন্দা মৌলানা মোহাম্মদ হাসমত এবং ওহাবীদের নেতৃত্ব দানে ছিলেন ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ ছাহেবের ছাত্র চারিয়া নিবাসী মৌলানা হাবিব উল্লাহ। এতে সমসাময়িক অনেক ওলামা ও সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সুন্নী ও ওহাবী মতবাদের শত শত সমর্থক ও গ্রামবাসী। এই ভরা মজলিসে উভয়পক্ষের কোরআন হাদিস ভিত্তিক যুক্তিতর্ক শ্রবণের পর সুন্নী মতবাদ ও আকিদাই সঠিক বলে রায় ঘোষণা করেন উক্ত মজলিসের আমীর ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ)। ওতে ওয়াবী সমর্থকরা রায় বিপক্ষে যাওয়ায় ক্ষুব্ধ হন এবং ওহাবী মতবাদের পক্ষে নেতৃত্ব দানকারী মওলানা হাবিব উল্লাহ এই ভরা মজলিসে ওস্তাদের প্রতি বেয়াদবি করতেও পিছপা হননি। ওস্তাদুল উলামার প্রতি এহেন বেয়াদবি সহ্য করতে না পেরে সুন্নি পক্ষের নেতৃত্ব দানকারী-মওলানা হাসমত সবার সামনে ওহাবী পক্ষের নেতৃত্ব দানকারী-মওলানা হাবিব উল্লাকে জুতা নিক্ষেপ করতে বাধ্য হন। আর মহান অলিয়ে ত্যাগ করে তার ঘোষিত রায়ের প্রতি দৃঢ়তা প্রকাশ করেন। এতে বুঝা যায় সুন্নি আকিদাই আউলিয়া কেরামের মনোনীত ও নির্ভেজাল সঠিক পথ।” অপর আরেক কেরামতে হযরত ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী’র (কঃ) জীবনীতে পাওয়া যায়: “কাতালগঞ্জ মসজিদের স্মরণীয় ঘটনা: মির্জাপুরী সাহেব কেবলা চট্টগ্রাম শহরে অবস্থানকালে কাতালগঞ্জের মৌলভী বশির উল্লাহ মিয়াজীর মসজিদে ইমামতি করতেন এবং মসজিদ সংলগ্ন একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করে ধর্মীয় ও ত্বরিকতের শিক্ষা দান করতেন। একদা জনাব শাহ্সূফী মওলানা ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ্ মির্জাপুরী সাহেব সোবেহ্ সাদেকের পূর্বে তাহাজ্জুদ নামায পড়ার নিয়তে চট্টগ্রাম শহরে অবস্থিত কাতালগঞ্জের মৌলভী বশীর উল্লাহ্ সাহেবের মসজিদে প্রবেশ করলেন। তিনি দেখতে পেলেন, কেবলমাত্র একজন লোক মসজিদে মোরাকাবা অবস্থায় আপাদমস্তক কাপড় আচ্ছাদন পূর্বক উপবিষ্ট আছেন। তাঁকে তাঁর পীর ভাই মুছা মিঞা মনে করে উপহাস ছলে বললেন, ‘দিনের বেলায় সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকিয়া শুধু রাত্রিকালে এইভাবে ফকিরী দেখানো কী শোভা পায়। মুখ ঢাকিয়া ফকিরী করিলে কি ফকিরী বেশি হাছেল হয়?’ এইভাবে তিনবার বলার পরও কোন উত্তর না পেয়ে আবদার সহকারে সজোরে মুখ হতে কাপড়খানি টেনে সরাতেই দেখলেন, তিনি তাঁর কল্পিত মুছা মিঞা নন। তিনি মাইজভাণ্ডারী হযরত আকদাছই। মোরাকাবায় তিনি বিভোর এবং নয়ন যুগল তাঁর লোহিত বর্ণ। হযরতের সাথে বেয়াদবী হয়েছে মনে করে তিনি ভয় ও লজ্জায় জড়সড় হয়ে পড়লেন। তাঁর হৃদকম্পন উপস্থিত হল। হযরত আকদাছ তাঁর ভুল ও কাতরতা বুঝতে পেরে মৃদু হাস্যে বললেন, ‘চৈয়দ সাহেব নাকি! ভাই সাহেব আমি নাছারাগণকে কালেক্টরী পাহাড় হইতে নামাইয়া দিরাম তথায় এক কুরছি আপনাকে; এক কুরছি মৌলভী খোদা নওয়াজ সাহেবকে, এক কুরছি মৌলভী জুলফিকার আলী সাহেবকে প্রদান করিলাম।’ মৌলানা সৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ সাহেব হযরতের এই পবিত্র ভবিষ্যদ্বাণী এবং আধ্যাত্মিক ক্ষমতার আভ্যন্তরীণ প্রভাবের তাৎপর্য মর্মরহস্য উপলব্ধি করতে পারলেন না। প্রায় আট বৎসরকাল পর কোর্ট কাচারী উক্ত পাহাড় হতে স্থানান্তরিত হয়ে বর্তমান কাছারী পাহাড়ে চলে যায় এবং তথায় মোহছেনিয়া মাদ্রাসার পত্তন হয়। হযরতের ভবিষ্যদ্বাণীতে বর্ণিত মতে উক্ত মৌলভী সাহেবগণই এই মাদ্রাসায় প্রথম মোদাররেছ নিযুক্ত হন। তখন তিনি হযরতের ভবিষ্যদ্বাণীর প্রত্যক্ষ ফল দেখে তাঁর কালাম ও প্রভাব রহস্য বুঝতে পারলেন। এইভাবে হযরতের ইঙ্গিতে ও প্রভাবে চট্টগ্রামে সর্বপ্রথম ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়।” আওলাদে রাসুল হযরত ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ মির্জাপুরীর পূর্বপুরুষগণ ভারতের গৌড় রাজ্যের অধিকারী ছিলেন। শাহ ছৈয়দ নূর রেজা (র.) হচ্ছে মির্জাপুরী সাহেবের ঊর্ধ্বতন পঞ্চম পুরুষ, যিনি ষোল শহকের দিকে তৎকালীন নবাবী শাসন আমলের সুবেদার শায়েস্তা খাঁর অধীনে উত্তর চট্টগ্রামের দুই শাসক হিসেবে কর্মরত মীর্জা বাকের ও মীর্জা তাহেরের আমন্ত্রণে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে চট্টগ্রামের হাটহাজারী থানার অন্তর্গত মির্জা বাকের দিঘী ও গজার দিঘীর মধ্যবর্তী স্থানে বসতি স্থাপন করেন। ছৈয়দ মছিহ্ উল্লাহ মির্জাপুরী (কঃ) জীবন কর্মে পবিত্র ইসলাম ও মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকাকে প্রচারে নিবেদিত ছিলেন। তাঁর জীবনী ও কেরামত গ্রন্থটি প্রজন্মের সম্মুখে যত বেশি প্রচার করবে তত বেশি লাভবান হবে প্রজন্ম। প্রতি বছর ৪ চৈত্র তাঁর ওরশ শরীফ মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হয়। হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ নরনারী এই ওরশে সমবেত হয়ে ইহকাল ও পরকালের মঙ্গল কামনায় ইবাদত মগ্ন হন। আমি অধম মাইজভাণ্ডারী ত্বরিকার একজন ভক্ত ও অনুরাগী হিসেবে এই মহান গ্রন্থটি প্রচার প্রসার ও সফলতা কামনা করছি। লেখক: বিশিষ্ট মরমী গবেষক ও প্রাবন্ধিক

Leave a Reply

%d bloggers like this: