বাউকুলের বাম্পার ফলন

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ১৪ জানুয়ারী ২০১৭ শনিবার: সাজেক পাহাড়ের উঁচু-নিচু জমিতে জুমের বদলে শুরু হয়েছে বাউকুলের চাষ। এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে বাউকুল বাগানে। এই ফল চাষ করে নিজেদের ভাগ্য বদলেছেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার সীমান্তবর্তী রাঙামাটি জেলার সাজেকের অর্ধশতাধিক পাহাড়ি পরিবার।
সরেজমিনে দেখা যায়, মিষ্টি স্বাদের ফলের ভারে নুয়ে পড়া গাছগুলো বাঁশের ঠেকা দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। ৫ থেকে ১০ ফুট উঁচু প্রতিটি গাছে ঝুলছে পরিপুষ্ট বাউকুল। কোনোটি সবুজ আবার কোনোটিতে হালকা বাদামি রং ধরেছে। ফলের ভারে কোনো কোনো ডাল বাউকুলসহ মাটিতে শয্যা পেতেছে লতার মতো।
মিষ্টি স্বাদের বাউকুল সমতলের মানুষের মধ্যে বেশ প্রিয় বলে সারা দেশেই রয়েছে এর চাহিদা। এরই প্রমাণ মেলে ইতোমধ্যে প্রায় সব বাগানের ফল বিক্রি শেষ পর্যায়ে দেখে।
রাঙামাটির সাজেকের বাঘাইহাট ডিপুপাড়ার সুজন চাকমার বাউকুল বাগান ঘুরে দেখা যায়, ৮০ শতাংশ জায়গা জুড়ে তার বাগান। সব মিলিয়ে ১৮৫টি বাউকুল গাছ সেখানে। সব কটি গাছই ফলভারে নুইয়ে পড়েছে। বড় আকারের বাউকুলের একেকটির ওজন ৩০ থেকে ৫০ গ্রাম। স্বাদেও বেশ মিষ্টি।
সাজকের ডিপুপাড়া, গুচ্ছগ্রাম নোয়াপাড়া, গ্লোকমা ছড়া, মাচালং এ্যাগোজ্যাছড়ি এলাকায় সুজনের মতো আরও অর্ধশতাধিক বাউকুলচাষী বাগান করেছেন। এবার ফলন যেমন বেশি হয়েছে, তেমনি ভালো দামও পাওয়া যাচ্ছে। এই মৌসুমে একেকজন চাষি ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত বাউকুল বিক্রি করেছেন।
২০১৪ সালে খাগড়াছড়ির এক নার্সারি থেকে পঞ্চগড়ের বাউকুলবীজ এনেছিলেন সুজন চাকমা। ৮০ শতাংশ জায়গায় রোপণ করেন ১৮৫টি চারা। সুজন জানান, পরের বছরই বাগানে ফল আসা শুরু হয়। প্রথম বছর ৩০ হাজার টাকার মতো বাউকুল বিক্রি করেন তিনি।
বাগান করতে তার খরচের হিসাব দিয়ে সুজন বলেন, ‘প্রথমে আমার ১৫ হাজার টাকা খরচ হয়। এ বছর বাদুড় ও পাখির হাত থেকে বাউকুল রক্ষা করতে জাল দিয়ে বাগান ঢেকে দেয়া এবং ওষুধসহ বাগান পরিষ্কার বাবদ খরচ হয় ছয় হাজার টাকা মতো।’ ঠিকমতো বাগান পরিচর্যার ফলও পেয়েছেন, বাম্পার ফলন হয়েছে গাছে। ইতোমধ্যে অর্ধেক বাউকুল বিক্রি করে তার আয় হয়েছে ১ লাখ ৭ হাজার টাকা। প্রতি কেজি বাউকুল প্রথমে ৮০ টাকা এবং এখন ৬০ টাকা কওে বিক্রি হচ্ছে।
সুজন চাকমা জানান, সাজেকের বাউকুল সমতলে প্রিয় হওয়ায় চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, রাজধানী ঢাকাতেও নিয়ে যাচ্ছে দীঘিনালা খাগছড়ির পাইকারি ব্যবসায়ীরা। সুজন চাকমার মতো ডিপুপাড়ার শান্তিময় চাকমা, মিলন কার্বারী, খোকন চাকমা তাদের বাউকুল চাষে অভাবনী সাফল্যের বর্ণনা দেন। বাউকুল চাষ করে তারা অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন বলে জানান।
কম পুঁজিতে লাভ বেশি হওয়ায় সাজেকে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বাউকুল চাষ। বাউকুল নিয়েই এখন আলোচনা সাজেক জুড়ে। বাম্পার ফলন আর বেশি লাভের আশায় জুম চাষ বাদ দিয়ে বাউকুল চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছে পাহাড়ি সাজেক অঞ্চলের কৃষকরা।
সাজেক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নেলশন চাকমা বলেন, ‘সাজেকে কয়েক বছর ধরে বাউকুলের চাষ হচ্ছে। প্রতিবছর ফলন বেড়েই চলছে। এর মধ্যে ডিপুপাড়া গ্রামে বেশি বাউকুল চাষ হয়। পার্বত্য এলাকার মধ্যে সাজেকের বাউকুল সবচেয়ে বড়, স্বাদেও মিষ্টি।’ সরকারি সাহায্য পেলে এখানে বাউকুল চাষ বাড়ার পাশাপাশি কৃষকেরা অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে বলে মনে করেন তিনি।
উপজেলার ছয় একরের মতো জমিতে বাউকুল চাষ হয়েছে বলে জানান বাঘাইছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আল ইমরান। এর মধ্যে সাজেকে রয়েছে তিন-চার একর। তিনি জানান, উপজেলার সাজেকেই প্রথম বাউকুল চাষ শুরু হয়। সেখানকার আবহাওয়া ও মাটি বাউকুলের উপযোগী হওয়ায় এর ফলনও বেশি হচ্ছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: