বৈধ অস্ত্রে চলছে হত্যাকাণ্ড লাইসেন্স পাচ্ছে সন্ত্রাসীরাও!

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : সারাদেশে বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের অপব্যবহার থামছে নাPistal। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় ক্রমান্বয়ে এসব আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বাড়তে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন। খবরে প্রকাশ দেশের চারপাশের সীমান্ত দিয়ে অপ্রতিরোধ্যভাবে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র আনা হচ্ছে। সীমান্তের ৪৮টি পয়েন্ট দিয়ে প্রতিদিন ঢুকছে অবৈধ অস্ত্রের চালান। সীমান্ত দিয়ে যে অস্ত্রের চালান আসছে তা হাত বদল হয়ে রাজধানী ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সন্ত্রাসী ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের কাছে পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। পুলিশ বলছে, ঢাকার এলাকাভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো অবৈধ অস্ত্র ও গুলির মজুদ বাড়াচ্ছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তামূলক তৎপরতা যখন কম থাকে তখনই অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। দেখা দেয় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখছে। অপরাধ বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে সন্ত্রাসীদের হাতে এমন অত্যাধুনিক অস্ত্র এসেছে, যা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছেও নেই। এর চেয়েও আশঙ্কার বিষয় হলো, বৈধ অস্ত্র এখন অবৈধ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাজধানীতে ছিনতাই-চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের প্রায় অর্ধশত ঘটনায় বৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহৃত হলেও এসব ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতার করা হয়নি। অবশ্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ সবুজবাগ থানার কদমতলা ব্রিজের পাশে ‘বাংলাদেশ মোবাইল সার্ভিসিং এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এসোসিয়েশন’ কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে গত ডিসেম্বর ১ হাজার রাউন্ড গুলি ও ৩টি বিদেশি অস্ত্রসহ সাইফুল্লাহ খালিদ নামের এক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে। উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও গুলিগুলো ছিলো বিদেশি। এগুলো রাজধানীর অস্ত্রের লাইসেন্সধারী ব্যক্তিদের কাছে সুলভ মূল্যে বিক্রি করার জন্য আনা হয়ে ছিলো বলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন খালিদ। গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার জানিয়েছেন, গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি পেশাদার অস্ত্র ব্যবসায়ী। আমদানি করা অস্ত্রগুলো তিনি যুবলীগের এক কেন্দ্রীয় নেতাকে হত্যার পরিকল্পনাকারীদের কাছে সরবরাহের জন্য ঢাকায় এনে ছিলেন। এসব আগ্নেয়াস্ত্র ডাকাতি, অপহরণ, জমি দখল, দাঙ্গা-হাঙ্গামা, ছিনতাই, চাঁদাবাজী এমনকি টেন্ডারবাজীসহ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ব্যবহার করা হচ্ছে। খোদ রাজধানীতে বেশ কয়েকটি চাঁদাবাজী ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সরেজমিনে খোঁজ করে এ তথ্যের প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্র জানায়, ১৯১১ সাল থেকে ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন ধর্নাঢ্য ব্যক্তিদের জান-মালের নিরাপত্তার জন্য বর্তমান বাংলাদেশের এ ভূ-খণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স প্রথা চালু করে। ওই প্রথা অনুযায়ী পরবর্তীতে দেশের ধনাঢ্য ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সন্ত্রাসীরা প্রভাব খাটিয়ে তাদের জানমালের নিরাপত্তার নামে লাইসেন্স গ্রহণ করেন। শুধু তাই নয়, তাদের ব্যক্তিগত সিকিউরিটি গার্ড ও বিশ্বস্ত লোকজনের নামে লাইসেন্স গ্রহণ করছেন। এসব লাইসেন্সধারীরা নাইন শুটার, সেভেন শুটার, সিক্স শুটার, পয়েন্ট টু-টু বোর রাইফেল, এক নালা-দোনালা বন্দুক, কেনিবারের রিভলবার ও পিস্তলের লাইসেন্স নেওয়া হয়। পুরনো ঢাকার সংসদ সদস্য ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী মো. সেলিমের লাইসেন্সকৃত নাইন শুটার দিয়ে তার ব্যক্তিগত গার্ড নিজ দলের মিছিল থেকে অপর রাজনৈতিক মিছিলে হামলার চেষ্টা করায় সারাদেশে এ নিয়ে সমালোচনার ঝড় উঠে ছিলো। অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন ব্যক্তি নিজের নামে ও বেনামে একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স গ্রহণ করছেন। অনেকেই দীর্ঘ দিন যাবৎ লাইসেন্স নবায়ন করছেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার। অনেকেই এসব লাইসেন্সের অনুকূলে সুলভ মূল্যে গোলাবারুদ সংগ্রহ করে সন্ত্রাসীদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে লাইসেন্স গ্রহীতাদের যথাযথ যোগ্যতা না থাকার পরও রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের দাপটে তারা লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, এমনও লাইসেন্সধারী আছেন যারা তাদের আগ্নেয়াস্ত্রগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করার যোগ্যতাও রাখেন না। ফলে হত্যাকাণ্ডের মতো বড় বড় অপরাধ ঘটেই চলেছে। গত ২০১০ সালের ১৪ আগস্ট রাজধানীর শেরেবাংলা নগর এলাকায় সরকার দলীয় সংসদ সদস্য নুরুন্নবী চৌধুরী শাওনের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে যুবলীগ নেতা ইব্রাহিম খুন হন। তার গাড়ি চালক প্রথমে শেরেবাংলা নগর থানায় অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে। গাড়ি চালক আবুল কালাম ওরফে কালা সংসদ সদস্য শাওনের পিস্তল দিয়ে গুলি করলে ইব্রাহিম খুন হন বলে আদালতে স্বীকারোক্তি প্রদান করেন। এছাড়া, গত ২০০৮ সনের ২৩ মে পুরনো ঢাকার ২ নম্বর র‌্যাংকিন স্ট্রিটের ব্যবসায়ী অপুদে’র বাসায় সন্ধ্যায় ৫/৬ জন অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী চাঁদার দাবিতে অস্ত্র-শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা চালায়। তখন স্থানীয় লোকজন সন্ত্রাসীদের প্রতিরোধ করার চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা এলোপাথাড়ি গুলি করে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এতে ব্যবসায়ী অপু গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ঘটনায় তার দুই ভাই গুরুতর আহত হন। স্থানীয় লোকজন ঘটনাস্থল থেকে রবিন নামের এক সন্ত্রাসীকে আটকের পর গণপিটুনী দিয়ে পুলিশে সোপর্দ করে। ঘটনার একদিন পর সূত্রাপুর থানায় সন্ত্রাসী রাসেল, মাহবুব, মুন্না ও রবিনসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি তদন্তের জন্য মহানগর গোয়েন্দা অফিসে ন্যস্ত করা হয়। গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত শেষে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ ঘটনার ৩ মাস পর ২৩ জুলাই রংপুর জেলার কাউনিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে সন্ত্রাসী মনজরুল আবেদীন ওরফে রাসেল, মাহবুব আলম, মোহাম্মদ আলী ওরফে মুন্নাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতদের ঘটনাস্থলে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশের কাছে জানায়, পুরনো ঢাকার অপু হত্যার ঘটনায় ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্র রাজধানীর মিরপুর থানার পেছনে তাদের কথিত বড় ভাই হাফিজ উদ্দিন ওরফে টুলুর কাছে জমা রাখা হয়েছে। গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা রংপুর থেকে ঢাকায় টুলুর অফিসে অভিযান চালানোর জন্য সংবাদ দেয়। গোয়েন্দা পুলিশের এডিসি মাহবুবুল আলমের নেতৃত্বে একদল সাদা পোষাকের পুলিশ মিরপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে হাফিজ উদ্দিন ওরফে টুলুর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে জার্মানির তৈরি ৩টি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, ৩টি কার্তুজ ও ৫৯ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করে। গ্রেফতারকৃতরা পুলিশের কাছে জানায়, তাদের ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রগুলো লাইসেন্স করা। পুলিশের পক্ষ থেকে ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সগুলো বাতিলের জন্য আবেদন করা হয়। জেলা প্রশাসকের দপ্তর থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্সধারীদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য নোটিশ করা হয়। অন্য এক ঘটনায় কামরাঙ্গীরচর থানার সুলতানগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মনির চেয়ারম্যানের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে ২০০৯ সালের ৯ জুন মো. হাসান (১৭) নামে এক কাঠের দোকানের কর্মচারী নিহত হয়। তার বাবার নাম সিদ্দিকুর রহমান। বরিশাল জেলার বানারীপাড়া ইলুঘাট গ্রামে তাদের বাড়ি বলে জানা গেছে। ঘটনার পর কামরাঙ্গীরচর থানায় একটি রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মামলা দায়ের করা হয়। মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশ তদন্ত পূর্বক রাজধানীর বাড্ডা এলাকায় অভিযান চালিয়ে চেয়ারম্যান মনির হোসেনকে গ্রেফতারের পর হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রটি উদ্ধার হয়। ওই মামলা মনির চেয়ারম্যান দীর্ঘ দিন জেল খাটার পর এখন এলাকায় অবস্থান করছেন। গত ২০০২ সালে ধানমন্ডি গভ. হাইস্কুলের শিক্ষক স্বপন কুমার গোস্বামীকে জনৈক সরকারি কর্মকর্তার লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাছাড়া, নগরীর ঝিগাতলা এলাকায় বিশিষ্ট চলচ্চিত্র পরিচালক ড্যানি সিডাকের লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে তার মেয়ে নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, দেশের ভদ্রবেশি কতিপয় ধনাঢ্য ব্যবসায়ী একাধিক আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিয়ে সন্ত্রাসী কাজে ব্যবহার করছে। আবার অনেকে জমি দখল, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এমনকি অপহরণের কাজে লাইসেন্সকৃত আগ্নেয়াস্ত্র ভাড়া দেয়ার ব্যবসা করছে। ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনার পর থেকে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে কঠোর নিয়ম করা হয়েছে বলে জেলা প্রশাসক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে। এ ব্যাপারে ঢাকা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পুলিশ কমিশনার (জনসংযোগ) মাসুদুর রহমান গত ৪ এপ্রিল জানান, এসব অস্ত্র ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সূত্র : শীর্ষনিউজ

Leave a Reply

%d bloggers like this: