বাংলাদেশ ভুল থেকে শেখে না

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৩ জানুয়ারী ২০১৭, সোমবার: এএফপিওয়েলিংটন টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংস সবাইকে একটু অবাক করেছিল। প্রথম ইনিংসে ৫৯৫ রান করা দল কীভাবে দ্বিতীয় ইনিংসে ওভাবে ধসে পড়ে! ক্রাইস্টচার্চে সেই অবাক ভাবটা আর নেই। ধসে পড়াটাই যেন স্বাভাবিক। নিউজিল্যান্ড প্রথম ইনিংসে ৬৫ রানের লিড নেওয়ার পর বাংলাদেশের একটার পর একটা উইকেট হারাল। প্রেসবক্সে চলছে ওভার আর সময়ের হিসেব। ইনিংসের ৪০তম ওভারে নাজমুল হোসেনের বোল্ড হওয়ার সময় দিনের খেলা বাকি আরও ৩৪ ওভারের মতো। এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশকে দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট করে নিউজিল্যান্ড কি পারবে আজই খেলা শেষ করে দিতে? লিড তো তখন বাংলাদেশের মাত্র ৪১! ১০৬ রানে ৭ উইকেট পড়ে গেছে। শেষ তিন উইকেটে আর কতটুকুই–বা যাওয়া সম্ভব।
বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত অলআউট ১৭৩ রানে। নিউজিল্যান্ডের জন্য লক্ষ্য দাঁড়াল মাত্র ১০৯ রানের। হাতে এক দিনেরও বেশি সময় এবং ১০ উইকেট। নিউজিল্যান্ড অবশ্য মাত্র ১ উইকেট হারিয়েই তুলে নিল জয়, সেটা চতুর্থ দিনেই। ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি, টেস্ট—সব মিলিয়ে ব্যবধান ৮-০!
অদ্ভুত এক ক্রিকেট দল বাংলাদেশ। নিজেরাই নিজেদের কাছে প্রত্যাশার সীমা বাড়িয়ে নিয়ে নিজেরাই তা আবার মাটিতে নামিয়ে নিয়ে আসে। তখন খারাপ খেললেও মনে হয় এটাই তো হওয়ার কথা! দুই বছর রাজার মতো খেলার পর তাদের বাজে পারফরম্যান্সকে মানুষ স্বাভাবিক ধরে নিতে শুরু করলে তা যে দলটার মর্যাদায়ই আঘাত, সেটা কি ক্রিকেটারেরা বোঝেন না?
মাঠে তাঁদের আচরণ দেখে মনে হয় আসলেই বোঝেন না। নইলে কেন ওয়েলিংটনের মতো ভুল করেই ক্রাইস্টচার্চে বিপর্যয়ে পড়বে ব্যাটিং! তাঁরা বলেন, ‘এখানকার ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে ওখানে ভালো খেলব।’ কই সেটা? কবে নেবেন ভুল থেকে শিক্ষা?
অর্ধেক সুযোগগুলো বাদ দিয়ে হিসেব করলেও পুরো নিউজিল্যান্ড সফরে মোট ২০টি ক্যাচ ফেলেছে বাংলাদেশ দল, এর ছয়টিই ক্রাইস্টচার্চ টেস্টের প্রথম ইনিংসে। সহজ সহজ সব ক্যাচ। হাতে যেন সবার মাখন মাখা! আজকের কথাই ধরুন। তাসকিন আহমেদের বলে গালিতে নিল ওয়েগনার ক্যাচ দিয়েছিলেন। নাজমুল হোসেনের হাত ফসকাল। এর আগে কামরুল ইসলামের বলে সেকেন্ড স্লিপে আউটের সুযোগ দিয়ে টিম সাউদিও বেঁচে যান মেহেদী হাসানের হাত থেকে।
আসলে বাংলাদেশ দলে স্লিপে দাঁড়ানোর মতো কোনো ফিল্ডারই নেই। দলের সেরা ব্যাটসম্যান বা টপ অর্ডারের ব্যাটসম্যানরাই সাধারণত স্লিপে দাঁড়ান। দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা এবং দ্রুত সাড়া দেওয়ার ক্ষমতার কারণেই স্লিপের ফিল্ডিংটা তাঁরা ভালো করেন। মার্ক টেলর থেকে শুরু করে মার্ক ওয়াহ, মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন, স্টিভেন ফ্লেমিং, রাহুল দ্রাবিড়—স্লিপের সেরা ফিল্ডাররা সবাই-ই দলের সেরা ব্যাটসম্যানও ছিলেন।
কিন্তু বাংলাদেশের সেরা ব্যাটসম্যানরা কোথায় ফিল্ডিং করেন? স্লিপেই–বা কাদের দাঁড় করানো হচ্ছে? টপ অর্ডার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে একমাত্র ইমরুল কায়েসই দাঁড়ান স্লিপে। সেরা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে মাঝেমধ্যে সাকিবকেও স্লিপে দেখা যায়। এ-ই তো! দুই টেস্টেই স্লিপে দাঁড়িয়ে ক্যাচ ফেলেছেন সাব্বির রহমান আর মেহেদী মিরাজ। প্রথম টেস্টে সহজ ক্যাচ ছাড়ার পর এই টেস্টে কি তাঁদের সরিয়ে আর কেউ স্লিপে দাঁড়াতে পারলেন না?
দলের সেরা ফিল্ডার সাব্বিরকে স্লিপে পাঠিয়ে তাঁর ক্ষিপ্র ফিল্ডিংয়ের অপব্যবহারই করা হচ্ছে হয়তো। পয়েন্টের সেরা ফিল্ডার সাব্বির। শুধু দুর্দান্ত সব ক্যাচ নেওয়াই নয়, অসামান্য ফিটনেসের সুবাদে বলের পেছনে বিদ্যুৎ–গতিতে ছোটার দারুণ ক্ষমতা তাঁর। স্লিপে দাঁড়ালে বেশির ভাগ সময়ই এই ক্ষমতাটা কাজে লাগে না। সেরা ব্যাটসম্যানদের অনেকে ফিল্ডিংয়ের ছলে মাঠের এমন সব জায়গায় ‘লুকিয়ে’ থাকেন যে সেসব জায়গায় বেশির ভাগ সময়ই ফিল্ডারের কাজ শুধু বল কুড়িয়ে আনা।
ফিল্ডিংয়ে ভুলের ছড়াছড়ি সফরের শুরু থেকেই। সেটা থেকে মুক্তি মিলল না শেষ দিকে এসেও। সেটারই সুযোগ নিয়ে নিউজিল্যান্ড তাদের প্রথম ইনিংসে শেষ তিন উইকেটে করে ফেলল ৯৮ রান, যার ৫৭-ই এসেছে হেনরি নিকলস আর ওয়াগনারের নবম উইকেট জুটিতে। ২৫৬ রানে ৭ উইকেট হারিয়েও তাই ইনিংস শেষের স্কোর ৩৫৪ রান।
হ্যাগলি ওভালের উইকেটে বোলারদের জন্য কিছুই ছিল না। ছিল ব্যাটসম্যানদের জন্য প্রলোভন। রান করার, ভুল করারও। তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান, সৌম্য সরকাররা দ্বিতীয়টিই বেছে নিলেন। পুরো সিরিজে দুটি ফিফটি তামিমের। নেলসনের তৃতীয় ওয়ানডেতে ৫৯ ও ওয়েলিংটন টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৫৬। তবে ৫০-৬০ রান করে খুশি থাকবেন নিচের দিকের ব্যাটসম্যানরা। তামিম ৫০-৬০ রান করে উইকেটে থাকলে তাঁর কাছে বড় কিছুরই প্রত্যাশা করে সবাই। কিন্তু সিরিজজুড়ে তিনি শুধু আশাই দেখিয়ে গেলেন।
ক্রাইস্টচার্চে টেস্ট অধিনায়ক হিসেবে অভিষেকের ম্যাচে ব্যাটসম্যান হিসেবেও পুরো ফ্লপ। প্রথম ইনিংসে ৫ ও আজ দ্বিতীয় ইনিংসে ৮। প্রথম ইনিংসে আউট হয়েছেন চতুর্থ ওভারে, আজ ছিলেন ষষ্ঠ ওভার পর্যন্ত। টিম সাউদির শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে ডিপ স্কয়ার লেগে মিচেল স্যান্টনারের সহজ ক্যাচ। জয় বা ড্রয়ের জন্যও যখন তামিমের উইকেটে থাকাটা জরুরি, অধিনায়ক হিসেবে উচিত ছিল সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া—তখন ওই রকম শট খেলার কী ব্যাখ্যা দেবেন তামিম?
সাকিব উইকেটে এসে দ্বিতীয় বলেই জীবন পেলেন স্লিপে জিত রাভালের ক্যাচ মিসে। কিন্তু জীবনের মূল্য তাঁর কাছে কী? নিজের ৮ রানের মাথায় অনেকটা ওয়েলিংটন টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসেরই পুনরাবৃত্তি করলেন। কাটের মতো করতে গিয়ে আধাআধি একটা শট খেলে ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্টে গ্র্যান্ডহোমের ক্যাচ। এমন কোনো বল ছিল না। সাউদি তবু সাকিবের আউটটা মনে রাখবেন কারণ টেস্টে এটি তার ২০০তম শিকার।
বড় কোনো জুটি নেই, নেই বড় ইনিংস খেলার তাড়না। কী এক তাড়াহুড়ায় ব্যাট চালিয়ে গেলেন সবাই। মাহমুদউল্লাহ, সাব্বিরদের আউটগুলোকে হয়তো বাজে বলা যাবে না, কিন্তু এটা বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে নিউজিল্যান্ডে এসে এতগুলো ম্যাচ খেলার পরও এখানকার কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ায় ফাঁক থেকে গেছে তাঁদের। মাহমুদউল্লাহ বারবারই শরীর সামনে না নিয়ে ব্যাট চালাচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সেটারই মাশুল গুনলেন ব্যাটের কানায় বল লাগিয়ে বোল্ড হয়ে। ওয়াগনারের শর্ট বলের শিকার সাব্বির। মিডল স্টাম্পের লাইনে পড়ে ওপরে উঠে আসা বলটা নিচে নামাতে গিয়ে কট বিহাইন্ড।
চাইলে এ রকম প্রায় প্রতিটি আউটেরই বর্ণনা দেওয়া যায়। কিন্তু ঘুরে–ফিরে সেই তো একই কথা! ভুল থেকে না শেখার কাহিনি। বাংলাদেশ দল ভুল থেকে শেখে না—এটাই এবারের নিউজিল্যান্ড সফরের শিক্ষা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*