ভূমিকম্প মোকাবিলা: আগামীর অশনিসংকেত

মো. আবুল হাসান, খন রঞ্জন রায়: গত ৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ সময় ভোর পাঁচটা পাঁচ মিনিটে ঢাকা থেকে ৩৫১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভারতের মণিপুরের ইস্ফল থেকে ২৯ কিলোমিটার পশ্চিমে ও ৫৫ কিলোমিটার মাটির গভীরে রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৭ মাত্রার একটি ভূমিকম্প ঘটে। এই ভূমিকম্পের ঘটনায় ঢাকা, রাজশাহী, লালমনিরহাট ও জামালপুরে একজন করে মোট ছয়জন লোক আতঙ্কিত হয়ে মারা যান এবং সিলেট ও ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে বেশ কিছু লোক আহত হওয়ার খবর গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানা গেছে। Earth
বাংলাদেশের ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের মতে গোটা দেশকে উচ্চ, মধ্যম ও নিুমাত্রার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসাবে তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। উচ্চমাত্রার ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে জোন-১ এর বৃহত্তর রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহের ২০টি জেলা যা দেশের ৪৩ শতাংশ এলাকা। জোন-২ তে থাকা রাজধানী ঢাকায় ৮.০ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো ভূতাত্ত্বিক ফাটলরেখা না থাকলেও মাত্র ৬০ কিলোমিটার দূরে মধুপুর অঞ্চলে ৭.০ থেকে ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার মতো ভূতাত্ত্বিক ফাটল রয়েছে। বাংলাদেশের প্রায় ৬০ ভাগ এলাকা ৩টি প্লেট বাউন্ডারির সংযোগস্থলে থাকার ফলে সে সব অঞ্চল বেশি ভূমিকম্প প্রবণ। তা ছাড়া বাংলাদেশের ছয়টি স্থানে মাটির নিচে বড় ধরনের ফাটল রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ফাটলটি প্রায় ১০০ কিলোমিটার লম্বা। এই ফাটলের কারণে ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, রংপুর এবং দিনাজপুর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
ঢাকা থেকে সামান্য দূরত্বে অবস্থিত মধুপুর এলাকায় অবস্থিত ফাটলের কারণে ঢাকা এবং এর পার্শ্ববর্তী এলাকা ভূমিকম্প বা ভূমিধসে যে কোন সময়ে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। ভূমিকম্পের মাত্রা ৭ এর ওপরে উঠলে বাংলাদেশে বিশেষ করে রাজধানীর পুরান ঢাকার স্থাপনাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
৭ থেকে ৮ মাত্রা রিখটার স্কেলের ভূমিকম্পে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে ৫০ থেকে ৬০ হাজার স্থাপনা। বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হবে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় শহর। ঢাকায় রাতের বেলায় ৭.০ থেকে ৭.৫ তীব্রতার ভূমিকম্প হলে ৯০ হাজার মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে মৃত্যুবরণ করবে। দিনের বেলায় হলে এ সংখ্যা হতে পারে ৭০ হাজার। ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের ৩,২৬,০০০ ভবনের ওপর চালানো এক সমীক্ষায় জানা যায়, এ ধরনের তীব্রতার ভূমিকম্পে প্রায় ৭২ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে এবং প্রায় ৮৫ হাজার স্থাপনা মাঝারি ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে ইন্ডিয়া প্লেট এবং বার্মা প্লেটের সংযোগস্থল বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থিত যা ৩০ কিলোমিটার গভীরে এবং এর গতিপথ প্রতি একশ বছরে ১.৫ মিটার করে পরিবর্তন হচ্ছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা বৃদ্ধি পেলে হয়ত হাজার বছরে দেশে ৮ থেকে ৯ মাত্রারও ভূমিকম্প হতে পারে। ২০১২ সালের ৪ এবং ১২ ফেব্র“য়ারি ঢাকা থেকে ৪০২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ভারত-মায়ানমার সীমান্তে রিখটার স্কেলে ৬ দশমিক ৪ মাত্রার মাঝারি ধরনের দুটি ভূমিকম্প বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে অনুভূত হয়েছিল।
এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনও ভূমিকম্প না হলেও মাঝে মাঝে ছোট ও মাঝারি ধরনের ভূমিকম্পে জনমনে ব্যাপক ভীতির সঞ্চার করে গত ২০১৪ সালের ৯ সেপ্টেম্বর বিকাল ৩ টা ২৮ মিনিটে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রামে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৩ মাত্রার মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এ ভূ-কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল ভারত-মায়ানমার সীমান্ত এলাকায়। ইতিপূর্বে পঞ্চাশ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রার ভূমিকম্পে ২০১১ সালে ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬ টা ৪০ মিনিটে কেঁপে উঠেছিল গোটা বাংলাদেশ। ভূপৃষ্ঠের মাত্র ২০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে এবং ঢাকার ৬৯৫ মাইল দূরে উত্তর-পূর্ব ভারতের সিকিম রাজ্যে সৃষ্ট ৬ দশমিক ৮ তীব্রতায় প্রায় দু’মিনিট স্থায়ী হয়। বাংলাদেশে অনুভূত বেশির ভাগ ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিকিমে অথবা ভারত-মায়ানমার সীমান্তে। পরবর্তীতে ভারত মহাসাগরে উত্তর সুমাত্রায় সাগরের নিচে ৮.৬ উচ্চমাত্রার কম্পনে মহাসাগর সংলগ্ন এলাকায় কোথাও সুনামি না হলেও বঙ্গোপসাগরের উত্তর সাগরতলে ৬শ’ কিলোমিটারজুড়ে যে সিসমিক ফাটল রয়েছে সেখানে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত সুনামির প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। এই কম্পন হিমালয়ের পাদদেশে ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের মধ্যে সৃষ্ট সংঘর্ষের কারণে সংঘটিত হয় বলে বিশেষজ্ঞরা মত দেন।
জাতিসংঘ প্রণীত আর্থকোয়েক ডিজেস্টার ইনডেক্স অনুযায়ী পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভূমিকম্প-ঝুঁকিপূর্ণ ২০টি দেশের মধ্যে ঢাকার অবস্থান প্রথম। এখানে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার সে ৭২ হাজার ভবন গুঁড়িয়ে দিতে পারে এবং তাতে ৩ কোটি টনের ধ্বংসস্তুপ তৈরি হবে। যার পরিষ্কারের সক্ষমতা আমাদের নেই।
ভূমিকম্প এমনই এক প্রাকৃতিক দুর্যোগ যে এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে দিনক্ষণ জানিয়ে যেমন ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না, তেমনি এটা ঠেকানোরও উপায় নেই। এ অঞ্চলের ভূতাত্ত্বিক অবস্থা বিচার-বিশ্লেষণ করে অনেক বিশেষজ্ঞই সামনে বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কার কথা বলেছেন। আগাম সব ধরনের প্রস্তুতি আমাদের থাকা দরকার।
ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি সর্বনিু পর্যায়ে রাখার সবচেয়ে কার্যকর পথ হচ্ছে ভূমিকম্পসহনীয় ভবন ও স্থাপনা নির্মাণ। এ ব্যাপারে আমাদের গাফিলতির বিষয়টি স্পষ্ট। ভূমিকম্প আঘাত হানার পর স্বাভাবিকক্রমে বিধ্বস্ত হয়ে যায় পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মতো জরুরি ব্যবস্থাপনাগুলো। এসব দ্রুত পুনঃস্থাপনের সামর্থ্য বা প্রস্তুতি কোনটাই তেমন নেই বাংলাদেশে। ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকবিলা এবং দুর্যোগের পূর্বাভাস পাওয়ার সন্তোষজনক ব্যবস্থাও অদ্যাবধি গড়ি ওঠেনি। দেশের বর্তমান প্রযুক্তিগত অবস্থা ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ভূমিকম্প পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য অপ্রতুল।
ইতিপূর্বে উদ্ধার কাজে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের ভূমিকা জাতিকে হতাশ করেছে। সাধারণ মানুষ যেভাবে বীরত্বগাথা মহাকাব্য রচনা করেছে, তার ছিটে-ফোঁটাও দেখাতে পারেনি এই পেশার লোকেরা। অবাকের বিষয় বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সে কর্মরত প্রায় ৬ হাজার জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর দেশে কিংবা বিদেশে এ সংক্রান্ত প্রযুক্তিবিদ্যায় পূর্ব প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেই। বাংলাদেশের ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্স যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণভাবে বিদেশে থেকে আমদানিনির্ভর। অর্থের অভাবে নতুন আধুনিক যন্ত্রপাতি আমদানি না করে পুরাতন যন্ত্রপাতি ব্যবহারের ফলে অনেক ক্ষেত্রে উদ্ধার কার্যক্রম বিঘœ ঘটে। দেশে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স যন্ত্রপাতি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইনস্ট্রুমেন্টমেকিং ও ম্যানটেইনেন্স প্রযুক্তিবিদ প্রশিক্ষণের কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
একটি উন্নত জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে হলে নিজেদের নিরাপত্তা বলয় নিজেকেই সৃষ্টি করতে হবে।
ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ব্যবস্থাপনায় এনালগ কর্মকাণ্ড বাতিল করে ডিজিটাল করতে হবে। এ ব্যাপারে ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ নিুোক্ত ৮ দফা সুপারিশ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে।
১. সরকারি, আধা-সরকারি, পুলিশ সামরিকবাহিনী, বেসরকারি, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজিতে শিক্ষাপ্রাপ্ত টেকনোলজিস্ট নিয়োগনীতি প্রণয়ন ও নির্দেশনা প্রদান করা।
২. ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণবিহীন কর্মরত সকল চাকরিজীবীর বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করে ডিপ্লোমা ইন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং টেকনোলজিতে ডিগ্রিপ্রাপ্তদের নিয়োগ নির্দেশনা প্রদান।
৩. চার বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা ইন ল্যান্ড ফায়ার সার্ভিস, রিভার ফায়ার সার্ভিস, সিভিল ডিফেন্স ইনস্ট্রুমেন্ট মেকিং ম্যানটেইনেন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স চালু করা।
৪. সরকারি, সিটি কর্পোরেশন, বেসরকারি উদ্যোগে জেলা-উপজেলা, ইউনিয়নে একাধিক ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার সহযোগিতা ও নির্দেশনা প্রদান করা।
৫. তৃণমূলে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা নীতি সহজ ও সরলীকরণের লক্ষ্যে ব্রিটিশ পাকিস্তানিদের বিচ্ছিন্ন মতাদর্শের ডিপ্লোমা শিক্ষা নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান থেকে ডিপ্লোমা শিক্ষা কার্যক্রম পৃথক করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রশাসনিক বিভাগে স্বাধীন স্বতন্ত্র ডিপ্লোমা শিক্ষাবোর্ড প্রতিষ্ঠা নির্দেশনা প্রদান করা।
৬. উন্নত বিশ্বের মতো ‘বিভাগীয় ডিপ্লোমা শিক্ষাবোর্ড’ প্রদত্ত ডিপ্লোমা ইন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ডিগ্রিপ্রাপ্তদের নিয়োগ এবং উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা নির্দেশনা প্রদান করা।
৭. উপজেলার বিসিক শিল্পনগরী, জেলা, বিভাগীয় ভারী শিল্পনগরী, ইপিজেড এ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স ইনস্ট্রুমেন্ট শিল্প প্রতিষ্ঠার জন্য ডিপ্লোমাধারীদের সহজ শর্তে প্লট বরাদ্দ ও ব্যাংক ঋণ প্রদানের নির্দেশনা।
৮. (ক) বাংলাদেশে প্রস্তুত ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স যন্ত্রপাতি অধিদপ্তর, শিল্প-কারখানা, হাসপাতালে ব্যাপক সংযোগ ঘটানো।
(খ) বাংলাদেশে প্রস্তুত যন্ত্রপাতি বিদেশে রপ্তানি প্রদানে নির্দেশনা।
উপর্যুক্ত দফাসমূহ বাস্তবায়ন করলে জাতি যে কোন ট্র্যাজেডি উত্তরণ নির্ভাবনার প্রতীক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে। ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ প্রণীত উপরোক্ত ৮ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়ন হলে ভূমিকম্প পূর্ববর্তী জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরবর্তী অবস্থা মোকাবিলায় সরকারি / বেসরকারি ও সামাজিকভাবে যথেষ্ট প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। লেখক: সভাপতি মহাসচিব, ডিপ্লোমা শিক্ষা গবেষণা কাউন্সিল, বাংলাদেশ, ৪৭, মতি টাওয়ার, চকবাজার, চট্টগ্রাম। ০১৭১১ ১২২৪২৫, ০১৮২০ ১৩০০৯০ Khanaranjanroy@gmail.com

Leave a Reply

%d bloggers like this: