বিব্রতকর সমস্যা মুখের দুর্গন্ধ

অধ্যাপক ডা. অরূপ রতন চৌধুরী: দুর্গন্ধ বা দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস একটি বিরক্তিকর স্বাস্থ্য সমস্যা। প্রায়শই আক্রান্ত ব্যক্তি তার এমন অবস্থা সম্পর্কে খুব একটা অবগত থাকেন না। তবে সমস্যাটি আশেপাশে অবস্থানকারীদের। কেননা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার সময় যখন দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস বেরিয়ে আসে তখন গোটা পরিবেশকে অন্যদিক ঘুরিয়ে দিতে বাধ্য। শুধু পার্শ্বব্যক্তিই যে এর নেতিবাচক প্রভাবে বিরক্ত হন তা কিন্তু নয়। সংশ্লিষ্ট ভুক্তভোগী ব্যক্তিও নানা স্বাস্থ্য সমস্যার সম্মুখীন হন দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস ও এর আনুষঙ্গিক কারণে। তাই কেউ কেউ হরেক ব্র্যান্ডের মাউথওয়াশ/সেপ্র ইত্যাদি ব্যবহার করে বিরক্তিকর অবস্থা থেকে পরিত্রাণের উপায় খোঁজেন। তাতে ফলাফল কতদূর পাওয়া যায়-তা বলতে পারবেন সংশ্লিষ্টরা। কিন’ বিজ্ঞানীরা বসে নেই, একের পর এক চালিয়ে যাচ্ছেন নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। তেমনি সমপ্রতি পরিচালিত সমীক্ষা শেষে একদল মার্কিন বিজ্ঞানী একটি নতুন তথ্য উপস্থাপন করেছেন। তাদের ভাষায় দুর্গন্ধযুক্ত শ্বাস দূরীকরণে এবং সুগন্ধি শ্বাসের জন্য মিন্ট বা পারফিউমের চেয়ে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম ম্যাগনোলিয়া ফুল গাছের বাকল বা ছাল। এখন থেকে এই গাছের চারা লাগাতে পারেন আপনারাও। মুখের দুর্গন্ধ বা Bad Breath নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ গবেষকরা নানা ধরনের তথ্য সরবরাহ করছেন। এ নিয়ে আছে নানা মতবাদ। মুখের দুর্গন্ধ মুখের বিভিন্ন 1সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা, এই সমস্যাগুলোর জন্য মুখের অস্বাস্থ্যকর অবস্থা ও মাড়ির রোগকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে, এটা প্রধানত মুখের খাদ্যকণা থেকে বিপাকীয় পদ্ধতির ফলে নির্গত জীবাণুসমূহ থেকে অ্যামাইনো অ্যাসিডের কারণে হয়ে থাকে। এদের মধ্যে প্রধানত মুখের গন্ধের জন্য দায়ী হচ্ছে ভেলোটাইল সালোফার কম্পাউন্ডস (VSCs) যেমন হাইড্রোজেন সালফাইড (H2S), মিথাইল মারকেপটেন (CH3SH) এবং ডিনিথাইল সালফাইড (CH3SCH3)। তবে এই ধরনের গবেষণায় তিন রকমের রোগীদের মুখের দুর্গন্ধ শনাক্ত করা হয়েছে যেমন (১) সত্যিকারের মুখের দুর্গন্ধযুক্ত রোগী। (২) কৃত্রিম/মেকি মুখের দুর্গন্ধযুক্ত রোগী ও (৩) মুখের দুর্গন্ধ সম্পর্কে আতঙ্কিত/ভীত রোগী। সত্যিকারের মুখের দুর্গন্ধযুক্ত রোগীদের মুখ থেকে গবেষকরা ঠঝঈ-এর মাত্রাসমূহ পরিমাপ করার পর যারা সত্যিকারের মুখের দুর্গন্ধযুক্ত রোগী ছিলেন তাদের এ চিকিৎসাগুলো প্রদান করেন
(১) মাড়ির প্রদাহসমূহের চিকিৎসা (২) মুখের ও দাঁতের অন্যান্য চিকিৎসা (৩) মুখের যতেœর হাতে-কলমে শিক্ষা (৪) মুখের স্বাস্থ্য সম্পর্কে পরামর্শ দান। সাধারণত: কৃত্রিম মুখের দুর্গন্ধ ও আতঙ্কিত রোগীদের মুখের দুর্গন্ধ এই দুই শ্রেণীর রোগীকে স্বাস’্যশিক্ষা সম্পর্কে জ্ঞান দান ছাড়াও বিভিন্ন পরামর্শ ও উপদেশ দেয়া হয়ে থাকে। যে সমস্ত রোগীদের ভ্রান্ত ধারণা আছে যে তাদের মুখে দুর্গন্ধ আছে এটা তারাই বুঝতে পারে এবং অন্য কোনো স্বাস্থ্য শিক্ষা বা পরামর্শ বা আশ্বস্ততা তাদের এই বিশ্বাস থেকে সরাতে পারে না বা কার্যকর হয় না তাদের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেয়ার জন্য পাঠানো হয়। এটা সত্য যে, মুখের দুর্গন্ধ এমনই একটি লক্ষণ যেটা মানসিক উদ্বেগেরও কারণ ঘটায়। মুখের এই দুর্গন্ধ কেন হয়, তা নিয়ে বিজ্ঞানের গবেষণা বহুকাল যাবৎ চলে আসছে। সেসব গবেষণা থেকে সুনির্দিষ্টভাবে কয়েকটি কারণকে চিহ্নিত করা গেছে, সেগুলোর মধ্যে-১. প্রতিবার খাবার গ্রহণে মুখের ভেতরে খাদ্য আবরণ দাঁতের ফাঁকে, মাড়ির ভেতর জমে থেকে ডেন্টাল প্লাক সৃষ্টি এবং তা থেকে মাড়ির প্রদাহ (পেরিওডেন্টাল ডিজিজ) ২. মুখের যে কোনো ধরনের ঘা বা ক্ষত ৩. আঁকাবাঁকা দাঁত থাকার কারণে খাদ্যকণা ও জীবাণুর অবস্থান ৪. দেহে সাধারণ রোগের কারণে মুখের ভেতরে ছত্রাক ও ফাঙ্গাস জাতীয় ঘা (ক্যানডিয়াসিস) ৫. মুখের ক্যান্সার ৬. ডেন্টাল সিস্ট বা টিউমার ৭. দুর্ঘটনার কারণে ফ্র্যাকচার ও ক্ষত ৮. অপরিষ্কার জিহবা
তাছাড়া দেহের অন্যান্য রোগের কারণেও মুখের দুর্গন্ধ হতে পারে-যেমন-
১. পেপটিক আলসার বা পরিপাকতন্ত্রের রোগ ২. লিভারের রোগ ৩. গর্ভাবস্তা ৪. কিডনি রোগ ৫. রিউমেটিক বা বাতজনিত রোগ ৬. ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র ৭. হাইপারটেনশন বা উচ্চরক্তচাপ ৮. গলা বা পাকস্থলীর ক্যান্সার ৯. এইডস রোগ ১০. হৃদরোগ ১১. মানসিক রোগ ১২. নাক, কান, গলার রোগ। প্রাথমিক পর্যায়ে মুখের স্থানীয় রোগগুলোকে চিকিৎসা করানো প্রয়োজন। মুখের স্থানীয়ভাবে কারণগুলো দূর করার পরও যদি দুর্গন্ধ থেকে যায় তবে দেহের অন্যান্য সাধারণ রোগের উপস্থিতির পরীক্ষাগুলো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা করিয়ে নেয়া ভালো। তবে মুখে দুর্গন্ধ হলে ঘরে বসে আপনি যা করবেন-
১. একটি পরিষ্কার উন্নতমানের দাঁতের ব্রাশ ও পেস্ট দিয়ে দাঁতের সবগুলো অংশ ভেতরে-বাইরে পরিষ্কার করুন (তিন বেলা খাবারের পর)।
২. জিহ্বা পরিষ্কারের জন্য জিবছুলা ব্যবহার করুন। বাজারে স্টেনলেস স্টিল অথবা প্ল্লাস্টিকের জিবছুলা পাওয়া যায়।
৩. যে কোনো ধরনের মাউথওয়াশ (ক্লোরহেক্সিডিন জাতীয়) ২ চামচ মুখের ভেতরে ৩০ সেকেন্ড রেখে ফেলে দিয়ে আবার অল্প গরম লবণ পানিতে কুলিকুচি করুন প্রতিদিন অন-ত দুই বার সকালে ও রাতে আহারের পর।
৪. সব সময় মুখের ভেতরে একটি লং বা এলাচির দানা রাখুন।
৫. মূল খাবারের আগে বা পরে প্রতিবার আহারের পর (যা কিছু খাবেন যেমন বিস্কুট, ফলমূল ব্লাক জাতীয় খাবার) সম্ভব হলে দাঁত ব্রাশ করুন অথবা ভালোভাবে কুলিকুচি করে ফেলুন।
৬. ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য জর্দা, পান ইত্যাদি ত্যাগ করুন, তাতে শুধু যে মুখের দুর্গন্ধ দূর হবে তা নয় মুখের ক্যান্সারও প্রতিরোধ হবে।
বিশেষভাবে যা করবেন
দাঁত ব্রাশ করলেই শুধু ময়লা বা খাদ্যকণা পরিষ্কার হয় না, কারণ দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে বা মাড়ির ভেতরে ভেতরে অনেক সময় খাদ্যকণা জমা থেকে পচন শুরু হয়। তাই যাদের দাঁতের ফাঁকে ফাঁকে খাদ্য জমা হয় বুঝতে হবে তাদের ডেন্টাল ফ্লস (এক ধরনের পিচ্ছিল সুতা) বা ডেন্টাল টুথ পিকস (এক ধরনের জীবাণুমুক্ত শলাকা)-এর সাহায্যে খাদ্যকণাগুলো বের করা প্রয়োজন। এই ডেন্টাল ফ্লস বা সুতা এবং জীবাণুমুক্ত শলাকা ব্যবহারবিধি একজন ডেন্টাল সার্জনের কাছ থেকে জেনে নেয়া ভালো। অনেক সময় এ ফাঁকগুলো ডেন্টাল ক্যারিজ বা মাড়ির রোগের কারণেও হতে পারে, তাই কোনো সিদ্ধানে-র আগে ডেন্টাল এক্স-রে করে নেয়ার পর নিশ্চিত হয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা নিতে হতে পারে।
সবশেষে বলতে চাই দুই বেলা খাবারের পর দাঁত ব্রাশ, বছরে দুবার দাঁত ও মুখ পরীক্ষা এবং নাক, কান, গলাসহ পেটের স্বাভাবিক অবস্থা থাকলে মুখের দুর্গন্ধ আপনার কাছেও আসবে না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*