মনীষার কাছে ক্যানসার হেরেছে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০১ জুন ২০১৭, বৃহস্পতিবার: ডিয়ার মায়া ছবিতে মনীষা কৈরালা ২০১২ সালে কয়েক মাসের ব্যবধানে মনীষার পৃথিবী একেবারে ওলট-পালট হয়ে যায়। একের পর এক ফ্লপ ছবি, বিবাহবিচ্ছেদ, নতুন ছবির প্রস্তাব না পাওয়া—সবকিছু মিলিয়ে মনীষার দিনগুলো বিষণ্নতায় ভরে যায়। কিন্তু এরপর নেপাল বংশোদ্ভূত বলিউড অভিনেত্রীর জীবনে যে ভয়াবহ মোড় আসে, তার সামনে সব বিষণ্নতাই তুচ্ছ হয়ে ওঠে। ২০১২ সালের নভেম্বরে মনীষা জানতে পারেন, তাঁর ডিম্বাশয়ে (ওভারি) ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। এরপর তাঁর জীবনটাই যেন সেই একটা রোগে স্থবির হয়ে যায়। শুরু হয় ক্যানসারের সঙ্গে মনীষার লড়াই। লড়াকু মনীষা শেষমেশ জিতে যান। হেরে যায় ক্যানসার। জয়ী মনীষা এখন এক নতুন সত্তা নিয়ে পৃথিবীকে দেখছেন ভিন্ন চোখে। বদলে যাওয়া সেই মনীষার গল্পই বলব আজ—
মনীষার স্মরণীয় কিছু চরিত্রনব্বইয়ের দশকে মনীষা কৈরালা ছিলেন তরুণদের কাছে খোলা হাওয়ার মতো। মাধুরী দীক্ষিত, জুহি চাওলা, কাজলদের মতো পাকা ভারতীয় গড়ন-বরণের অভিনেত্রীদের ভিড়ে, মনীষা ছিলেন ‘ভিনগ্রহের অপ্সরী’র মতো। নেপাল থেকে আসা মনীষার হাসি, চাহনি, অভিব্যক্তি—সবই বলিউডপ্রেমী তরুণদের দিয়েছে নতুন বসন্তের আগমনের মতো আমেজ। তাই তো অচেনা দেশে এসেও নিজেকে চেনাতে বেগ পেতে হয়নি মনীষার। ১৯৯১ সালে অভিষেক হওয়া মনীষা অল্প সময়ের মধ্যেই ১৯৪২: আ লাভ স্টোরি, আকেলে হাম আকেলে তুম, বোম্বে, খামোশি, দিল সে-এর মতো ছবিতে অভিনয় করে নিজেকে নিয়ে গেছেন প্রথম সারির অভিনেত্রীর কাতারে।
নারী শিক্ষার প্রচারে নেপালের সিন্ধুপালচৌক নামের একটি গ্রামে মনীষা কথা বলছেন ২১ বছর বয়সী মায়ার সঙ্গেপ্রায় এক যুগ বলিউডে রাজত্ব করার পর যখন আর সব নায়িকার মতোই মনীষার দর্শক চাহিদায় ভাটা পড়তে শুরু করে, তখন এই পরিবর্তন তিনি জীবনের নতুন মোড় হিসেবে মেনে নেন। ভাবতে শুরু করেন, হয়তো এখন সময় হয়েছে আলো ঝলমলে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে ঘর-সংসারে থিতু হওয়ার। তাই তো ২০১০ সালের জুন মাসে সম্রাট দাহাল নামের এক নেপালি ব্যবসায়ীকে বিয়ে করেন মনীষা। তাঁদের পরিচয় হয়েছিল ফেসবুকে।
আমির খান ও মনীষা কৈরালা কিন্তু ২০১২ সালেই সংসারে ভাঙন দেখা দেয়। অল্প দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত হয় বিচ্ছেদ। সে সময়টায় সংসার ভাঙার শোক কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছিলেন মনীষা। হালকা জ্বর-সর্দি-পেটব্যথার মতো অসুস্থতা আর দুর্বলতাকে তিনি মনে করেছিলেন স্বাভাবিক বিষণ্নতা আর অবসাদের প্রভাব। এরপরও ভাইয়ের জোরাজুরিতে কাঠমান্ডুতে এক হাসপাতালে সাধারণ চেকআপের জন্য যান মনীষা কৈরালা। আর সব বদলে যায় এরপর থেকেই। চিকিৎসকেরা মনীষাকে যত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ শুরু করেন, ততই আবিষ্কার করতে থাকেন তাঁর ভেঙে পড়া অবস্থার ভয়াবহতা।
.ডিম্বাশয়ে ক্যানসার ধরা পড়ে মনীষার। নেপাল থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতে চলে যান তিনি। সেখানে আরও কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা। চিকিৎসকেরা জানান, ক্যানসার বেশ জটিলভাবেই জেঁকে ধরেছে তাঁকে। তাই আরও উন্নত চিকিৎসার্থে কেমোথেরাপি নিতে তিনি চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে অস্ত্রোপচার করে ডিম্বাশয় ফেলে দেওয়া হয় মনীষার। এরপর শুরু হয় কেমোথেরাপি। টানা চার মাস ১৮টি কেমো নিতে হয় তাঁকে। কেমোর প্রভাবে চুল, চোখের পাপড়ি, ভ্রু ঝরে যায়। এমনকি মনীষার কেমোর প্রভাব নাকি আরও ভয়াবহ রকমের হতে পারত।
কেমোথেরাপি নিয়ে ফেরার পর মনীষা কৈরালাগত মার্চে দেওয়া এক বক্তৃতায় মনীষা বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে তাঁকে একটি কাগজে সই করানো হয়েছিল যে কেমোর প্রভাবে তাঁর হৃদ্যন্ত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, শ্রবণশক্তি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে এবং এর প্রভাবে হয়তো মনীষার হাত সব সময় কাঁপতে পারে। এই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহ্য করার সাহস নিয়েই মনীষা সই করেন সেই কাগজে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এবং নিজের মনোবলের কারণে চুল ঝরে যাওয়ার চেয়ে বড় কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সহ্য করতে হয়নি মনীষাকে।
সাবেক স্বামীর সঙ্গে মনীষা কৈরালাচার মাসের কেমোযুদ্ধের পর মনীষার ভেতর থেকে ক্যানসার সেলগুলো নির্মূল হয়ে যায়। তিনি ফিরে আসেন নিজ দেশ নেপালে। জীবনের নতুন মানে খুঁজে পেয়ে যোগ দেন নতুন কাজে। তাঁকে সবাই চিনতে শুরু করে ‘মোটিভেশনাল স্পিকার’ বা ‘উদ্দীপনামূলক বক্তা’ হিসেবে। বিভিন্ন সেমিনার, ক্যানসার সচেতনতামূলক কার্যক্রম ও দাতব্য আয়োজনে তিনি তাঁর ক্যানসারের সঙ্গে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা বলতে শুরু করেন। গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েন নেপালে ইউএনএফপিএর শুভেচ্ছাদূত হিসেবে দাতব্য কাজে। ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান কখনো, কখনো আওয়াজ তোলেন বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে, কখনো আবার নারীশিক্ষার প্রচারে কথা বলেন তিনি। বাবা–মার সঙ্গে মনীষা কৈরালাতাহলে কি জীবনের নতুন মানে খুঁজে পেয়ে অভিনেত্রী মনীষা হারিয়ে গেলেন তাঁর নতুন সত্তায়? না, শিল্পী মনীষা কৈরালা হারিয়ে যাননি। তাঁকে আবার খুঁজে পাওয়া যাবে আগামীকাল থেকে। কাল শুক্রবার মুক্তি পাবে ৪৫ বছর বয়সী এ অভিনেত্রীর নতুন ছবি ডিয়ার মায়া। সেখানে সেই পুরোনো মনীষাই ফিরছেন, নাকি জীবনের নতুন অর্থ খুঁজে পাওয়া মনীষার দেখা মিলবে, তা জানার জন্য ডিয়ার মায়া দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে। আদর রহমান, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে, ডিএনএ ইন্ডিয়া, টেডএক্স টকস ও স্কুপহুপ অবলম্বনে

Leave a Reply

%d bloggers like this: