বাংলাদেশ অফুরন্ত পর্যটন সম্ভাবনার এক দেশ

নিউজগার্ডেন ডেস্ক: ২৭ জানুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার: আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ, অফুরন্ত পর্যটন সম্ভাবনার এক দেশ। সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলা, অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা, হাজার বছরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ পর্যটনশিল্পের জন্য খুবই সম্ভাবনাময়। বিশ্ব মানচিত্রে একটি নতুন পর্যটন গন্তব্য হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে ওঠার জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের উপাদানই রয়েছে। এদেশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের মানুষের অতিথিপরায়ণতা বিশ্বের যেকোনো পর্যটককে আকৃষ্ট করে। গোটা দেশই যেন এক বিশাল পর্যটনভূমি। ষড়ঋতুর সম্ভারে নানারকম বৈচিত্র্য, সমতলভূমি, হাওর-বাঁওড়, পাহাড়, টিলা আর ছায়া সুনিবিড় গ্রামগুলো নান্দনিক উৎকর্ষে যে কারো হৃদয় কাড়ে। বাংলাদেশের এই বৈচিত্র্যময় পর্যটন আকর্ষণে আদিকাল থেকেই ইবনে বতুতার মতো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পর্যটকদের আগমন ঘটেছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এদেশের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষ্টি, সভ্যতা, সমৃদ্ধ, সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের মানুষের অতিথিপরায়ণতার গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে একটি নতুন পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নিজ হাতে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করেন। পর্যটনশিল্পের প্রচার, প্রসার ও বিকাশ এবং তরুণদের মধ্যে পর্যটনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে এবং তরুণ সমাজকে পর্যটন শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন জাতীয় হোটেল ও পর্যটন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত সমৃদ্ধ নগরী কক্সবাজারকে পর্যটন রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তৎকালীন অব্যবহৃত সাইক্লোন শেল্টারকে পর্যটন মোটেলে রূপান্তরিত করেন। অত্যন্ত আফসোসের সঙ্গে বলতে হয়, আজ জাতির পিতা বেঁচে থাকলে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া নয় বাংলাদেশ হতো এশিয়ার অন্যতম পর্যটন গন্তব্য। তারপরও জাতির পিতার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে পর্যটনশিল্পকে অসীম গুরুত্ব দিয়ে এর উন্নয়ন, প্রচার, প্রসার ও বিকাশের জন্য যারপরনাই চেষ্টা অব্যাহত রেখে চলেছেন।
পর্যটনের মাধ্যমে বিশ্বে বাংলাদেশকে আরো বেশি পরিচিত করিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যে ২০১৬ সালকে পর্যটন বর্ষ ঘোষণা করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন ট্যুরিস্ট পুলিশ, পর্যটন বোর্ড, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। ২০১৫ সাল থেকে ২০১৮ এই তিন অর্থবছরে পর্যটন খাতকে আরো চাঙা করতে আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছেন। তরুণদের মধ্যে পর্যটনের জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্যে এবং তরুণ সমাজকে পর্যটন শিক্ষায় শিক্ষিত করার লক্ষ্যে ইতিমধ্যে সরকারি-বেসরকারি ১৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৬৮৫টি অনার্স-মাস্টার্স কলেজে চার বছর মেয়াদি ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টে অনার্স ডিগ্রি কোর্স চালু করা হয়েছে।
কক্সবাজারের এ বিশাল সমুদ্র সৈকতকে আকর্ষণীয় ও আন্তর্জাতিকমানের পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত করা, টেকনাফের সাবরাংয়ে ১১৬৪ একর জমিতে ইটিজেড (এক্সক্লুসিভ ট্যুরিস্ট জোন) স্থাপন, বাগেরহাটের রামপালে বিমানবন্দর, ফেনীর সোনাগাজীতে বিমানবন্দর, সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র ও দুটি ইকোপার্ক স্থাপন, শরিয়তপুরে প্রাইভেট এয়ারপোর্ট স্থাপন, পর্যটনশিল্পের বিকাশে আন্তর্জাতিক ক্রুজ পরিচালনা, ভারত-বাংলাদেশ নৌপথে যাত্রীবাহী নৌচলাচল ও সৈকত গ্রাম তৈরি, শুধু সমুদ্র সৈকত নয়, নদীপথগুলোকেও পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয় করে গড়ে তোলা, ঐতিহ্যের স্থানগুলো সুরক্ষার পাশাপাশি পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় নতুন পর্যটন নগরী গড়ে তোলার মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।
এরই ধারাবাহিকতায় দেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, নেত্রকোনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জÑ এ সাত জেলাকে নিয়ে হাওরকেন্দ্রিক পর্যটন ‘হাওর ট্যুরিজম’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যানুসারে দেশে ৭ লাখ ৮৪ হাজার হেক্টর জলাভূমিতে মোট ৪১৪টি হাওর রয়েছে; তবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুসারে হাওরের সংখ্যা ৪২৩টি এবং ওটঈঘ-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় ৪০০ হাওর রয়েছে।
বর্তমান সরকার হাওর এলাকার উন্নয়নে খুবই আন্তরিক। ইতিমধ্যেই ‘হাওর ট্যুরিজম’ বিকাশে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিলখ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওরটি ২০০০ সালে রামসার সাইট ঘোষিত হওয়ার পরই দেশি-বিদেশি পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী টাঙ্গুয়ার হাওর, বারিকের টিলা ও জাদুকাটা নদীকে ঘিরে পর্যটনশিল্প বিকাশে সরকার কাজ করে যাচ্ছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন ২০১৩ সালে এই হাওরের একটি এলাকাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করেছে। জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালে এই হাওরকে কেন্দ্র করে পর্যটন অবকাঠামো নির্মাণের জন্য পর্যটন করপোরেশনকে আহ্বান জানিয়েছে। তাছাড়া দিন দিন এই হাওরে পর্যটকদের আনাগোনা বৃদ্ধি পাওয়ায় দুর্গম হাওরে বেড়াতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশ এখানে ক্যাম্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে।
প্রকৃতি ছাড়াও হাওরে পর্যটকদের দেখার মতো বেশ কিছু জায়গা রয়েছে। কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলার কাটাখাল ইউনিয়নের ‘দিল্লির আখড়া’ এর অন্যতম। এখানে রয়েছে শত শত হিজল গাছ। ৪০০ বছরের পুরনো এ আখড়া। হিজল গাছের সারি ৩০০ একরের আখড়া এলাকাজুড়েই! শত শত হিজলগাছ সারা বর্ষায় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। আখড়ার নির্জনতায় আপনারও মনে হবে, সত্যি এটি চমৎকার একটি স্থান বটে। দিল্লির আখড়ার পাশেই রয়েছে বিথঙ্গলের আখড়া ও বন। এখানে মোগল আমলে তৈরি একটা স্থাপনা রয়েছে। দিল্লির আখড়া কিশোরগঞ্জের মিঠামইন উপজেলায় পড়লেও বিথঙ্গলের আখড়ার অবস্থান হবিগঞ্জের বানিয়াচংয়ে। এ দুটি আখড়াই পর্যটকদের আকৃষ্ট করে।
এছাড়া অষ্টগ্রামের প্রায় ৪৫০ বছরের পুরনো পাঁচ গম্বুজবিশিষ্ট কুতুব শাহ মসজিদ, আওরঙ্গজেব মসজিদ, ঈশা খাঁর সময়ে নির্মিত ইটনার শাহি মসজিদ, মোগল আমলে নির্মিত নিকলীর গুরুই মসজিদ হাওর পর্যটকদের দৃষ্টি কাড়ে। হাওরে না এলে কখনো বুঝা যাবে না প্রকৃতির ভাঁজে ভাঁজে দয়াময় প্রভু এত সৌন্দর্য লুকিয়ে রেখেছেন। কেউ কেউ বলেন, হাওরের বুক যেমন বিশাল, এর সৌন্দর্যও তেমন। চীনের বিখ্যাত পর্যটক হিউয়েন সাং থেকে শুরু করে দেশ-বিদেশের বিখ্যাত পর্যটকরা হাওরের প্রকৃতি, প্রাচীন স্থাপনা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। মুগ্ধ হয়েছেন হাওরের মানুষের জীবনযাপন, কৃষ্টি-কালচার ও উদার আতিথেয়তায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*