বিপজ্জনক বিদেশি ওষুধ আসছে চোরাই পথে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক : দেশীয় ভেজাল ও নকল ওষুধ নিয়ে উদ্বেগের কমতি নেই চিকিৎসক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের মধ্যে। অস্থিরতা আছে দেশের ওষুধশিল্পেও। তবে এর পাশাপাশি বড় ধরনের উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বিদেশি চোরাই, নকল, ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধ এবং চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে। ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিDrugক বিমানবন্দর দিয়ে অনেকটা বেপরোয়া সোনা চোরাচালানের মতোই চলছে মানুষের জীবন রক্ষাকারী অবৈধ বা ভেজাল ও নকল ওষুধ চোরাচালান। দেশে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় ওষুধের চাহিদাও আগের তুলনায় বেড়েছে বহুগুণ। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে চোরাকারবারিচক্র এখন ঝুঁকছে ওষুধ চোরাচালানের দিকে। এ ক্ষেত্রে ওই চক্র ব্যবহার করছে ভুয়া ডিক্লারেশন, কাগজপত্র ও ভুয়া কম্পানির নাম। ওষুধ চোরাচালান ঠেকাতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। আর ওষুধের চোরাচালান ধরার ফলে চোরাকারবারিচক্রের রোষানলে পড়ছেন কাস্টমস কর্মকর্তারা। ইতিমধ্যেই এক কর্মকর্তার বাসায় পাঠানো হয়েছে কাফনের কাপড়। প্রকাশ্যেই দেওয়া হচ্ছে হুমকি-ধমকি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওষুধ প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আ ব ম ফারুক বলেন, দেশীয় ওষুধশিল্প আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। আবার দেশে রোগব্যাধিও বাড়ছে। এতে ওষুধের চাহিদাও বেড়ে গেছে। এক শ্রেণির চিকিৎসক ও চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠান রোগীদের বিদেশি ওষুধের নামে বেশি টাকা আদায়ের অনৈতিক ব্যবসার ফাঁদে ফেলছে। কিন্তু ওই বিদেশি ওষুধ আসল না নকল কিংবা বৈধ কি না, তা রোগী বা তাদের স্বজনরা খতিয়ে দেখে না বা দেখার সুযোগও থাকে না। জানতে চাইলে কাস্টমসের হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কমিশনার লুৎফর রহমান বলেন, ‘গত ২০-২৫ দিনে এ বিমানবন্দরে কাস্টমস ও শুল্ক গোয়েন্দাদল মিলে প্রায় ২৯ কোটি টাকার বেশি অবৈধ ওষুধ ও বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসা সামগ্রী আটক করেছে। কৌশলে এসব চোরাই ওষুধ আনা হচ্ছে। আর এ কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে বিভিন্ন ফরেন পোস্ট অফিস ও কুরিয়ার সার্ভিস। আবার লাগেজেও আসছে মাঝেমধ্যেই। এসব ওষুধের বেশির ভাগই আমদানি নিষিদ্ধ, ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের।’ ওই কর্মকর্তা জানান, আটককৃত ওষুধের মধ্যে বেশির ভাগই হচ্ছে মূল্যবান ক্যান্সার, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ও যৌন উত্তেজক ওষুধ। বিমানবন্দর সূত্র জানায়, ওষুধ চোরাচালানের পেছনে রয়েছে শক্তিশালী চক্র, যারা বছরের পর বছর ধরে এ অপকর্ম চালিয়ে আসছে। চলতি মাসের মাঝামাঝি সময়ে রাজধানীর ধানমণ্ডির ঠিকানা ব্যবহার করে একটি ভুয়া কম্পানির নামে আনা হয় সাড়ে ৯ কোটি টাকার ওষুধ; একটি গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় যা আটক করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মো. শহীদুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি দল। এ সময় প্রথমে ওই কর্মকর্তাকে ওষুধ আটক না করার অনুরোধ করে ওই ওষুধ আমদানির সঙ্গে জড়িতরা। পরে বিমানবন্দর কাস্টম হাউস চত্বরেই তাঁকে হত্যার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয়। একপর্যায়ে ওই কর্মকর্তার বাসায়ও পাঠানো হয় কাফনের কাপড়। এসব ওষুধের বেশির ভাগই আসে তুরস্ক হয়ে। ঘটনার শিকার মো. শহীদুজ্জামান জানান, ১৮ মে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি দেওয়াসহ হামলার ঘটনায় সিসি টিভির ফুটেজসহ বিমানবন্দর থানায় একটি মামলা করা হয়েছে। কাস্টমসের একজন কর্মকর্তা বাদী হয়ে ওই মামলা করেন। মামলার এজাহারে আসাদ ও লেনিন নামের দুজনের নাম উল্লেখসহ আরো কয়েকজনকে আসামি করা হয়। শহীদুজ্জামান বলেন, ‘মামলার পরদিন ১৯ মে আমার বাসায় একটি প্যাকেটে কে বা কারা কাফনের কাপড় পাঠায়। বাসার নিচে কেয়ারটেকারের কাছে হাতে হাতে দিয়ে যাওয়া ওই খামের ওপর আমার নাম এবং এক পাশে কিছু আপত্তিকর কথা লেখা ছিল। আমার সন্দেহ একই চক্র এ কাজ করেছে।’ কমিশনার লুৎফর রহমান বলেন, ‘চোরাকারবারের মতো অপরাধ রুখতে গেলে হুমকি-ধমকি থাকবেই। তবু আমাদের ভয় পেলে চলবে না। জাতির স্বার্থেই আমাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করতে হবে। কারণ অন্য সব চোরাকারবারের চেয়েও মানুষের জীবন রক্ষাকারী ওষুধ চোরাকারবার আরো অনেক বেশি ক্ষতিকর ও বিপজ্জনক।’ কাস্টমস ও শুল্ক বিভাগ সূত্র জানায়, ওষুধগুলো অবৈধভাবে আমদানির ক্ষেত্রে বেশির ভাগেরই কোনো ধরনের ব্যাংক এলসি করা হয় না। ফলে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাঠানো নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিমানবন্দরে বিদেশ থেকে আসা পণ্য আমদানিসংক্রান্ত ২০টি ডকুমেন্ট যাচাই করে দেখা যায় ১৪টিই ভুয়া। এ ছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে গার্মেন্টস অ্যাকসেসরিজের ডকুমেন্ট দেওয়া হলেও কার্টনের ভেতরে থাকে ওষুধ। আবার ওই ওষুধসামগ্রীতেও আরো বিপজ্জনক কারসাজির নমুনা পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে। মূল্যবান বিদেশি ইনসুলিনের খালি ভায়াল, লেবেল ও সিল আলাদা করে আমদানি করে কেউ কেউ। দেশে এনে এসব ভায়ালে ভেজাল ও নিম্নমানের উপাদান ফিলিং করে বাজারে ছাড়া হয় বিদেশি ইনসুলিনের নামে। এ ছাড়া দেশের বড় বড় ওষুধ কম্পানির বেশি প্রচলিত ওষুধ বিদেশে নকলভাবে তৈরির পর নিয়ে আসা হয় দেশে। পাশাপাশি ফুড সাপ্লিমেন্ট ও কসমেটিকের নামে আনা হচ্ছে ভিটামিন ও ওষুধ। পরে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয় দেশের ওষুধ বাজারে। তবে ক্যান্সারসহ আরো কিছু রোগের জীবন রক্ষাকারী দামি ওষুধগুলো সাধারণত বড় বড় হাসপাতাল বা ফার্মেসিতেই মেলে। এসব ওষুধ বিক্রির মাধ্যমে রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা হয় চড়া মূল্য। কাস্টম হাউসের সহকারী কমিশনার মো. শহীদুজ্জামান বলেন, ‘অনেক সময় দেখা যায়, বৈধ কাগজপত্র নিয়েও অনেক জীবন রক্ষাকারী ওষুধ আমদানি করা হয়; কিন্তু ওই ওষুধ যে তাপমাত্রায় বহন করার কথা, সেই তাপমাত্রায় আনা হয় না। বরং সাধারণভাবে আনার ফলে ওই ওষুধ নষ্ট হয়ে যায়, আর সেই ওষুধই বিক্রি করা হয় রোগীদের ব্যবহারের জন্য, যা খুবই ভয়ানক ব্যাপার।’ ওষুধ বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষাগত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ওই কর্মকর্তা উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘সম্প্রতি এমন কিছু ওষুধ পাওয়া গেছে, যেগুলো ১৭-১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়; কিন্তু আমরা পেয়েছি ৫০ ডিগ্রিরও বেশি তাপমাত্রায়।’ বিমানবন্দরের সূত্রগুলো জানায়, অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া কম্পানি, ভুয়া ঠিকানা ও ভুয়া ডকুমেন্ট ব্যবহার করা হলেও এসব আমদানি করা ওষুধ ও মেডিক্যাল ডিভাইস বিমানবন্দর থেকে ছাড় করানোর জন্য তালিকাভুক্ত ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং (সিঅ্যান্ডএফ) এজেন্ট নিয়োগ করা হয়। জানতে চাইলে ওষুধশিল্প সমিতির মহাসচিব এস এম শফিউজ্জামান জানান, ওষুধ চোরাকারবারি এবং রেজিস্ট্রেশনবিহীন ওষুধ আমদানিকারকদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা উচিত। তিনি বলেন, দেশে রেজিস্ট্রেশনবিহীন ওষুধ আমদানি সম্পূর্ণ বেআইনি। এসব ওষুধ যাতে বাজারে বিক্রি না হতে পারে তার জন্য ওষুধ প্রশাসনের অভিযান জোরদার করা উচিত। পাশাপাশি আটককৃত ওষুধ যাতে কালোবাজারিদের হাতে যেতে না পারে তা নিশ্চিত করা উচিত এবং এসব ওষুধ তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করা উচিত। এ ছাড়া বিদেশি চোরাই ওষুধের মাধ্যমে দেশের ওষুধশিল্পের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আনিসুর রহমান বলেন, বন্দরগুলোতে যেহেতু কাস্টমসসহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষের ব্যাপক নজরদারি থাকে, তাই সাধারণত এ ক্ষেত্রে আমাদের অংশগ্রহণ কম। এ ছাড়া বিধিগত কোনো সীমাবদ্ধতা আছে কি না তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে। সৌজন্যে: কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*