বিনিয়োগকারীর আত্মহত্যার মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে শেয়ারবাজারে লোকসানে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৬ মে: ২০০৮ সালে ৪ লাখ টাকা নিয়ে শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেন শ্যাওড়াপাড়ার নাসির উদ্দিন। দুই বছরের মধ্যে পুঁজি হয় ৭ লাখ টাকা। লাভের আশায় আরো কিছু বিনিয়োগ বাড়িয়ে শেয়ার কিনতে থাকেন তিনি। ২০১০ সালে ৬ ডিসেম্বর শেয়ার বাজারে হঠাৎ বড় ধরণের পতন হয়। আর সেই পতনেই তার পুঁজি খোয়া যায়।share-hotta
৬ বছর হলো এখনও সেই পতনের বোঝা তিনি বয়ে চলছেন। কারণ তার কাছে আর কোন পুঁজি নেই যা দিয়ে সমন্বয় করে বাজারে টিকে থাকা যায়। এভাবে নাসিরের মতো অসংখ্য বিনিয়োগকারি আছে যাদের যাওয়ার আর জায়গা নেই। বাজার ওঠার দিকে তাকিয়ে আছে তারা। আর যারা সহ্য করতে পারেনি তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। এ বোঝা বইতে না পেরে এ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন।
পুঁজিবাজারে ২০১০ সালের ডিসেম্বরে স্মরণকালের ধসের কারণে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা। এক্ষেত্রে মার্চেন্ট ব্যাংক, মিউচুয়াল ফান্ড এবং আর্থিক খাতের কোম্পানিগুলোর একই অবস্থা। ব্যাপক দরপতনের কারণে সবার বিনিয়োগই আটকে গেছে। যে কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তারা নতুন করে বিনিয়োগে ফিরতে পারছে না। ২০১০ সালের ৫ ডিসেম্বর সূচক সর্বোচ্চ ৮ হাজার ২১৯ পয়েন্টে উন্নীত হয়। এর কিছু দিন পরই একসঙ্গে ৫০০ পয়েন্ট পরে যায়। বর্তমান সূচক ৩ হাজার ৮০০ পয়েন্ট। ৭ বছরে সূচক কমেছে ৫ হাজার পয়েন্ট।
এ ধকল এখনও অনেক বিনিয়োগকারি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সরকারের তরফ থেকে অনেক পদক্ষেপ নেয়া হলেও শেয়ার বাজারের কারসাজি থামাতে পারেনি। ফলে দিন দিন ক্ষুদ্রবিনিয়োগকারিদের লোকসানের পাল্লা ভারি হচ্ছে। শেয়ারবাজারে লোকসানের কারণে মহিউদ্দিন শাহারিয়ার (৩৫) নামে এক বিনিয়োগকারীর আত্মহত্যার অভিযোগ পাওয়া গেছে। মঙ্গলবার (২৪ মে) রাতে রাজধানীর সবুজবাগের মাদারটেক এলাকার শান্তিপাড়ায় নিজ বাসায় সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। বুধবার (২৫ মে) সকালে সবুজবাগ থানা পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠিয়েছে।
মহিউদ্দিন শাহারিয়ারের ভগ্নিপতি আরিফুল ইসলাম বলেন, মহিউদ্দিন ২ বোন ও ১ ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট। সে উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরে বেকার সময় কাটায়। পরে বাবার জমি বেচে শেয়ার ব্যবসা শুরু করে। ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসে মহিউদ্দিন ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা লোকসানে পড়ে। এতে সে মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। ২০১০ সালের ধস থেকে শেয়ারবাজার ঘুরে না দাঁড়ানোয় লোকসান আরও বেড়ে যায়। এতে সে মানসিকভাবে আরও বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আর এ কারণে মহিউদ্দিন আত্মহত্যা করেছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, বুধবার (২৫ মে) সকাল ৮টার দিকে মহিউদ্দিনকে ঘুম থেকে ওঠার জন্য ডাকাডাকি ও দরজায় ধাক্কাধাক্কি করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পরে পুলিশে খবর দিলে সকাল ১০টার দিকে তারা এসে দরজা ভেঙে লাশ উদ্ধার করে।
সবুজবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোলায়মান গাজী গণমাধ্যমকে বলেন, শেয়ার ব্যবসায় ১০-১২ লাখ টাকা লোকসানের ফলে মহিউদ্দিন শাহারিয়ার মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন। এতে তার মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। গত ১৪ মে তাকে মানসিক ডাক্তারের মাধ্যমে চিকিৎসাও দেওয়া হয়। ধারণা করা হচ্ছে মহিউদ্দিন এ অবস্থা থেকে আত্মহত্যা করেছেন।
মরদেহ উদ্ধারের পরে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে বলেও জানান তিনি।
২০১০ সালে শেয়ারবাজারে ধসের ফলে লোকসানের কবলে পড়ে ৬ বিনিয়োগকারী আত্মহত্যা ও ৩ জন হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। এদের মধ্যে ২০১২ সালের ৩০ জানুয়ারি লিয়াকত আলী (যুবরাজ) নামের এক বিনিয়োগকারী ঢাকায় আত্মহত্যা করেন। এ ছাড়া ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে দিলদার হোসেন, ২৯ মার্চ সিলেটে সামসুল হক সরদার শাহিন, ২২ ডিসেম্বরে ভৈরব পৌর এলাকায় রানী বাজারে মাজহারুল হক নামে বিনিয়োগকারীরা আত্মহত্যা করেন। হার্ট অ্যাটাকে একই বছরের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার শান্তিনগরে শাহাদাৎ, ২৮ জুন বরিশালে মাসুক উর রহমান সুমন ও ২৫ নভেম্বর ঢাকায় মফিজুল ইসলাম মারা যান।

Leave a Reply

%d bloggers like this: