বৃষ্টি শুরু হয়েছে, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৬ জুলাই: বৃষ্টি শুরু হয়েছে, ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। ডেঙ্গু এডিস মশাবাহিত ভাইরাস রোগ। ২০০০ সাল থেকে ব্যাপক হারে হচ্ছে আমাদের দেশে মৌসুমি এ রোগ।
মশা : এডিস ইজিপ্টি মশা জঙ্গলে থাকে না। রাতে কামড়ায় না। গায়ে দাগকাটা মশা একবারে অনেককে কামড়াতে পারে। ম্যালেরিয়ার মশার মতো একজনের রক্ত খেয়েই পরে থাকে না।1
গৃহপালিত এ মশা ঘরে, চৌকির নিচে, পর্দার ভাঁজে, বেসিনের নিচে লুকিয়ে থাকে। পানিতে বংশবিস্তার করে। ছোট পাত্রে ৫ দিনের কম জমে থাকা পানিতে। নর্দমায় নয়, ডোবায় দিনের পর দিন জমে থাকা ময়লা পানিতে নয়, নদী, সাগর, বিলের পরিষ্কার বহমান পানিতে নয়, এই মশা বংশবিস্তার করে ফুলের টবের নিচের জলকান্দার পানিতে, বৃষ্টির দিনে রাস্তার ধারে জমা পানি, নির্মাণসামগ্রীতে থাকা পানি, ক্যান, নারিকেলের খোলায় জমা পানিতে।
উপসর্গ : জ্বরই প্রধান উপসর্গ। চামড়ায় দানা (র‌্যাশ), রক্তক্ষরণ হয়ে থাকে কারও কারও।
জ্বর : অন্য ভাইরাস জ্বরের মতো ডেঙ্গুজ্বর সাত দিনের বেশি থাকে না। প্রথমদিন থেকেই বেশি জ্বর নিয়ে রোগীরা আসে। একটানা উচ্চ তাপমাত্রা থেকে ছয় দিনের দিন জ্বর চলে যেতে পারে। দু’দিন পর একদিন জ্বর না থেকে আবার দু’দিনের জ্বর (স্যাডল ব্যাক ফিভার) থাকলে তারপর জ্বর চলে গেল তাও হতে পারে। অন্য ইনফেকশন না হলে, এক্সটেন্ডেড না হলে ডেঙ্গুজ্বর ছয় দিনের বেশি থাকে না।
অন্য উপসর্গ
ব্যথা : সব জ্বরে বিশেষ করে ভাইরাস জ্বরে গা ম্যাজম্যাজ করে, ব্যথা করে। ডেঙ্গুতে ব্যথা বেশি হয়। অনেকের এত বেশি হয় যে এটাকে হাড় ভাঙার ব্যথার (ব্রেকিং বোন ডিজিস) সঙ্গে তুলনা করে। ডেঙ্গুতে চোখের পেছনে (রেট্রাঅরবিটাল পেইন) হয়।
রক্তক্ষরণ: চামড়ায়, মুখে, খাদ্যনালিতে, চোখে হতে পারে। তবে বেশি যেটা হয় সেটা হল মেয়েদের। মাসিক একবার হয়ে গেলেও একই মাসে আবার মাসিক হয়।
দানা (র‌্যাশ) : ডেঙ্গুর টিপিক্যাল রাশ বেরোয় জ্বরের ষষ্ঠ দিনে। তখন জ্বর থাকে না। এজন্য এটাকে কনভালেসেন্ট কনফ্লুয়েন্ট পেটিকিয়াল র‌্যাশ বলে। পায়ে বা হাত থেকে শুরু হয়- দেখলেই চেনা যায়, খুঁজতে হয় না। ডেঙ্গুতে অন্য র‌্যাশ হতে পারে সেগুলো টিপিক্যাল নয়। আরেকটা জিনিস হয় জ্বরের প্রথমদিকে- গায়ে চাপ দিলে আঙুলে ছাপ পড়ে অর্থাৎ ফ্লাশিং হয়।
ডেঙ্গুর তিনটা ফেইজ
১. ফেব্রাইল ফেইজে জ্বর ও জ্বরের উপসর্গগুলো থাকে।
২. এফেব্রাইল ফেইজে জ্বর চলে যায়। তবে এটাকে ক্রিটিক্যাল ফেইজও বলে। কারণ ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভারে এই স্টেজটা মারাত্মক সব জটিলতা হতে পারে। ডেঙ্গু তাই অন্য জ্বর থেকে আলাদা কারণ জ্বর চলে যাওয়ার পরই আসল সমস্যা হয়। এটা ২ দিন থাকে। জ্বর না থাকলেও এ সময় সতর্ক থাকতে হয়।
৩. কনভালেসেন্ট ফেইজ- অধিকাংশই ভালো হয়ে গেলেও কেউ কেউ ভীষণ দুর্বল হয়। বিষণ্ণতায় ভোগে।
ডেঙ্গু দুই ধরনের
ক. ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু ফিভার : আর দশটা ভাইরাল ফিভারের মতো। ভয় না পেলে কোনো সমস্যা নেই।
খ. ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার : ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুর সবকিছুই থাকে। রক্তনালির লিকিং হয় বলে বাড়তি কিছু সমস্যা হয়। ঠিকমতো হ্যান্ডলিং না করলে জীবনের ঝুঁকি আসতে পারে।
জ্বরের সঙ্গে যদি প্লটিলেটনকাউন্ট এক লাখের কম হয় এবং হিমাটক্রিট ২০% ভ্যারিয়েশন হয় তবে সেটা ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার। লিকিংয়ের অন্য উপসর্গ যেমন পেটে বা ফুসফুসে পানি লাগতে বা রক্তে প্রোটিন কমে যেতে পারে। উল্লেখ্য যে, জ্বরের সঙ্গে রক্তক্ষরণ যেমন দ্বিতীয়বার মাসিক হওয়া মানেই কিন্তু হিমোরেজিক ফিভার নয়। হিমোরেজিক ফিভার হতে হলে লিকিংয়ের আলামত থাকতে হবে।
ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভারকে চারটা গ্রেডে ভাগ করা হয় :
গ্রেড-১ : টুনিকেট টেস্ট পজিটিভ হওয়া ছাড়া রক্তক্ষরণের আর কোনো আলামত থাকে না।
গ্রেড-২ : দৃশ্যত রক্তক্ষরণ থাকে।
তাই রক্তক্ষরণ দেখা না গেলেও জ্বরের সঙ্গে লিকিংয়ের উপসর্গ থাকলে সেটা ডেঙ্গু হিমোরেজিক ফিভার।
গ্রেড-৩ : ১ বা ২ এর সঙ্গে যদি ব্লাডপ্রেসার কমে, পালস বাড়ে।
গ্রেড-৪ : ১ বা ২ এর সঙ্গে যদি ব্লাডপ্রেসার, পালস রেকর্ড না করা যায়।
গ্রেড ৩ ও ৪-কে একসঙ্গে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম বলে। ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোম বিশেষ করে গ্রেড-৪ প্রতিরোধ করতে না পারলে পরিণতি খারাপ হয়।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষা : খুব টক্সিক না হলে কোনো জ্বরের রোগীরই তিনদিন আগে কোনো পরীক্ষা করা দরকার নেই।
টিসি ডিসি হিমগ্লোবিন ইএসআর এসজিপিটি: ভাইরাল ফিভারে কাউন্ট বাড়ে না। টাইফয়েড ম্যালেরিয়ায়ও তাই। যদি কাউন্ট কমে বিশেষ করে তিন হাজারের নিচে যায় সেটা নিশ্চিত ডেঙ্গু, সত্যি বলতে কি এটাই সহজলভ্য সস্তাতম টেস্ট। এসজিপিটি খুব বেশি হলে সেটা ভাইরাল হেপাটাইটিস। অন্য জ্বরে এটা বাড়ে তবে ১/২ গুণের বেশি না। ডেঙ্গু হেপাটট্রপিক ভাইরাস নয়।
এনএস ১ অ্যান্টিজেন : এটাই জ্বরের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গুর নিশ্চিত পরীক্ষা। জ্বর থাকাকালীন এটা পজিটিভ হয়। জ্বর চলে গেলে অর্থাৎ ছয়দিন পর এটা করা দরকার নেই।
ভাইরাস আইসোলেসন :জ্বর থাকা অবস্থায় এটাও কার্যকরী পরীক্ষা তবে রিসার্চ ল্যাব ছাড়া এটা করা হয় না।
অ্যান্টিবডি পরীক্ষা : সাত দিন পরে পজিটিভ হয় বলে এটা কার্যকরী নয়। এনএস-১ অ্যান্টিজেন করা গেলে এটার দরকারও নেই।
প্লাটিলেট কাউন্ট ও হিমাটক্রিট : প্লাটিলেট আতঙ্ক না থাকলে এটা অত্যাবশ্যকীয় নয়। হিমোরেজিক ফিভার ডায়াগনোসিস ও ফলোআপের জন্য করা লাগে।
হিমোরেজিক ফিভার হলে পেটে ও ফুসফুসে পানি নিশ্চিত করার জন্য পেটের আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও বুকের এক্স-রে করা লাগে।
চিকিৎসা বা প্রতিকার
প্যারাসিটামল : অন্য জ্বরের মতো প্যারাসিটামল দিয়ে জ্বর নামিয়ে রাখতে হবে। জ্বর নামিয়ে ১০০ রাখলেই চলবে। ৯৭ করার দরকার নেই। প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য ওষুধ ব্যবহার করা উচিত না। এনএসআইড-(ডাইক্লোফেনাক, ইন্ডোমেথাসিন) দ্রুত জ্বর নামিয়ে, ঘাম ঝরিয়ে শকে নিতে পারে, কিডনির ক্ষতি করতে পারে। খাদ্যনালিতে রক্তক্ষরণ ত্বরান্বিত করে জীবনের ঝুঁকি ডেকে আনতে পারে। সাপোজিটরি নিলে শুধু প্যারাসিটামল, অন্য কিছু নয়। চার ডোজে ভাগ করে প্রতিবারে পাঁচশ’ মিলিগ্রাম প্যারাসিটামল খাওয়া উচিত তার পরেও ১০২-এর বেশি থাকলে একবারে তৎক্ষণাৎ এক হাজার মিলিগ্রাম প্যারাসিটামল খাওয়া যাবে।
পানি : কয়েকদিন তিন লিটার পানি পান করতে হবে। এটা খুবই দরকার। প্রয়োজনে স্যালাইন নিতে পারলে ভালো।
আসলে প্যারাসিটামল ও পানিই ডেঙ্গুর আসল চিকিৎসা।
নিউট্রিশন : জ্বরের সময় ক্ষুধামন্দা হয়, বমি লাগে। ফলের রস উপকারী পানি এবং অল্পতে বেশি ক্যালরি পাওয়া সম্ভব। স্বাভাবিক খাবার খেতে হবে।
ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গু এবং গ্রেড-১ হিমোরেজিকে এর চেয়ে বেশি কিছু লাগে না এবং বাসায়ই চিকিৎসা করা উচিত। গ্রেড-২-তে বাড়তি সমস্যা হল প্রথমদিকেই ধরতে না পারলে চিকিৎসা না দিলে গ্রেড-৩ বা গ্রেড-৪ অর্থাৎ শকে চলে যেতে পারে। আসলে ডেঙ্গু চিকিৎসকের দায়িত্ব একটাই; তা হল শক ঠেকানো। চিকিৎসাও আহামরি কিছু নয়। পরিমিত পানি দিয়ে জ্বর নামিয়ে রাখতে হবে। ব্লাডপ্রেসার মনিটর করতে হবে যাতে পালস প্রেসার ২০-এর বেশি থাকে। সিস্টলিক প্রেসার ৯০-এর বেশি রাখতে হবে। এটা করতে হলে পানি দিতে হবে, স্যালাইন দিতে হবে। ব্লাড প্রেসার ও প্রস্রাবের পরিমাণ দেখে মনিটর করতে হবে। গ্রেড-২-তে যদি এমন দেখা যায় পেটের ব্যথা কমছে না, বমি হচ্ছে অথবা প্রেসার ঠিক থাকছে না তাহলে হাসপাতালে নিতে হবে। বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এটা বেশি হয়। ইন্ডোমেথাসিন, ডাইক্লোফেনাক সাপোজিটরি নিলেও এটা হয়। এসব ক্ষেত্রে কালো পায়খানা, রক্ত বমি হতে পারে। ব্লাড প্রেসার দ্রুত কমে যায়।
রোগী শকে গেলে হাসপাতালে যেতে হবে। মনিটর বেশি করে করতে হবে। আরেকটা জিনিস রোগী রিকভারির সময় পানি/স্যালাইনের পরিমাণ কম লাগে। এটা খেয়াল রাখা জরুরি।
প্লাটিলেট : আসলে ডেঙ্গুর চিকিৎসায় প্লাটিলেটের দরকার খুব কম। ভীতি/আতঙ্ক থেকে প্লাটিলেটের গুরুত্ব বেড়ে গেছে। প্লাটিলেট কমে কিন্তু কমার মেকানিজম ও প্লাটিলেট পরীক্ষার পদ্ধতিটা জটিল। পরীক্ষায় যে পরিমাণ ধরা পরে সেটা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রকৃত নয়।
প্লাটিলেট ১০০ হাজারের কম হলে রক্তক্ষরণের ভয় থাকে। অপারেশন করা যায় না। ডেঙ্গুর মৌসুমে অপারেশনের আগে প্লাটিলেট পরীক্ষা অত্যাবশ্যক। ২০ হাজারের কম হলে আপনা-আপনি রক্তক্ষরণ হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাত্ত্বিকভাবে বলা হয় দশ হাজারের কম হলে ব্রেন, কিডনি, হার্টের মধ্যে রক্তক্ষরণ হতে পারে তাই প্লাটিলেট দিতে হবে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে বাস্তবে কিন্তু তা নয়।
প্লাটিলেটের সমস্যা : প্লাটিলেট এক ইউনিট বানাতে পাঁচজনকে রক্ত দিতে হয়। খরচ পরে ২৬০০ টাকা। প্লাটিলেট এখন অবশ্য একজন থেকে ও বানানোর মেশিন আছে দেশে। জোগাড় হওয়ার পর তাড়াতাড়ি পুশ করতে হয়। ট্রান্সপোর্টের সময় ব্যাগ ঝাঁকাতে হবে। আরেকটা প্রাক্টিক্যাল সমস্যা হল যে প্লাটিলেট দিয়ে চিকিৎসা পাওয়া রোগীর পূর্ণ নিরাময় বিলম্বিত হয়।
রক্ত দেয়া : রক্তক্ষরণ হলে নিয়ম হল রক্তের বদলে রক্ত দিতে হয়। সিস্টলিক ব্লাড প্রেসার ১০০-এর নিচে নামলে, পালস ১০০-এর বেশি হলে। হিমোগ্লোবিন ১০-এর নিচে নামলে ও হিমাটক্রিট কমে গেলে রক্ত দিতে হবে। ডেঙ্গুর বেলায় সমস্যা হল হিমোকনসেন্ট্রেশন হয় বলে হিমাটক্রিট বাড়ে। হিমাটক্রিট না কমলে ফ্লুইড দিতে হবে, ব্লাড নয়। প্রেসার কমে গেলে প্লাজমা, প্লাটিলেট সমৃদ্ধ প্লাজমা, ডেক্সট্রান (হাইপার ওসমোলার ফ্লুইড, প্লাজমা এক্সপান্ডার) দিতে হবে।
অন্য ঔষধ : ভাইরাল ইনফেকশন প্রতিরোধের জন্য এন্টিবায়োটিক বা অন্য কোনো ওষুধ দরকার নেই। মশাবাহিত এ রোগ প্রতিরোধই আসল চিকিৎসা।
প্রতিরোধ : মশা মারতে স্প্রে করতে হবে ঘরের মধ্যে, টেবিলের নিচে, দরজার আড়ালে, পর্দার ভাঁজে, বেসিনের নিচে। সকালে দিনের কাজটা স্প্রে দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। কোনো চেম্বারে, কোচিং সেন্টারে বসে থাকতে ফুল হাতা কাপড়, মোজা পরে থাকুন, টেবিলের নিচে মোজা পরা পা রাখুন। ঘরে মশার ওষুধের মেশিন রাখুন। দিনের বেলায় মশারি দিয়ে ঘুমান।
লেখক : মেডিসিন ও ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞ, বারডেম

Leave a Reply

%d bloggers like this: