ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এমানুয়েলে ম্যাক্রন সব হিসেব-নিকেশ উল্টে দিয়েছেন

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ৮ মে ২০১৭, সোমবার: এটাকে ‘রাজনৈতিক ভূমিকম্প’ বলা যেতে পারে। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এমানুয়েলে ম্যাক্রন সব হিসেব-নিকেশ উল্টে দিয়েছেন। এক বছর আগেও তিনি এমন একটি সরকারের সদস্য ছিলেন, যার প্রেসিডেন্ট ছিল ফ্রান্সের ইতিহাসে সবচেয়ে অ-জনপ্রিয়দের মধ্যে একজন। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সী ম্যাক্রন মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থিকে পরাজিত করেছেন। প্রথমে তিনি পরাজিত করেছেন মধ্য বাম এবং মধ্য ডানপন্থীদের এবং সবশেষে পরাজিত করেছেন উগ্র ডানপন্থীদের।
প্রথমত ম্যাক্রন ছিলেন সৌভাগ্যবান। মধ্য ডানপন্থী প্রার্থি ফ্রাঙ্কো ফিলো নির্বাচনের লড়াই থেকে আগেই ছিটকে পড়েছিলেন। সোশালিস্ট প্রার্থি বেনোট হ্যামন’রও একই অবস্থা হয়েছিল। ম্যাক্রন যে শুধু সৌভাগ্যবান ছিলেন তা নয়। শুধু ভাগ্যের উপর নির্ভর করে তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করেননি। তিনি বেশ কৌশলীও ছিলেন।
ম্যাক্রন সোশালিস্ট প্রার্থি হিসেবে মনোনয়ন নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তিনি বুঝতে পারছিলেন সোশালিস্ট পার্টি জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এবং সে দল থেকে নির্বাচন করলে জয়লাভ করা যাবে না।
এজন্য তিনি ইউরোপের অন্য দেশগুলোতে কী ঘটছে সেদিকে লক্ষ্য রেখেছেন। বিশেষ করে স্পেন এবং ইটালিতে। স্পেনে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বামপন্থী ‘পোডেমো’ অর্থাৎ ‘আমরা পারি’। অন্যদিকে ইটালিতে জনপ্রিয় হয় ফাইভ-স্টার মুভমেন্ট।
ম্যাক্রন লক্ষ্য করেন, স্পেন এবং ইটালির মতো কোন বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি ফ্রান্সে গড়ে উঠেনি। সেজন্য ২০১৬ সালে ম্যাক্রন গড়ে তোলেন ভিন্ন একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম এবং একই সাথে তিনি প্রেসিডেন্ট ফ্রাসোঁয়া ওলাদের সরকার থেকে পদত্যাগ করেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, ম্যাক্রন নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই ভোটারদের ঘরে-ঘরে গিয়েছেন।
২০০৮ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে বারাক ওবামা যে ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সে বিষয়টি অনুসরণ করেছে ম্যাকরনের রাজনৈতিক দল। এ কাজ করার জন্য তার দল একটি ফার্ম-এর সহায়তা নিয়েছে। তাদের স্বেচ্ছাসেবকরা ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ এলাকার প্রায় তিন লক্ষ ভোটারদের বাড়িতে গিয়েছে। সেখানে ভোটারদের সাথে বিস্তারিত কথা বলেছে। প্রায় ২৫ হাজার ভোটারের ১৫ মিনিট করে সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
এ সাক্ষাৎকারগুলো দলের কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং সেগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভোটারদের চাহিদা নির্ণয় করা হয়েছে। এ কারণে ম্যাক্রন ভোটারদের মন বুঝতে পেরেছিলেন। ম্যাক্রন ভোটারদের মাঝে ইতিবাচক বার্তা দিতে পেরেছিলেন। তিনি প্রেসিডেন্ট ওলাদ সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। এক সময় তিনি ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকারও ছিলেন। তিনি মন্ত্রী থাকার সময় ফ্রান্সে সরকারী ব্যয় কমানোর বড় ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তার সাথে প্রতিযোগী প্রার্থি লি পেন বলেছিলেন হচ্ছেন বড় লোকের প্রার্থি। কিন্তু ম্যাক্রন নিজেকে আরেকজন ফ্রাঁসোয়া ওলাদে রূপান্তরিত করেননি। ফ্রান্সের জনগণ যে নতুন কিছু পেতে চায় সেদিকে মনোযোগ দিয়েছেন ম্যাক্রন।
প্যারিস-ভিত্তিক বিশ্লেষক মার্ক অলিভার বলেছেন, “ফ্রান্স জুড়ে একটা হতাশা তৈরি হয়েছিল। তিনি (ম্যাক্রন) বেশ আশাবাদ নিয়ে আসেন। ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন। তিনি তরুণ এবং প্রাণশক্তিতে ভরপুর। তিনি করবেন সেটি বলেননি। তিনি শুধু বলেছেন, কিভাবে মানুষজন সুযোগ পেতে পারে। ”
ম্যাক্রনের প্রতিযোগী লি পেন সব কিছুতেই নেতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। লি পেন ইমিগ্রেশন বিরোধী, ইউরোপীয় ইউনিয়ন বিরোধী। ম্যাক্রনের নির্বাচনী জনসভাগুলো ছিল বৈচিত্র্যপূর্ণ। সেখানে পপ মিউজিক হতো এবং আরো নানা ধরনের অনুষ্ঠান থাকতো। অন্যদিকে লি পেন’র নির্বাচনী জনসভাগুলোতে বিভিন্ন সময় বিশৃঙ্খলা দেখা যেতো। জনসভায় অংশ নেয়া দর্শকরা নিজেদের মধ্যে পানির বোতল ছোড়াছুড়ি করতেন। সেসব জনসভায় নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক উপস্থিতি থাকতো। লি পেন’র অর্থনৈতিক নীতি দেশের জন্য কতটা ভালো হবে সেটি নিয়ে অনেকের মাঝে সংশয় তৈরি হয়।
একজন উগ্র ডানপন্থীর উত্থানের আশংকায় অনেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন। লি পেনকে আটকানোর জন্য ম্যাক্রনকেই সর্বশেষ ভরসা ভেবেছিল ভোটাররা। লি পেন বেশ জমজমাট নির্বাচনী প্রচারণা চালালেও বিভিন্ন জরীপে তার জনপ্রিয়তা ক্রমাগত কমতে থাকে। নির্বাচনের আগে দুই সপ্তাহে লি পেন জনমত জরীপে দুইবার পরাজিত হয়েছেন ম্যাক্রনের কাছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: