ফেলে আসা শৈশব এবং বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট

মুনমুন বড়–য়া চৌধুরী, ১৫ মে ২০১৭, সোমবার: “কানা মাছি ভোঁ ভোঁ, যাকে পাই তাকে ছোঁ” ছড়াটি কে বানিয়েছিল? কেউ কি জানে? জানে না। এমন মন মাতানো হাজারো শব্দের ডালে ছোঁয়া কি যায় সেই শৈশবকে? সেই ছড়াতে মিশে আছে আমাদের ছোটবেলার রঙ্গিন স্মৃতি।
সেই পড়ন্ত বিকেল বেলায় পাড়া মাতিয়ে এদিক থেকে সেদিকে ঘুরে বেড়ানো, কানামাছি, দৌড়াদৌড়ি, এলাটিং-বেলাটিং, ইকরি সিকরি, ইচিং বিচিং, হাড়িভাঙ্গা, লুকোচুরি, এক্কাদোক্কা, ফুলটোক্কা, পলানটুক, গোল্লাছুট সহ আরো কতো কি খেলে সারা শরীর কাদা-মাটি মেখে ঘরে ফেরা, মায়ের বকুনি, দাদার হাতে লাঠি, দাদী/ ঠাকু’মার হাতের আদর আর বাবার হাতের পরশ, কোথায় হারিয়ে গেছে যেন আমাদের সেই দিনগুলো, হারিয়ে গেছে শৈশবের খেলা, দিন দিন ব্যস্থতার ভীড়ে হারাচ্ছে শিশুদের সব রকমের শৈশবের খেলা। আরো হারাচ্ছে ব্যস্ত নগরীর ভীড়ে ধূূলো আর কাদার গন্ধ।
বর্তমান প্লে পড়–য়া একজন ছাত্রের কাছে খেলা করা তো দূরের কথা, কেবল নিজেকে দেবার মতন কোন সময়ই তার নেই। সেই সকাল থেকে শুরু করে স্কুল বড় বড় বইয়ের বোঝা, পড়ার চাপ কোচিং গান/ নাচ/ ড্রয়িং শেখা, সব মিলে ব্যস্থ সে। নিজেকে দেবার কোনরূপ সময় তার নেই। তাছাড়া ইন্টারনেট আর মুঠোফোনের যুগে, পড়ন্ত বিকেলে দৌড়াদৌড়ি বা কানামাছি এসব খেলা অথবা তাদের মুখ থেকে এসব আর্শ্চয্য সব ছন্দবদ্ধ ছড়ার লাইন শোনা কল্পনাই করা যায় না।
আমরা কি যুগের সাথে খাপ খাওয়াতে আর মানিয়ে নিতে নিজের সন্তানদের এক ভয়ংঙ্কর ভবিষ্যতের দিকে পাড় করিয়ে দিচ্ছি? নাকি, অল্প বয়সে মুঠোফোন আর ট্যাব, ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট দিয়ে নিজের সন্তান কতোই না স্মার্ট সেটাই জাহির করছি? কোনটি? বাস্তবিক পক্ষে, আমরা সময়ের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে নিজের সন্তানদের সময় দিতে পারছি না।
চার দেওয়াল ঘেরা বদ্ধ নগরীতে জায়গা খুঁজে না পেয়ে সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম হিসেবে শিশুরা বেছে নিচ্ছে ইন্টারনেট বা স্মার্টফোন যা তাদের অনাগামী ভবিষ্যৎ কে এক কালো ছায়ার দিক নির্দেশনা করছে।
সুতরাং শিশুর বেড়ে উঠা হোক বিশুদ্ধ, পরিপূর্ণ। কেননা, আজকের শিশু আগামীর সূর্যোদয়। একটি জাতির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হচ্ছে শিশুরা। বেগম সুফিয়া কামাল-এর একটি কবিতা আমাদের পাঠ্যবইয়ে ছিল। তা হল-
‘আমাদের যুগে আমরা যখন
খেলেছি পুতুল খেলা
তোমরা এখন সেই বয়সেই
লেখাপড়া করো মেলা’
তো আমরা সেই লেখাপড়া মেলা করা শিশুরা বড় হয়ে গেছি। এখন পুরো পৃথিবীময় আমাদের শিশুরা চষে বেড়াচ্ছে ইন্টারনেট নিয়ে।
পৃথিবীর নির্মল আলোয় আসা শিশুদের মাঝে লুকায়িত থাকে আগামীর স্বপ্ন। আমাদের সোনালী স্বপ্নীল ভবিষ্যৎ। শিশুরাই হবে দেশ ও জাতি গঠনের সু-কারিগর। শিশুর শৈশব, কৈশোরের লালিত স্বপ্নভূমির ভিত্তি মজুত করতে হবে। শিশুদের আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি সম্পর্কে অবগত করতে হবে। আগামীর সূর্যোদয় যেনো চারপাশকে আলোকিত করে, তেমনিভাবে তাকে গড়ে তুলতে হবে। শিশুর শৈশব স্বপ্ন বিকশিত হবে জীবন পরিবর্তনের নব ধারায়, নবরূপে। আর, এরই সাথে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি সাফল্যের শীর্ষ ধারায় পৌঁছে যাবে।
চারপাশের মানুষগুলোকে পরিলক্ষিত করছি প্রতিক্ষণ। ভালো থাকতে চাই এবং ভালো রাখতে চাই চারপাশটাকে। সুন্দর আগামী দিনের অনুপ্রেরণা যোগাতে চাই চারপাশটায়। সবসময় চাই, গাছের চারার পরিচর্যা করতে, যাতে তা ফুল দেয় এবং তার সুবাস ছড়াবে সবখানে, আর তাই, জেগে আছি আজো স্বপ্ন বাস্তবায়নে। আমি চাই না, আমাদের ফুটফুটে ভবিষ্যৎগুলো অমানিশার কালো মেঘে চাপা পড়–ক। চিরায়ত বাংলার সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, কৃষ্টি এসব কিছু জানানো, বুঝানো ও শিখানোর মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিবান, ঐতিহ্যবান ও কৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ হিসেবে তাদের গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ টুকু নিতে হবে সামাজিকভাবে, সরকারীভাবে, আমাকে ও আপনাকে। এই চ্যালেঞ্জ টুকু আমরা নিব নবজাতকের কাছে এটাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*