বড় বন্যার আশঙ্কা আগস্টে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১০ জুলাই: উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের উত্তর ও উত্তর-মধ্যাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। সরকারের বন্যা সতর্কীকরণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের (এফএফডব্লিউসি) তথ্য অনুযায়ী ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ধলেশ্বরী ও কংস নদীর পানি তিন দিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিকে বইছে।flood
এসব নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। কুশিয়ারা, সুরমাসহ অন্যান্য নদীর পানিও বাড়ছে। এ কারণে ওইসব এলাকার লাখ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধান করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে অতিবর্ষণের কারণে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে। সেখানে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ বড় ধরনের বন্যার মুখোমুখি হবে। বিশেষ করে লা-নিনোর প্রভাবে আগস্টে এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন তারা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইন্সটিটিউটের অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম বলেন, এল-নিনো ও লা-নিনোর (প্রশান্ত মহাসাগরে পানির উষ্ণায়ন থেকে সৃষ্ট বিশেষ পরিস্থিতি) প্রভাবে সাধারণত বন্যা হওয়া ও না-হওয়া নির্ভর করে।
২০১৪ সালে এল-নিনো শুরু হয়েছে। এর প্রভাবে ইতিমধ্যে ভারত, পাকিস্তান ও চীনে বন্যা হয়েছে। এল-নিনোর প্রভাবে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে সাধারণত বন্যা হয়ে থাকে। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে; লা-নিনোর প্রভাবেও অতিবৃষ্টির কারণে বন্যা হয়। চলতি বছর লা-নিনো আসতে পারে এবং সারা দেশে বন্যাও হতে পারে।
কারণ চলতি বছর প্রকৃতিতে কিছু ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা গেছে। এবার এপ্রিলে প্রচ- দাবদাহ হয়েছে, স্মরণকালের ভয়াবহ বজ পাত এবং ফ্লাশ ফ্লাডও হয়েছে। চলতি বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৯ শতাংশ বৃষ্টি বেশি হতে পারে। তাছাড়া বাংলাদেশে জুলাইয়ের শেষে ও আগস্টের শুরুতে সাধারণত বন্যা হয়ে থাকে। সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে, এবার বড় ধরনের বন্যা হতে পারে।
এফএফডব্লিউসির তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কুড়িগ্রামের চিলমারী পয়েন্টে ৩১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বইছে। যমুনার পানিও বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ৫ সেন্টিমিটার ও বগুড়ার সারিয়াকান্দিতে বিপদসীমার ওপরে আছে। টাঙ্গাইলের সদর উপজেলার এলাসিনে ধলেশ্বরীর পানি এক সেন্টিমিটার এবং নেত্রকোনার জারিয়াজঞ্জাইল পয়েন্টে কংস নদীর পানি বিপদসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া নাটোরের গুর নদীর পানি বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে। আবহাওয়া অধিদফতর (বিএমডি), পানি উন্নয়ন বোর্ড, বুয়েটের বন্যা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চলতি বছর স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ থেকে ৯ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে। আর এটি হলে আগস্টে দেশে বড় ধরনের বন্যা হতে পারে।
এফএফডব্লিউসির বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর অবস্থার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদ, সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। কিন্তু যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মার পানি বাড়ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জানিয়েছেন, ২৪ ঘণ্টা পর যমুনা নদীর পানি কমতে পারে। ব্রহ্মপুত্র নদের বর্তমান অবস্থা ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। অপরদিকে যমুনা নদী বাহাদুরাবাদ এবং সারিয়াকান্দি পয়েন্টে আগামী ৪৮ ঘণ্টায় বিপদসীমার নিচে নেমে আসতে পারে। গঙ্গা-পদ্মার পানি সমতলে ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে বলেও জানান এ প্রকৌশলী।
জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আবদুল মান্নান জানান, উপজেলার পাথর্শী, নোয়ারপাড়া, কুলকান্দি, সাপধরি, চিনাডুলি ও বেলগাছা ইউনিয়নের ২০টি গ্রামের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বেলগাছা ইউনিয়নের ঘোনাপাড়া, চিনাডুলির গুঠাইল ও শিংভাঙা পয়েন্টে ভাঙন দেখা দিয়েছে।
ঘোনাপাড়া গ্রামের অন্তত ৫০টি বাড়ি যমুনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের হুমকির মুখে রয়েছে। এসব এলাকার লাখ লাখ মানুষ বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে।
এদিকে এর আগে আবহাওয়া অধিদফতর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বুয়েটের বিশেষজ্ঞ এমনকি জাতিসংঘের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমওর রিপোর্টেও চলতি বছর বাংলাদেশে বন্যার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি ৮ বছর পর বড় ধরনের বন্যার আশংকা থাকে।
তবে ২০০৭ সালের পর এখন পর্যন্ত বড় ধরনের বন্যা দেখা যায়নি বাংলাদেশে। চলতি বছর বড় আকারের বন্যা দেখা দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বড় বন্যা হলে দেশের ৪০টি জেলা আক্রান্ত হতে পারে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের বন্যা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ২২ জুন এমন আগাম তথ্য প্রকাশ করা হয়।
জাতিসংঘের আবহাওয়াবিষয়ক সংস্থা ডব্লিউএমওর রিপোর্টে বলা হয়, এল-নিনোর প্রভাবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশসহ ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলের দেশগুলোয় প্রচ- খরা ও বন্যা দেখা দিতে পারে। আর বাংলাদেশের নিচের কিছু অংশ ক্রান্তীয় এবং বাকি অংশ উপক্রান্তীয় অঞ্চলে পড়ায় এল-নিনোর বিরূপ প্রভাব পুরোপুরিই বাংলাদেশে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*