বান্দরবানে বিষবৃক্ষ তামাকের চাষ গ্রাস করে নিচ্ছে কৃষিকে

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৩০ অক্টোবর, রবিবার: তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বান্দরবানের লামা উপজেলার ফসলি জমিতে বিষবৃক্ষ তামাকের চাষ গ্রাস করে নিচ্ছে কৃষিকে। দীর্ঘ সময়ে কৃষি জমির অধিকাংশ এখন তামাক চাষের দখলে। এমনকি তামাকের চাষ উপজেলার ওপর দিয়ে বয়ে চলা মাতামুহুরী নদীসহ তার শাখা প্রশাখার চর ও ঢালু জমিতেও বিস্তার লাভ করেছে।1
তামাক চাষের কারণে পরিবেশের বিপর্যয়, রোগ-বালাই, মাটি ও পানি দূষণের বিস্তার ঘটনোর কারণে তামাক চাষের জাল ছিঁড়ে বের হয়ে আসতে পারছেন না কৃষকরা। বিগত মৌসুমের ন্যায় চলতি মৌসুমেও পুঁজিবাদী প্রায় ১০হাজার একর ফসলি জমিতে তামাক কোম্পানীগুলো বিষবৃক্ষ তামাক চাষের ভয়াল বিস্তারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তবে তামাক চাষিরা বলেছেন, নগদ এককালীন আর্থিক মুনাফা ও পণ্যের আকর্ষণীয় মূল্য পাবার কারণে তারা ধান ও সবজি চাষ বাদ দিয়ে তামাক চাষ করছেন। তবে বিকল্প চাষাবাদ বা পেশার সুযোগ পেলে কিংবা তাদের পুনর্বাসন করা হলে তামাক চাষ থেকে ফিরে আসবেন তারা। লামা পৌরসভা, লামা সদর ও রুপসীপাড়া ইউনিয়নের তামাক বীজতলা এলাকায় তামাক চাষ নিয়ে আলাপকালে নিজেদের এ ইচ্ছার কথা জানান বেশ কয়েকজন চাষি। তবে বিভিন্ন কোম্পানি থেকে ঋণ নেওয়ার কারণে নিজেদের নাম পরিচয় প্রকাশে রাজি হননি তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৩ সালের দিকে লামা পৌরসভা এলাকার লামামুখ এলাকায় রাংগুনিয়া নামের একটি টোব্যাকো কোম্পানি সর্বপ্রথম তামাকের চাষ শুরু করে। পরে তা উপজেলার সাতটি ইউনিয়নসহ পাশের আলীকদম উপজেলায় ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। বর্তমানে লামা উপজেলায় প্রায় ৩০০০জন ও আলীকদমে অন্তত ১৫০০ চাষি তামাক চাষ করেন। উপজেলার লামা সদর ইউনিয়নের তামাক চাষী আবুল কালাম জানান, তিনি ১৭ বছর ধরে তামাক চাষ করছেন। এবার প্রায় তিন একর জমিতে তামাকের আবাদ করবেন। তার আতœীয় স্বজনেরাও তামাক চাষ করেন। তাদের বাড়িতে তামাক চুল্লি রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ধান ও অন্যান্য ফসল উৎপাদনে তারা ন্যায্যমূল্য পান না। তাই তামাক চাষ করেন তারা। তাদের অন্য কোনো ব্যবস্থা করা বা কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য এলাকায় হিমাগার নির্মাণ করা হলে তামাক চাষ বাদ দিয়ে দেবেন।
স্থানীয় তামাক চাষীরা জানায়, এলাকায় ব্রিটিশ আমেরিকান টোবাকো বাংলাদেশ, আবুল খায়ের ও ঢাকা টোবাকোর পৃষ্ঠপোষকতায় তামাক চাষ হয়। এজন্য তামাকের বীজতলা থেকে রোপণ, সার, কীটনাশকসহ সব ব্যয় নির্বাহ করা হয় কোম্পানির পক্ষ থেকে। তবে তামাক বিক্রির সময় ঋণদান বাবদ সব টাকা কেটে রাখে টোবাকো কর্তৃপক্ষ। তারা জানান, তামাক প্রতিনিধিরা এসে তামাক ক্ষেত, ফসল, চাষ, ব্যবস্থাপনা বিষয়ে নিয়মিত তাদের সাহায্য করেন।
চাষিদের অভিযোগ, তামাক চাষ না ছাড়তে পারার আরেক কারণ মহাজনি প্রথা। মহাজনরা চাষিদের দ্বিগুণ অর্থ ফেরতের শর্তে ঋণ দেন। ঋণের টাকা শোধ দিতে না পারলে সুদ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ে। এতে করে ঋণের জাল থেকে বের হতে পারেন না অনেক চাষি।
অন্যদিকে, তামাকের কারণে এ এলাকার মানুষের স্বাস্থ্য সমস্যা, মাটির উর্বরতা হ্রাস, নদীর পানি দূষণসহ নানা সমস্যা দেখা দিলেও কমছে না তামাকের আগ্রাসন। বেশ কয়েক বছর ধরে সমতল ছাড়িয়ে মাতামুহুরী নদীর চরেও শুরু হয়েছে তামাক চাষ। এছাড়া তামাক পোড়ানোর জন্য কাঠের যোগান দিতে অব্যাহতভাবে বাড়ছে পাহাড় ও বন থেকে কাঠ সংগ্রহ। ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য পড়ছে ক্ষতির মুখে পড়ছে।
কৃষকদের দাবি, অত্রাঞ্চলে একটি হিমাগার নির্মাণ, কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান ও তামাক চাষের কুফল তুলে ধরা হলে, সেইসঙ্গে তামাক চাষিদের সঠিকভাবে পুনর্বাসন করা গেলে তাদের তামাক চাষ থেকে ফেরানো সম্ভব। এজন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারিভাবে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হলে তামাক চাষিরা যে কোনো সহায়তা করতে রাজি বলে জানান লামা পৌরসভা মেয়র মো. জহিরুল ইসলাম।
তামাকের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে নিয়োজিত বেসরকারী সংস্থা উবিনীগ’র কক্সবাজারের আঞ্চলিক সমন্বয়ক রফিকুল হক টিটো বলেছেন, তামাক চাষের কারণে পরিবেশ বিপর্যয়ের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির সম্মুখিন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সবচেয়ে ক্ষতির শিকার হচ্ছে খাদ্য ফসলের আবাদি জমি। কারণ তামাক চাষে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির অনুজীব নষ্ট হচ্ছে এবং জমি হারাচ্ছে উর্বরতা শক্তি। ফলে ওই জমিতে শত চেষ্টা করলেও অন্য কোন ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছেনা।
লামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নূরে আলম বলেন, তামাক চাষে কৃষকদের নিরুৎসাহিত করতে কৃষি বিভাগ যথেষ্ট আন্তরিক। কিন্তু চাষিরা অধিক মুনাফার আশায় তামাক চাষে ঝুঁকে পড়েছেন। তবে কৃষকদেরকে তামাক চাষ থেকে ফেরাতে বিকল্প সরিষা, ভুট্টা, গম, আখ, কলা এবং তুলা উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে তুলা আবাদের উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি চাষ দেয়া হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*