ভারতে ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিলের ফলে অর্থনীতিতেই ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৬ ডিসেম্বর, শুক্রবার: ভারতে ৫০০ ও ১০০০ রুপির নোট বাতিলের ফলে কেবল দেশটির অর্থনীতিতেই নয়, আরও নানা খাতে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। এরমধ্যে একটি হলো- বাংলাদেশীরা আগে যেভাবে ভারতে চিকিৎসা নিতে যেত, এখন সেটা কমে গেছে। এছাড়াও মার খাচ্ছে পর্যটন ব্যবসায়। এ নিয়ে কলকাতার একটি পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, কলকাতার বহু বেসরকারি হাসপাতাল, নার্সিংহোমে রোগীদের বড় একটা অংশ যান বাংলাদেশ থেকে। নোট বাতিলের জটিলতায় সেই সংখ্যা এক ধাক্কায় কমে গেছে ৫০ শতাংশে। ক’দিন আগে অবস্থা আরও খারাপ ছিল। বিভিন্ন হাসপাতাল, নার্সিংহোম বাংলাদেশের নাগরিকদের সমস্যা কমাতে ভারতীয় মুদ্রার বদলে ডলারও নেয়া শুরু করেছে। চালু করেছে ই-ওয়ালেটের ব্যবস্থা। এমনকি যাঁরা নিয়মিত আসছেন, তিন বা চারবার ঘুরে গেছেন, তাঁদের জন্যে ধারের ব্যবস্থাও হয়েছে। যদিও এই ব্যবস্থা ঘোষণা করা হয়নি। পারস্পরিক বোঝাপড়ার মধ্যে দিয়ে চলছে। তবে এ সবে চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে কিছুটা সুরাহা হলেও সমস্যা থেকেই যাচ্ছে ওষুধ-পথ্য, হোটেল ভাড়া ও অন্যান্য খরচের ক্ষেত্রে।
চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ‘মেডিক্যাল টুরিজিম’ও। যারা বাইরের দেশ থেকে চিকিৎসা করাতে ভারতে যান, তাঁরা খানিকটা বেড়িয়ে ফিরতে চান। মার খাচ্ছে সেই পর্যটনও। কমে গেছে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া ভ্রমণার্থীর সংখ্যাও।
ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন জানিয়েছে, ভারতে যাওয়ার জন্য ভিসা আবেদনকারীর সংখ্যা কমেনি। তবে নোট বাতিলের পর ভারতে ঘুরতে যাওয়ার আগ্রহ কমেছে। যেটুকু না গেলেই নয়।
অন্যদিকে ঢাকার খবরে বলা হচ্ছে, যারা যাচ্ছেন তাঁরা জরুরি চিকিৎসা করাতেই যাচ্ছেন। তাও দু’একদিন কোনও মতে থেকেই আবার দেশে ফিরে আসছেন। আর যারা নতুন করে চিকিৎসা করাতে ভারতে যাবেন বলে ভাবছিলেন, তারা সিদ্ধান্ত বদলে যাচ্ছেন ব্যাংককে।
জানা গেছে, অনেক বাংলাদেশিই এখন ভিসা নিয়ে রেখে দিচ্ছেন। ভারতে টাকার সমস্যা কমলে তার পর যাবেন বলে। বাংলাদেশি পর্যটকদের ভারত ভ্রমণের জন্য ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশন থেকে এক বছরের মাল্টিপল ভিসা দেয়া হয়। ফলে এখনই ভিসা পেলেও যাওয়ার সুযোগ থাকবে আগামী এক বছর। তাই ভিসা নিয়ে রাখলেও রওনা হচ্ছেন না বেশির ভাগই। টাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে যাবেন। পর্যটক ছাড়াও বিশেষ ক্ষেত্রে সিনিয়র সিটিজেনদের ভারতের জন্য ভিসা দেয়া হয় ৫ বছরের। ফলে তারাও সবাই ভিসা নিয়ে রাখছেন, কিন্তু এখনই যাচ্ছেন না। ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ভিসা ইস্যু করে। এখনও ইস্যু হচ্ছে প্রায় একই পরিমাণ ভিসা।
এদিকে কলকাতায় আমরি হাসপাতালের সহ-সভাপতি রূপক বড়–য়া জানান, আমাদের ৩টি হাসপাতাল মিলিয়ে দিনে প্রায় ১০০ জন বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা করাতে আসতেন। নোট বাতিলের ঘোষণার পর প্রথম দু’তিন দিন এই রোগীর সংখ্যা খুবই কমে গিয়েছিল। এখন এই সংখ্যার কিছুটা উন্নতি হয়ে ৫০-এ এসে ঠেকেছে। আসলে অনেকেই এই জটিলতা না কাটলে ভারতে আসার সাহস পাচ্ছেন না। একমাত্র যারা আগে চিকিৎসা করিয়ে গেছেন, তারা নিজেদের রিপোর্ট দেখাতে আসছেন। এদের অনেকেরই এই সময় সার্জারির ডেট ছিল। একান্ত জরুরি না হলে তারা সেই ডেট পিছিয়ে দিচ্ছেন।
শহরের আরেক হাসপাতাল আর এন টেগোরের সহ-সভাপতি দেবাশিস রায় জানিয়েছেন, আমরা আগে থেকে ডলার নিতাম না। শুধুমাত্র ভারতীয় মুদ্রাই নিতাম। এই নোট জটিলতার পরে বিদেশি নাগরিকদের কাছ থেকে ডলার নিতে শুরু করেছি। কিন্তু তাতেও বিশেষ লাভ হচ্ছে না। বাংলাদেশ থেকে আমাদের এখানে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীর সংখ্যা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। আসলে বাংলাদেশ থেকে যারা চিকিৎসা করাতে আসেন, তারা বেশির ভাগ নগদ ভারতীয় মুদ্রার ব্যবহারই করে থাকেন। ই-পেমেন্ট বা ডলার সম্বন্ধে অতটা ওয়াকিবহাল নন। তাই এই জটিলতা না কাটলে তাঁরা আসতে চাইছেন না। তিনি বলছেন, বাংলাদেশ থেকে যে সব রোগী চিকিৎসা করাতে আসেন, তাদের অনেকেরই ইচ্ছে থাকে ভারতের এদিক-ওদিক ঘুরে দেখার। তাদের সেই ইচ্ছেয় বাদ সাধছে নোট বাতিলের জটিলতা।
অন্যদিকে শুধুমাত্র বিদেশ থেকে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীদের সাহায্য করার জন্য ৭০ জনের একটি বিশেষ দল গঠন করেছে অ্যাপোলো হাসপাতাল। সংস্থার সিইও রূপালি বসু জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা প্রচুর পর্যটক আগে আমাদের এখানে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য আসতেন। নোট বাতিলের ফলে সেই সংখ্যা বেশ কমেছে। এ ছাড়া আমাদের হাসপাতালে দিনে বহির্বিভাগ এবং অন্তর্বিভাগ মিলিয়ে মোট রোগীর সংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশই বাংলাদেশ থেকে আসা নাগরিকরা আসেন। নোট বাতিলের ফলে সেই সংখ্যাও কমেছে। যারা বাংলাদেশ থেকে তৃতীয় বা চতুর্থবারের জন্য চিকিৎসা করতে আমাদের হাসপাতালে এসেছেন, তাদের জন্য বিশেষ ক্রেডিটের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। যাতে তারা দেশে ফিরে গিয়ে টাকা পাঠাতে পারেন। তবে সেক্ষেত্রেও অনেকে এই জটিলতার কারণে ভারতে আসতে চাইছেন না। অনেকেই এখন সার্জারি করাতে চাইছেন না। তারা চাইছেন ওষুধের মাধ্যমে আপাতত সার্জারি পিছিয়ে দিতে।
বেনাপোলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশিদের সংখ্যা বেশ কমে গেছে। বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতে যান, তাদের অধিকাংশই ঘুরতে যান। বেশির ভাগই কলকাতা হয়ে ভারতের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ান। শীতের মরশুমের শুরুতে এই ভিড় আরো বেড়ে যায়। অন্যবার চড়া পরিস্থিতি থাকলেও এবার শীতের শুরুতে ভিড় সেভাবে বাড়েনি। ঢাকার একটি পর্যটন সংস্থার কর্ণধার আশুতোষ পাল জানান, প্রতি বছরই ডিসেম্বরের শুরুতে ভারতে যাওয়ার চাপ বেড়ে যায়। তবে এবার চাপ তুলনায় বেশ কম।
বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি পর্যটন সংস্থা জানিয়েছে, টাকার জটিলতায় বাংলাদেশের মানুষের ভারতমুখী হওয়া কিছুটা কম থাকলেও সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে এই শীতে ভারতকে কেন্দ্র করে তাদের পর্যটন ব্যবসা মার খাবে। -তথ্যসূত্র : নয়া দিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*