বটি ধার লাগবে?

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২ জানুয়ারী. ২০১৭, সোমবার: কাঁধে শিল-পাটা ও ধাতব বস্তু ধারালো করার ভারী যন্ত্রটি নিয়ে ফেরি করেন সাবাইদুর। প্রতিদিন হাঁটতে হয় দীর্ঘ পথ। মানুষের বাড়ির সামনে দিয়ে উচ্চস্বরে ‘লাগবে…শিল-পাটা, বটি ধার’ বুলিতে ডাকতে থাকেন তিনি।
শহরের বাড়িগুলো বহুতল হওয়ায় বেশিরভাগ সময় সাবাইদুরকে হাঁক দিতে হয় মাথা উচুঁ করেই। কেও সাড়া দিলে তৎক্ষণাৎ নিজের যন্ত্রটি কাঁধ থেকে নামিয়ে অপেক্ষায় থাকেন কাজের। কখনও অল্প, আবার কখনও দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর নিজের প্রত্যাশার গ্রাহক নিচে নেমে আসলে কাজে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন তিনি।
সাবাইদুর রহমান হবিগঞ্জ জেলা থেকে চার বছর আগে কৃষি কাজ বাদ দিয়ে বেশি রোজগারের উদ্দেশ্যে পারি জমান সাভারের নবীনগর এলাকায়। ঐ সময় শিল-পাটা ধার করার কাজে পারদর্শী জাবিদুল, মোখলেস, তাহের, আফজাল ও মুজাহিদকে নিয়ে কুরগাঁও এলাকার একটি বাড়িতে ভাড়া ওঠেন তারা। মূলত তাদের পরামর্শেই তিনি গ্রাম ছেড়েছিলেন। এরপর চার বছর ধরেই মানিকগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ার মহল্লা থেকে মহল্লায় শিল-পাটা ধারের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন সাবাইদুর।
খুব একটা বেশি চাহিদা নেই সাবাইদুরের। নিজে খেয়ে-পড়ে বাকিটা দেশের বাড়িতে বউ ও ছেলে-মেয়ের জন্য পাঠাতে পারলেই খুশি তিনি। এমনটাই বলছিলেন প্রান্তিক পর্যায়ের দিন এনে দিন খাওয়া এই মানুষটি।
সহজ-সরল সাবাইদুর জানান, প্রতিদিন তিনি যতক্ষণ হাঁটেন তা আট থেকে দশ কিলোমিটার হবে। একেকটি দা-বঁটি ধার করতে ১৫ থেকে ২০ টাকা নেন দিনি। ৪০ থেকে ৫০টাকায় খোদাই কওে দেন শিল-পাটা। প্রতিদিন ৩০টির মতো বটি ধার দেওয়ার কাজ পাওয়া যায় বলে জানান সাবাইদুর। মাঝে মধ্যে পাওয়া যায় শিল-পাটার কাজ।

তবে এত ভাড়ী যন্ত্র নিয়া হাঁটতে কষ্ট হয় জানান সাবাইদুর। বলেন, ‘এখন অবশ্য অভ্যাস হয়ে গেছে। আর এত কষ্টের পর যখন কাজ করিয়ে ন্যূনতম মজুরি দিতে কেউ কৃপণ্য করে তখন খুব খারাপ লাগে। অনেকেই জোর করে কম টাকা ধরিয়ে দেয়। তখন বলার কিছু থাকে না।’
অবশ্য আর বেশি দিন এই কাজ করবেন না বলে জানান সাবাইদুর। কারণ গ্রাম থেকে যে আশা করে এখানে পাড়ি জমিয়েছিলেন তা পূরণ হয়নি তার। প্রথমে এক ছেলে ও মেয়ে ছোট অবস্থায় থাকায় নিজে খেয়ে যা বাড়ি পাঠাতেন তাতেই চলতো। কিন্তু এখন তাদের পড়াশুনার খরচ বেড়ে যাওয়ায় এই উপার্জনে আর চলে না।
ভাবছেন হবিগঞ্জে দেওয়ান দিঘির পূর্বপাড় নামে নিজ গ্রামে গিয়ে কৃষি কাজের পাশাপাশি অন্য কিছু করবেন। তবে তাতেও দরকার পুঁজি। সেই ব্যবস্থাই অবশ্য এখন করছেন। আপাতত কোন এনজিও থেকে ঋণ নেওয়ার কথা চিন্তা করছেন।
বিলাসিতার স্বপ্ন কি একেবারেই দেখেন না সাবাইদুর? এমন প্রশ্নে আকাশকুসুম চিন্তায় নিমগ্ন হতে দেখা যায় স্বল্প বাসনার প্রান্তিক পর্যায়ের এই মানুষটিকে। এক পর্যায়ে নমনীয় স্বরে সাবাইদুরকে বলতে শোনা যায়, ‘এটা সম্ভব নয় ভাই!’ উদাসীন উত্তর আসে এই মানুষটির কাছ থেকে- ‘জন্মই হইছে ভাই, দিন এনে দিন খাওয়ার জন্য। এগুলা চিন্তা মাথায় আসে না। ’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*