বির্জা খালের ব্রীজ ভাঙ্গার নির্দেশ ৬ মাসেও মানলো না এহসান প্রপার্টিজ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৭ জুলাই ২০১৭, বৃহস্পতিবার: শর্ত লঙ্ঘন করে নগরীর বাকলিয়ার কালামিয় বাজারের পূর্বে বির্জা খাল ভরাট করে অবৈধভাবে নির্মাণ করা ব্রিজটি জনসাধারণের দাবির মুখে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, চসিক। কিন্তু দীর্ঘ ৬ মাস ১২ দিন পেরিয়ে গেলেও অদৃশ্য ও রহস্যজনক কারণে তা ভাঙছে না কেউই। উল্টো এই ব্রিজটি যাতে ভাঙতে না হয় সে জন্য নানা জায়গায় জোর তদবির চলছে। ফলে সিটি কর্পোরেশন শুধু অনুমতি বাতিলের আদেশ দান এবং লোক দেখানো একটু ভাঙ্গার কার্যক্রমের ফটোসেশন করেই চুপ করে আছে। ২০১৩ সাল থেকে অবিরতভাবে স্থানীয় অধিবাসীরা ‘নাগরিক অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন (নাপসা) নামিয় সংগঠনের ব্যানারে ‘চট্টগ্রামে খালের জায়গা দখল করে ভূমিদস্যু এহসান প্রপার্টিজ কর্তৃক অবৈধভাবে সেতু নির্মাণের প্রতিবাদে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে স্বারকলীপি প্রদানসহ জোরালো আন্দালন গড়ে তোলাই প্রশাসনের টনক নড়ে। নাপসা’র দীর্ঘ আন্দোলনের ফলোশ্রুতিতে গত ১৪ ডিসেম্বর ওই ব্রিজ নির্মাণের অনুমতি বাতিল করে ব্রিজটি ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয় সিটি কর্পোরেশন। প্রসঙ্গত, গত ১২ জানুয়ারি চসিকের দুই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ব্রিজটি সরেজমিন পরিদর্শন করে বিষয়টি সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে অবহিত করলে তিনি সেটি ভাঙার জন্য আবারো নির্দেশ দেন। তৎকালীন সময়ে সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেছিলেন, “খাল ভরাট করে কাউকে ব্রিজ নির্মাণ করতে দেয়া হবে না। বির্জা খালের ওপর যে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়েছে তা ভাঙার নির্দেশ দেয়ার কথা উল্লেখ করে তিনি মেয়র বলেছিলেন, ব্রিজটি ভাঙতে যদি এক সপ্তাহ সময়ও লাগে তবুও ভাঙা হবে। কাউকে শহরের পানিপ্রবাহ বন্ধ করতে দেয়া হবে না। মেয়রের নির্দেশ পেয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ব্রিজটি গত ১৬ জানুয়ারি ভাঙতে শুরু করলেও অদৃশ্য কারণে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যায় ব্রিজ ভাঙার কাজ। গত ৬ মাস পেরিয়ে গেলেও ব্রিজের ভাঙার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে আছে। এতে জলাবদ্ধ বাকলিয়ার স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন উঠেছে পানি নিষ্কাশনে বাধা সৃষ্টিকারী এ ব্রিজটি অপসারণের বিষয়টি কোনো অদৃশ্য ইশারায় বন্ধ হয়ে গেল? ব্রীজ নির্মাণের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী সংগঠন ‘নাগরিক অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন (নাপসা)’র প্রধান নির্বাহী আলমগীর নূর বলেন, এই ব্রিজ উচ্ছেদ না হওয়াই গত কয়েকদিনে বর্ষার বৃষ্টি আর জোয়ারে পুরোপুরি পানিতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে পুরো বাকলিয়া। আশপাশে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।। ইতোমধ্যে খালের মাঝখানে ও দুই পাশে বিশালাকৃতির কংক্রিট গার্ডার ওয়াল নির্মাণ করায় খালের নাব্যতা কমে গিয়ে ভরাট হয়ে বিলীন হতে চলেছে নগরীর একমাত্র ঐতিহ্যবাহী নৌকা চলাচলকারী জীবিত খালটি। ফলে পুরো খালের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ইতোমধ্যে বাধাগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। একই কারণে এই খাল দিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, স্থানীয় ও বহিরাগত ভূমিদস্যুরা এহসান প্রপার্টিজের মালিক আবু আলমের আর্থিক পৃষ্টপোষকতায় খালের পাড়ে পাড়ে পাকা পিলার দ্বারা দোকান-ঘর নির্মাণ করে পুরো খালটি গ্রাস করে নিচ্ছে। মোটা অংকের টাকার লেনদেনের কারণে সংশ্লিষ্ট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের রহস্যজনক নিরবতায় চোখের সামনে বিলীন হতে চলেছে চট্টগ্রাম নগরবাসীর বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশনকারী অন্যতম প্রধান বাকলিয়াস্থ বির্জা খালটি।
প্রসঙ্গতঃ গত ৩ জুলাই নগর ভবনে আয়োজিত এক সংবাদ সন্মেলনে চসিক মেয়র জনাব আ.জ.ম. নাছির উদ্দিন বলেছেন-“ জলাবদ্ধতা নিরসন করা চসিকের কাজ নয়” সূত্রঃ দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-প্রথম পাতা। চসিক মেয়রের এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ব্রীজ উচ্ছেদের দাবীতে আন্দোলনকারী সংগঠন ‘নাগরিক অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন (নাপসা)’র প্রধান নির্বাহী আলমগীর নূর চসিক মেয়রের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন তোলেন “ তাহলে কি প্রকৃতিগতভাবে সৃষ্ট পানিপ্রবাহী খালগুলো ভূমিদস্যুদেরকে বন্ধক দিয়ে প্রাকৃতিক জোয়ার ভাটার গতিরোধ করে নগরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করাই কি চসিক’র কাজ ? আমরা অবিলম্বে ব্রিজটি ভেঙে ফেলার জন্য চসিক মেয়রের তড়িৎ ও কার্যকর হস্থক্ষেপ কামনা করছি। অন্যতায়, প্রাকৃতিক অবকাঠামো নষ্ট করে পরিবেশ বিপর্যয়কারী ব্রীজ নির্মানে জড়িত সকলের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণসহ এলাকাবাসীকে সাথে নিয়ে বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবো। সবকিছু মিলিয়ে স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ ও প্রশ্ন- ‘এহসান প্রপার্টিজ’ এর খুঁটির জোর কোথায়? কেনইবা ব্রীজ ভাঙগার কার্যক্রম হতে চসিক মেয়র পিছু হটলো? কালো টাকার দাপট না অন্যকিছু?
উল্লেখ্য, সাবেক মেয়র এম মনজুর আলমের সময়ে কোনো অনুমোদন ছাড়াই এখানে ব্রিজ নির্মাণকাজ শুরু করে এহসান প্রপার্টিজ নামে একটি ভূমিদস্যু আবাসন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। এ নিয়ে নাগরিক অধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা আন্দোলন(নাপসা) ও স্থানীয় জনগণের তীব্র আপত্তির মুখে ওই প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে চসিকের কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদন করা হয়। ১৮ নং ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলর অনুমোদনের জন্য জোর তদবির করেন। তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চসিকের একজন নির্বাহী প্রকৌশলী ব্রিজ নির্মাণের স্থানটি পরিদর্শনে যান। পরিদর্শন শেষে তিনি সেখানে ব্রিজ নির্মাণের বিপক্ষে মতামত দেন। তার ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও তৎকালীন প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আহমদুল হক অপরিকল্পিত এই ব্রিজ নির্মাণের অনুমোদন দেন। এই ব্রিজের কারণে এই খাল দিয়ে নৌকা চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ব্রিজের দুপাশে পাইলিং করে আরসিসি পিলার নির্মাণ করার কারণে খালের পানি প্রবাহও বাধাগ্রস্থ হয়ে গত কয়েকদিনের বৃষ্টি ও জোয়ারে কোথাও কোমর ও কোথাও গলা অবধি পানিতে তলিয়ে গেছে পুরো বাকলিয়াসহ আশপাশের এলাকা । এই ব্রিজের কারণে পুরো বাকলিয়া কোমর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসী প্রতিবাদ করেন। খালের অপর প্রান্তে ভূমিদস্যুদের নিজেদের জায়গার দাম বাড়াতে কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করেই অত্র ওয়ার্ডের সাবেক ও বর্তমান ওয়ার্ড কাউন্সিলরের সহায়তায় খাল ও খালের আশপাশের জায়গা দখল করে পানি নিষ্কাশন বন্ধ করে দিয়ে অবৈধভাবে এ ব্রিজটি নির্মাণ প্রক্রিয়া শুরু হয়।

Leave a Reply

%d bloggers like this: