ভারত ৫৪টি গেট খুলে দেয়ায় লাখো মানুষ পানিবন্দী

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৩১ জুলাই, রবিবার: ভারত নিয়ন্ত্রিত গজলডোবা ব্যারেজের ৫৪টি গেট খেয়াল-খুশি মতো খুলে দেয়ায় তিস্তা নদীর তীরবর্তী লাখো মানুষ বন্যার পানিতে হাবুডুবু খাচ্ছে। গত দু’সপ্তাহ যাবৎ লালমনিরহাটে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল আর প্রবল বর্ষণের পানিতে লালমনিরহাটের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা-ধরলাসহ সবগুলো নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানির এ হঠাৎ আসা যাওয়ার জন্য তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ ভারত নিয়ন্ত্রিত গজলডোবা ব্যারেজকে দায়ী করেছেন। lalmonirhat _flood
আজ রোববার ভোর থেকে লালমনিরহাট সদরের কুলাঘাট পয়েন্টে ধরলা নদীর পানি বিপদ সীমার অনেক উপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও হাতীবান্ধায় দোয়ানী পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বিপদ সীমার সামান্য নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে বলে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে। এখনো পানিবন্দী আছেন ৯৫টি গ্রামের লাখো মানুষ। পানিবন্দী মানুষের অনেকে নিরাপদে চলে আসলেও অধিকাংশই রয়েছেন বিপদজনক অবস্থায়। অনেকে বাড়ি-ঘর ভেঙ্গে নৌকায় করে নিয়ে আসছেন বন্যামুক্ত এলাকায়।
বন্যায় সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ এলাকাগুলোর মধ্যে মোগলহাট, সানিয়াজান, গড্ডিমারী, মধ্য গড্ডিমারী, সিন্দুর্না, ডাউয়াবাড়ী, চর ভোটমারী, গোবর্ধন, বালাপাড়া, কালমাটি, কুলাঘাট, রাজপুর ও গোকুন্ডা ইউনিয়ন। বন্যা কবলিত মানুষগুলো বলছেন, যখন পানি চাই তখন পাই না, আর যখন চাই না তখন পানিতে ভেসে বেড়াই। এ প্রতিবাদী তিস্তা-ধরলা পাড়ের অসহায মানুষগুলো ভারতের এক তরফা পানি প্রত্যাহারের মতো আত্মঘাতী সিন্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন।
তিস্তা নদীর উজানে গজলডোবা নামকস্থানে ভারত একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে যার গেট রয়েছে ৫৪ টি । এ গেটগুলো দিয়ে ভারত নিজেদের ইচ্ছা মতো এক তরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করে আসছে। তিস্তা ব্যারেজের উজানে অবস্থিত গজলডোবা বাঁধের সবগুলো গেট খুলে দেয়ায় গত দু’সপ্তাহ ধরে এ জেলায় লাখো মানুষ ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে। এখনো উজানের ঢল অব্যাহত রয়েছে। যে কোন সময় আরো বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা করা হচ্ছে ।
এদিকে তিস্তা ও ধরলা পাড়ের পানিবন্দী পরিবারগুলো তাঁদের শিশু, বৃদ্ধ ও পরিজন এবং গৃহপালিত পশু নিয়ে অনাহারে-অর্থাহারে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। পানিবন্দী অনেকের বাড়িতে দু’সপ্তাহ ধরে রান্না-বান্না বন্ধ রয়েছে।
বয়োবৃদ্ধ মফিজুল ইসলাম বলেন, তিস্তা নদীর একমাত্র প্রবেশ মুখে ভারতের গজলডোবা নামকস্থানে বাঁধ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ ও বৃষ্টি বা বর্ষার সময় পানি ছেড়ে দেয়ার ফলে এ প্রবল বন্যা দেখা দিয়েছে। পানির আকস্মিক আসা যাওয়ার ঘটনায় তিস্তা পাড়ের মানুষেরা চরম আতঙ্কে নিদ্রাহীন রাত কাটাচ্ছেন। শুস্কু মৌসুমে যখন পানির প্রয়োজন হয় তখন পানি পাওয়া যায়না । আবার বর্ষা মৌসুমে যখন পানির প্রয়োজন হয় না তখন নিজেদের খেয়াল খুশি মতো পানি ছাড়ছে ভারত।
এ কারণে ১৫শ কোটি টাকা ব্যয়ে লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলায় অবস্থিত দেশের সর্ব বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ নির্মাণ করা হলেও এটি এ অঞ্চলের মানুষের ভাগ্য উন্নয়নে কোন কাজে লাগছে না। ভারতের গজলডোবা ব্যারাজের উজান থেকে ধেয়ে আসা বালু ও পাথর বৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজ ও তার আশপাশের এলাকা ভরাট হয়ে যায়। এ কারণে শুস্ক মৌসুমে দেখা দেয় পানি শূন্যতা এবং বর্ষা মৌসুমে দেখা দেয় অকাল বন্যা। ফলে লালমনিরহাট ও তার আশপাশের জেলাগুলোতে কৃষি ব্যবস্থায় এর বিরুপ প্রভাব পড়েছে।
দ্রুত দু’দেশের আলোচনার ভিত্তিতে পানি সমস্যা সমাধান করার দাবি জানিয়েছেন তিস্তাপাড়ের লাখো মানুষ। তা না হলে অচিরেই এ জনপদের লাখ লাখ মানুষ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়বে বলে অনেকেই মনে করছেন ।
বহুল আলোচিত তিস্তা নদীর পানি চুক্তি নিয়ে বাংলাদেশ ভারত সরকারের মাধ্যমে বার বার আলোচনা হয়েছে এতে কোন লাভ হয়নি। সর্বশেষ ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং বাংলাদেশ সফরে তিস্তার পানি বন্টন চুক্তি হবে এমন আশার বাণীতে অপেক্ষায় ছিলেন তিস্তাপাড়বাসী । কিন্তু কোন ফলপ্রসু আলোচনা না হওয়ায় অনেকটা অনিশ্চিয়তার মধ্যে ঝুলে আছে বহুল আলোচিত তিস্তার এ পানি চুক্তি। পানি চুক্তি নিয়ে তিস্তাপাড়ের মানুষের মধ্যে যে আশার আলো দেখা দিয়েছিল তা বাস্তবায়নে উভয় দেশ দ্রুত পদক্ষেপ নিবে এ দাবিতে পদ্মাপাড়ের লাখো মানুষের।
এ ব্যাপারে তিস্তা ডালিয়া বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বর্তমানে ডালিয়া পয়েন্ট পানি বিপদসীমার নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গজলডোবা ব্যারেজ দিয়ে পানি নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে তিনি এটি অন্য দেশের ব্যাপার বলে মন্তব্য করেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: