প্রোগ্রামিং শুরু হোক স্কুল থেকেই

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ২৮ জানুয়ারি ২০১৭, শনিবার: অটোমেশন, কম্পিউটারায়ন ও ডিজিটালাইজেশনের কারণে আমাদের মতো দেশেও প্রযুক্তিবিদ তথা কম্পিউটার প্রোগ্রামারদের চাহিদা বেড়েই চলেছে। বিশ্বের পাশাপাশি আমাদের দেশে এখনো কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের চর্চা বিশ্ববিদ্যালয় ও তদূর্ধ্ব পর্যায়ে সীমিত। কিন্তু বিশ্বের অন্য দেশগুলো এই কার্যক্রমকে স্কুলপর্যায়েও ছড়িয়ে দিচ্ছে। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে একটি দক্ষ জাতি গড়ার জন্য বাংলাদেশেও ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য আইসিটি বিষয় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। লিখেছেন সুমনা শারমিন
পৃথিবীতে মানুষের সাথে মানুষের যোগাযোগের জন্য যেমন অনেক ভাষা আছে, তেমনি কম্পিউটারের জগতেও অনেক ভাষা আছে, যেগুলোকে বলে প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ। যেমন- সিসি প্লাসপ্লাস, জাভা, পাইথন, পিএইচপি ইত্যাদি। এসব ভাষার কোনো একটি বেছে নিয়ে সেই ভাষার নিয়মকানুন মেনে ঠিকমতো কোড লিখলে তৈরি হয়ে যাবে কম্পিউটার প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং একটি যৌক্তিক এবং গাণিতিক কার্যক্রমের সমষ্টি। এই দুটোতে দক্ষতা থাকলেই ভালো প্রোগ্রামার হওয়া যায়। কম্পিউটার প্রোগ্রামিং শেখার জন্য জিনিয়াস হতে হয় না। দরকার হয় নিষ্ঠা, একাগ্রগতা এবং অধ্যবসায়।
কম্পিউটারকে সাধারণত দু’টি অংশে পৃথক করা হয়, হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার। হার্ডওয়্যার হচ্ছে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আর সফটওয়্যার হচ্ছে বিভিন্ন যন্ত্রাংশ চালানোর জন্য লেখা নির্দিষ্ট সঙ্কেত বা কোড। হার্ডওয়্যার কিভাবে কী করবে, সেটি নির্ধারণ করে সফটওয়্যার, যাকে আমরা কম্পিউটার প্রোগ্রামও বলে থাকি। কম্পিউটার প্রোগ্রাম হচ্ছে এক বিশেষ ধরনের ভাষায় লেখা সঙ্কেত, যেগুলো সাজানো থাকে এমনভাবে যাতে করে কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার সহজেই বুঝতে পারে তাকে ঠিক কোন কাজটা কিভাবে করতে হবে।
প্রোগ্রামিং কেন শিখবেন?
কম্পিউটার একটি অসম্ভব ক্ষমতাবান; কিন্তু নির্বোধ একটি যন্ত্র। একটি যন্ত্র ৫০ জন সাধারণ মানুষের কাজ একাই করতে পারে; কিন্তু ৫০টি যন্ত্র একটি অসাধারণ মানুষের কাজ করতে পারে না। প্রোগ্রামিং শিখে আমরা একেকজন হয়ে উঠতে পারি সেই মানুষটি যে এই যন্ত্রকে ইচ্ছামতো কথা শোনাতে পারে। তুমি যা বলবে, সেভাবে কম্পিউটার তাই করবে, এটাই হলো সোজা কথায় প্রোগ্রামিং। প্রোগ্রামিং দারুণ মজার একটি জিনিস! কম্পিউটারের সাথে অন্য যন্ত্রের বড় পার্থক্য হলো এটা দিয়ে কতরকমের কাজ করানো যায় তার সীমা নেই বললে খুব একটা ভুল হবে না। তাই প্রোগ্রামিং জানলে যে কতকিছু করা যায় তার তালিকা করতে বসলে শেষ করা কঠিন। আপনি দিনের পর দিন প্রোগ্রামিং করেও দেখবেন জিনিসটা বোরিং না, প্রায় প্রতিদিনই নতুন মজার কিছু শিখছেন, নতুন নতুন টেকনোলজি আবিষ্কারের সাথে সাথে আরো অনেক রকম কাজ করতে পারবেন। আজ হয়তো জটিল কোনো সমীকরণ সমাধান করার জন্য ফাংশন লিখছেন, কাল এসব ভালো লাগছে না বলে লাল-নীল রঙ দিয়ে একটি অ্যানিমেশন বানাতে বসে গেলেন, আপনার সৃষ্টিশীলতার সবটুকুই কাজে লাগাতে পারবে প্রোগ্রামিংয়ের জগতে।
একটি স্কুল-কলেজ পড়ুয়া ছেলেমেয়ে কম্পিউটার বা মোবাইল দিয়ে কী করে? রাশিয়া-চীনের ছেলেমেয়েরা অনেকেই হয়তো অ্যাসেম্বলিতে কোড লিখে; কিন্তু জরিপ না করেও বলা যায় আমাদের দেশে বেশির ভাগই মুভি দেখা, ফেসবুক, গেমস ছাড়া খুব বেশি কিছু করে না। আসলে কম্পিউটার দিয়ে কী করা যায় তার ধারণাও অনেকের নেই। ছেলে বা মেয়েটিকে প্রোগ্রামিং শিখিয়ে দেয়া হলে তার জগতটাই পাল্টে যাবে। সে তখন সারা দিন গেমস না খেলে হয়তো একটি গেমস বানিয়ে ফেলবে।
প্রোগ্রামিং জানলে আপনি বুঝতে পারবেন কম্পিউটার শুধু বিনোদনের যন্ত্র নয়, কম্পিউটারের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অনেক সৃষ্টিশীল কাজ করা সম্ভব। কম্পিউটারের জগতে অসাধারণ কিছু অগ্রগতি হয়েছে খুব কম বয়সী প্রোগ্রামারদের দিয়ে, বিল গেটস স্কুলে থাকতেই চমকে দেয়ার মতো কিছু প্রোগ্রাম লিখেছিলেন, প্রোগ্রামিং কনটেস্টে হাইরেটেড কোডারদের অনেকেই স্কুল-কলেজ এখনো শেষ করেনি।
বাংলাদেশে প্রোগ্রামিং
২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রোগ্রামিং বিষয়ক সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান ‘আওয়ার অব কোড আয়োজন করা হয়। আওয়ার অব কোড হলো আনন্দের সাথে প্রোগ্রামিং করার কৌশল শিক্ষার্থীদের মধ্যে তুলে ধরার একটি ঘণ্টাব্যাপী কার্যকরী অনুষ্ঠান। বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াডে অংশ নিলেও ধারাবাহিক সাফল্য এখনো পাওয়া যায়নি। যদিও এরই মধ্যে আমাদের শিক্ষার্থীরা রুপা ও ব্রোঞ্জপদক জয় করেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা স্কুল পর্যায়ে প্রোগ্রামিং চালু না থাকাকে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের প্রোগ্রামিংয়ে জনপ্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ কার্যক্রমে আওতায় সারা দেশে প্রচারণা, অনলাইন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, আটটি আঞ্চলিক প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, আঞ্চলিক বিজয়ীদের নিয়ে জাতীয় প্রতিযোগিতা ও জাতীয় প্রোগ্রামিং ক্যাম্প অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই প্রতিযোগিতা সারা দেশের শিক্ষার্থী ও অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। ২০১৫ সালে পাইলট উদ্যোগ সফলভাবে শেষ করার পর ২০১৬ সালে আরো বড় আকারে এই কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের সাথে সঙ্গতি রেখে এই কার্যক্রমকে জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা National High School Programing Contest (NHSPC) হিসেবে অবহিত করা হয়। আমাদের দেশে হাইস্কুল ও কলেজ (ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর) পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংকে জনপ্রিয় করার জন্য তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের উদ্যোগে ২০১৫ সাল থেকে ন্যাশনাল হাইস্কুল প্রোগ্রামিং কনটেস্ট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এই কার্যক্রমে আছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য প্রশিক্ষণ, অনলাইন ও অনসাইট প্রোগ্রামিং ও কুইজ প্রতিযোগিতা এবং প্রোগ্রামিং ক্যাম্প। এই আয়োজনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের তাদের স্কুল জীবন থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি আকৃষ্ট করে তোলা এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় রসদের সন্ধান দেয়া হচ্ছে।
কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের বিভিন্ন বিষয়, প্রয়োগ ও দক্ষতা সম্পর্ক সচেতন করে তোলাসহ এ সংক্রান্ত বিভিন্ন রিসোর্স প্রাপ্তিতে সহায়তা করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের এই বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তোলা হচ্ছে। স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের কম্পিউটার প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার আয়োজনের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কর্মসূচির সাথে এই কার্যক্রমের সম্পৃক্ততা তৈরি করার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। গত বছর জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে নির্বাচিত দু’জন খুদে প্রোগ্রামার রুহান হাবিব ও রুবাব রেদওয়ান রাশিয়ার কাজানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইনফরমেটিক্স অলিম্পিয়াড-২০১৬তে ব্রোঞ্জপদক লাভ করেছে।
এখনই সময় শুরু করার
বিল গেটসের নাম নিশ্চয়ই শুনেছেন, বিশ্ববিখ্যাত কোম্পানি মাইক্রোসফট করপোরেশনের প্রতিষ্ঠাতা। ১৩ বছর বয়সে বিল গেটস তার প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রাম তৈরি করেন, যেটি ছিল টিক-ট্যাক-টো গেম। তারপর তিনি যেই স্কুলে পড়তেন, সেখানে ক্লাস শিডিউল তৈরির সফটওয়্যারও বানিয়ে দেন। ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গও স্কুলে পড়ার সময় প্রোগ্রামিং শেখা শুরু করেন। প্রথমে তার বাবাই ছিলেন তার প্রোগ্রামিং শিক্ষক। স্কুলে যখন তার বন্ধুরা গেম খেলতে ব্যস্ত, সেই সময়টা জাকারবার্গ ব্যস্ত থাকতেন গেম বানানোর কাজে! বিল গেটস যদি সফটওয়্যার তৈরি করেই পৃথিবীর সেরা ধনী হতে পারে, মার্ক জাকারবার্গ যদি ফেসবুক তৈরি করে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষকে যুক্ত করতে পারে, আপনি কেন পারবেন না?

Leave a Reply

%d bloggers like this: