বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাহাড়ি জনপথ হচ্ছে গুলমার্গ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১২ জুলাই ২০১৭, বুধবার: ২৫ জুন সকালবেলায় আমরা বেরিয়ে পড়লাম গুলমার্গের উদ্দেশে। শ্রীনগর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরে ২৬৫০ মিটার উচ্চতায় বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পাহাড়ি জনপথ হচ্ছে গুলমার্গ। কাশ্মিরে শীতের সময়ে বরফের পুরো সৌন্দর্য্য এই গুলমার্গকে ঘিরেই।
আমরা যেহেতু গ্রীষ্মে যাচ্ছি, তাই বরফের সৌন্দর্য্য হয়ত পুরোপুরি দেখতে পারিনি। কিন্তু রাস্তার অপরুপ প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখে মনে হলো-এবার সত্যিই ভূস্বর্গে চলে এসেছি। পীর পাঞ্জাল পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উপত্যকার মাঝে আশ্চর্য সুন্দর পথ গিয়েছে গুলমার্গ। রাস্তার দুধারে কোথাও ধানক্ষেত, কোথাও পাইন আর দেবদারু গাছের সারি, কোথাও ফুলের মেলা। সঙ্গে বরফে মোড়া শ্বেতশুভ্র পাহাড়ের সাড়ি। ১৫৮১ সালে কাশ্মিরের সুলতান ইউসুফ শা চক সর্বপ্রথম পৌঁছান এই সবুজে মোড়া পাহাড়ের ঢালে। পাহাড়ের ঢালে ঢালে ফুলের বাহার দেখে তিনি এর নাম রাখেন গুলমার্গ-যার অর্থ ফুলের উপত্যকা। স্বয়ং সম্রাট জাহাঙ্গীর এখানে থেকে ফুলের গাছ নিয়ে বাগান করেছিলেন তার স্বপ্নের শহর লাহোরে।
আমরা অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম-রাস্তার পাশে এত সুন্দর পরিপাটিভাবে প্রাকৃতিক ভাবে ফুলের এমন রূপ থাকতে পারে? কাশ্মিরের সৌন্দর্য্য বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে গুলমার্গের রাস্তায় রাস্তায় ফুটে থাকা ফুল।
পরের দিন ঈদ হবে বলে আগাম আভাস পাচ্ছিলাম। পরিবার পরিজন ছাড়া দেশের বাইরে ঈদ কাটানো কোনোমতেই আনন্দদায়ক নয়। কিন্তু গুলমার্গের শীতল পরিবেশে ও ফুলের রাজ্যে এসে মনটা এক নিমিষেই ভালো হয়ে গেল। আর রাস্তাঘাটের সৌর্ন্দর্য্য তো বর্ণনাতীত। গুলমার্গে এসে হোটেলে উঠলাম। হোটেল রুমের জানালা খুললেই তীব্র ঠান্ডা বাতাস রুমে ঢুকল। এবার বোঝা গেলো গরম কাপড় কাজে লাগবে।
আমাদের হোটেলের সামনেই সাড়ে তিন কিলোমিটার লম্বা ১০০ বছরের পুরনো গল্ফ উদ্যান। শীতে গুলমার্গে বসে স্কি খেলার আসর। আমি কেবল দেখতে লাগলাম সবুজ মাঠ। শীতকালে পুরো মাঠটাই বরফে ঢাকা পড়ে। আমার কাছে মনে হয়েছে-চারপাশে পুরোটাই বরফে ঢাকা থাকলে এর বৈচিত্র্য কমে যায়। তার চেয়ে সবুজ প্রান্তরই ভালো।
যখন ১৪০০০ ফুট উঁচুতে
সহধর্মিনীকে বললাম, ‘হিমালয় পর্বতের উচ্চতা হচ্ছে ২৯০০০ ফুটের মতো। চলো আমরা এর অর্ধেক উচ্চতায় চলে যাই।’
সত্যিই আমরা গুলমার্গে এসে কেবল কার/রোপওয়ের সাহায্যে ১৪ হাজার ফুট উঁচু খিলেনমার্গে পৌঁছে গেলাম। বলে রাখতে চাই, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ বান্দরবানের তাজিনডংয়ের উচ্চতা ২২০০ ফুটের মতো। কেবল কারের ভ্রমণ অত্যন্ত রোমাঞ্চকর। এক কাশ্মিরি গাইডকে সাথে নিয়ে আমরা কেবল কারে উঠে পড়লাম। দড়ির রাস্তা দিয়ে কেবল কার উপরে উঠছে তো উঠছেই। মনে ভয় ধরে যায়, এই বুঝি দড়ি ছিঁড়ে যাবে! শ্বেতশুভ্র বরফ আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকছে। মনে হলো-স্বর্গ যদি থেকে থাকে, তাহলে সে এখানেই।
অবশেষে পৌঁছলাম ১৪০০০ ফুট উচ্চতার খিলেনমার্গে। তীব্র ঠান্ডায় কাঁপুনি ধরে গেল। ভারী জ্যাকেট আর চামড়ার বুট জুতা ভাড়া নিলাম দুজনের জন্য ২০০ টাকা করে। বরফের উপর দিয়ে চলাচলের জন্য হাতে টানা স্লেজ গাড়িতে উঠার জন্য কাশ্মিরি লোকজন তোড়জোর শুরু করলো। বুঝলাম-এটা তাদের জন্য রুটি রুজির প্রশ্ন।
কাশ্মিরের একটা জিনিসের প্রতি আমি খুব বিরক্ত। সেটা হলো-স্থানীয় লোকজন ট্যুরিস্টদেরককে পাগল করে ফেলে এটা সেটা কেনার জন্য, ঘোড়ার পিঠে উঠার জন্য। আপনি হয়তো আপন মনে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য দেখবেন, দেখবেন ফেরিওয়ালা, ঘোড়াওয়ালা এসে হাজির। এরকম উৎপাত সব জায়গাতেই আছে, তবে কাশ্মিরে সেটা অনেক বেশি।
আমরা স্লেজ গাড়িতে উঠিনি। নিজেরাই বিচরণ করতে লাগলাম বরফের রাজ্যে। খিলেনমার্গ জুড়ে চারদিকে সাদা বরফ। মনে হয় যেন বরফের দেশ। মেঘমুক্ত দিনে দেখা যায় সারি সারি তুষারশৃঙ্গ। চারিদিকে এক ধ্যানগম্ভীর মৌনতা। এ নিসর্গ প্রকৃতির কোনো তুলনা নেই। চা পান করার জন্য হকারদের হাঁকডাকের অন্ত নাই। তবে আমরা চা পান করলাম। প্রবল ঠান্ডা আবহাওয়ায় অবশ্য চা পান করার কারণে শরীর মুহূর্তের মধ্যে চাঙ্গা হয়ে উঠল।
আমরা এবার কেবল কারে চড়ে নিচে নেমে পড়তে চাইলাম। গাইডকে সাথে নিয়ে আবার রোমাঞ্চকর কেবল কারে চড়লাম। কেবল কার থেকে আমরা নেমে পড়ার ৫ মিনিটের মাথায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা হয় কেবল কারে। যে ভয় করছিলাম দড়ি ছিড়ে যাবে কিনাÑসেটাই সত্যি হলো। আমরা নিচে নেমেই টের পেলাম-তীব্র বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে পাহাড়ি ঝড়ো বাতাস আর বড় বড় শিলাখন্ড। আমরা গিয়ে আশ্রয় নিলাম হোটেল হিল টপের নিচে। এই হোটেলেই নাকি শ্যুটিং হয়েছিলো আমির খান-মনিষা কৈরালা অভিনীত মন মুভিটি। কেবল কারের দুর্ঘটনা ছিলো হৃদয়বিদারক। বাতাসের তোড়ে কেবল কারের দড়ি ছিঁড়ে যায়। ৪ জন ট্যুরিস্ট আর ৩ জন কাশ্মীরি গাইড সাথে সাথেই মারা যায়। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। আমরাও তো এ দুর্ঘটনার শিকার হতে পারতাম। কেবল কারে এরকম দুর্ঘটনা হওয়া অচিন্ত্যনীয় ব্যাপার। কেবল কারে চড়া একদম বন্ধ হয়ে আছে এখন। আমরা আমাদের হোটেলে চলে এলাম। আর কোথাও বের হইনি সেদিন।
ঈদের দিন সকাল
বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে আটটায় কাশ্মিরে সূর্য ডুবল। ততক্ষণে খবর পেয়ে গেলাম বাংলাদেশেও ঈদের চাঁদ দেখা গেছে। আমরা গুলমার্গে বসেও সাড়ে আটটায় ঈদের চাঁদ দেখলাম। হোটেল থেকে বাইরে চলে এলাম আমরা হাঁটাহাঁটি করতে। গুলমার্গের স্থানীয় বাসিন্দা অধিকাংশই গরিব। মলিন পোশাক পড়ে লোকজন বাইরে বেরিয়েছে। পর্যটকদের কাছ থেকে টাকা পেয়েই তারা চলে। রাজনৈতিক গোলযোগ থাকায় ট্যুরিস্ট এবার কম এসেছে। তাই, তাদের ঈদ ভালো কাটবে বলে মনে হচ্ছে না।
২৬ জুন ঈদের দিন সকালে একেবারে বাঙালি পোশাকে পড়ে হোটেল থেকে নিচে নামলাম। স্ত্রীর পরনে ছিলো শাড়ি আর আমার পরনে পাঞ্জাবি। পাশের মসজিদেই ঈদের জামাত। রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাশ্মিরি লোকজনের ঈদ উৎসব দেখতে লাগলাম। বাইক দিয়ে ছোটখাটো মিছিল যাচ্ছে আমাদের পাশ দিয়ে। হঠাৎ আওয়াজ শুনলাম-‘পাকিস্তান, জিন্দাবাদ’
আমি তো তাজ্জব! ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে ভারতের নাগরিকদের মুখে এই আওয়াজ? আগেই জানতাম কাশ্মিরের বহু লোক পাকিস্তানকে পছন্দ করে। এবার সাক্ষাৎ প্রমাণ পেয়ে গেলাম।
হোটেলে এসে জিজ্ঞেস করলাম হোটেল ম্যানেজারকে, ‘ব্যাপারটা কি বলুন তো’।
ম্যানেজারের চোখমুখ দেখে বুঝলাম-আমরা যে এই মিছিল শুনেছি, সে তাতে বরং মজা পেয়েছে। সে উত্তর দিলো, ‘পাকিস্তান মুসলিম কান্ট্রি হ্যায়, হাম ভি মুসলিম হ্যায়, ইয়ে মুসলমানি জজবা হ্যায়।’ আমি চুপ করে রুমে চলে গেলাম।

Leave a Reply

%d bloggers like this: