প্রাচীন চট্টগ্রাম ও কিরাত বাংলা প্রসঙ্গ

সোহেল মো. ফখরুদ-দীন: ৬ বছর পূর্বে ৯ জানুয়ারি ২০১০ থেকে প্রাচীন চট্টগ্রামের ইতিহাসের বিলুপ্ত অধ্যায়ের ঐতিহাসিক কিরাত ভূখণ্ড ও কিরাত আদি জাতির ইতিহাসকে স্মরণীয় করে ধরে রাখতে কিরাত বাংলা www.kiratbangla.com নামে ওয়েবসাইট চালু করা হয়েছিল। বিশ্বের সকল বাংলা ভাষাভাষী মানুষকে চট্টগ্রামের ইতিহাস জানা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ উদ্যোগ। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি, চট্টগ্রামের ইতিহাসের স্মরণীয় মনীষী শতবর্ষীয় প্রবীণ বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরীর ১০০তম জন্মবার্ষিকীর দিনে কিরাত বাংলার সূচনা হয়। তাঁর হাতে কিরাত বাংলার মোড়ক উন্মোচন হয়। এই সময়ে অন্যান্যের মধ্যে ঐদিন উপস্থিত ছিলেন বিপ্লবী বিনোদ বিহারী চৌধুরী (বর্তমানে প্রয়াত),Kirat Bangla ভাষাসৈনিক, প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ মোহাম্মদ হোসেন খান (বর্তমানে প্রয়াত), সমাজকর্মী আলহাজ্ব জানে আলম (বর্তমানে প্রয়াত), কালাম চৌধুরী, কবি আশিষ সেন, ছড়াকার সৈয়দ কফিল উদ্দীন ও কিরাত বাংলার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক সোহেল মো. ফখরুদ-দীন উপস্থিত থেকে মোমিন রোডস্থ বিনোদ বিহারীর বিপ্লবী কুটির থেকে যাত্রা শুরু হয়। প্রথমে ওয়েবসাইট মাধ্যমে শুরু হলেও পরবর্তীতে এটি কাগজে ছেপে বই আকারে প্রকাশনা শুরু হয়। বর্তমানে ৬ বছর ধরে অনিয়মিতভাবে চলছে। হারানো চট্টগ্রামের গৌরব ও ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে এই প্রয়াস ধারাবাহিকভাবে চলছে।
কিরাত প্রাচীন বাংলার সমৃদ্ধ এক জনপদ। কিরাত অঞ্চলের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় সংস্কৃত মহাকাব্য রামায়ণে। বাল্মিকী আদি কবি এবং রামায়ণ আদি মহাকাব্য এ প্রসিদ্ধি আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৪০০-২০০ অব্দে এ মহাকাব্য রচিত হয়েছিল বলে সাধারণভাবে মনে করা হয়। কিস্কিন্ধ্যাকান্ডে ‘সীতা অন্বেষণের উদযোগ’ পর্বাধ্যায়ে কিরাত অঞ্চলের ঐ উল্লেখ পাওয়া যায়। রামায়ণের বর্ণনায় কিরাতকে একটি জনগোষ্ঠী হিসেবেও দেখা যায় (যারা দ্বীপবাসী, হেমবর্ণ, সুদর্শন এবং কাঁচা মাছ খায়)। কিন্তু মহাভারতে কিরাতকে একটি ভূখণ্ড হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিরাত নামক ঐ অঞ্চলের রাজা ছিলেন তখন রাজা পৌন্ড্রক বাসুদেব। তিনি একই সাথে বঙ্গ এবং পুণ্ড্রেরও রাজা ছিলেন। কিরাত জনগোষ্ঠী- ভূখণ্ড? পণ্ডিত, ইতিহাস গবেষক ও বিশারদ আবদুল হক চৌধুরী মহাভারতীয় ‘কিরাত’ অঞ্চলকে চট্টগ্রাম ভূখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি কিংবদন্তির সূত্রে উল্লেখ করেন যে, “মহাভারতীয় যুগে চট্টগ্রাম বলির পুত্র সুহ্মর রাজ্য সুহ্মদেশের অন্তর্গত ছিল। অতপর কর্ণের পুত্র বিকর্ণ চট্টগ্রামে রাজত্ব করেন। (তথ্যসূত্র: কিরাত গ্রন্থ, ১৯৯৬, আবদুস সালাম মামুন)।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ইতিহাসের সন্ধান পাওয়া যায় পার্গিটা রচিত ভারতীয় দেশসমূহের মানচিত্রে। এই মানচিত্রে দক্ষিণে সাগর নোপের অবস্থান চিহ্নিত আছে। তাঁর মানচিত্রে কিরাত, সিরোট, শ্রীক্ষেত্র প্রভৃতি স্থানের নাম উল্লেখ করা আছে। পার্গিটা কিরাত সম্পর্কে বলেছেন, it (Kiratades, the term kirata) was applied to tribes inhabiting the Himalaya range and its southern slopes from the Punjub to Assam and Chittagong. কিরাতের Lessen বলেন, By the name Kirrada, Plolemy designates the land on the coast of further India from the city of Pentapolis, perhaps the present Miskanseri (Mirsarai) in the north, as far as the mouth of the Tokasanna or Arakan rivers. Mc Crindle বলেন,By the cirradioi are meant the Kirata a race spread along the mouths of the Ganges as far as Arakan. কিরাত এ বসবাসকারী লোকজন অনার্য; বিশেষ করে মঙ্গোলীয় বা অস্ট্রোমঙ্গোলীয় জনগোষ্ঠীর লোক ছিলেন, যারা উত্তর-পূর্ব ভারতের পাহাড়ি ঢল থেকে আগত। ড. এস কে চ্যাটার্জি চট্টগ্রাম আরাকান অঞ্চলকে প্রাচীন কিরাত বলে অভিহিত করেছেন। কিরাতের অবস্থান নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। তা সত্ত্বেও উল্লিখিত মতগুলি অনুসরণ করলে এটা নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, প্রাচীন চট্টগ্রামের অবস্থান প্রাচীন কিরাতের মধ্যেই নিহিত ছিল।
কথায় আছে যার অতীত নাই তার বর্তমান নাই, যার বর্তমান নাই তার ভবিষ্যত নাই। ব্যক্তিক বিবেচনায় কথাটা যত না সত্য, তার চেয়ে অধিক মূল্যবান দেশ, জাতি, সম্প্রদায়ের আত্মপরিচয়, উন্নতি ও বিকাশের দৃষ্টিকোন থেকে। তাই কোন উন্নত সাহিত্য সংস্কৃতিকে বর্তমান ও অতীতের সেতুবন্ধন রচনায় সতত প্রবৃত্ত হতে হয়। বর্তমান হচ্ছে যুগের সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার। আর অতীত হচ্ছে সে শ্রেষ্ঠত্বের দাবিকে উচ্চকিত করার শান বাঁধানো সোপান।
আমরা যতই উপরের দিকে প্রলম্বিত হচ্ছি, ততই আমাদের শক্ত মাটির আবরণ ভেদ করে শেকড়ের গভীরে যেতে হচ্ছে। আজ থেকে হাজার হাজার বছর আগে এতদোঞ্চলে কারা বাস করতো, কি ছিল তাদের ভাষা, কেমন ছিলো তাদের জীবন যাত্রা? ইতিহাসের ভাঙ্গাগড়ার দীর্ঘ জটিল প্রক্রিয়ায় কিরাতের ইতিহাস আজ অবশিষ্ট নাই। কিন্তু আমাদের ভাষা সংস্কৃতি, জীবন, আচার অভ্যাসে এখনও তার চিহ্ন মুছে যায়নি। মূলত আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্যের সম্পর্ক নূতন প্রজন্মকে সচেতন করে তোলা ও বিবর্তনের ধারায় নতুন পৃথিবীকে আলিঙ্গন করার মহান ব্রত নিয়ে আমরা কিরাত বাংলা প্রকাশ করছি। কিরাত কি জনগোষ্ঠী না ভূখণ্ড তা নিয়ে গবেষকদের মতবিরোধ থাকলেও আমাদের দৃষ্টিতে কিরাত ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ হিসেবে চিহ্নিত। চট্টগ্রামের ইতিহাস ও নামের সাথে কিরাতের সম্পর্ক গভীর। কিরাতকে নিয়ে ইতিহাস গবেষণা ও পণ্ডিতদের প্রজ্ঞাময় লেখনিতে বের হবে সোনালী ইতিহাস। কিরাত চট্টগ্রামসহ বাঙালির ইতিহাস বহন করবে নিয়মিতভাবে। বিশ্বে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে সহজে পৌঁছাবে আমাদের ইতিহাস। আমরা বাংলা ভাষাভাষাী বিশ্বের সকল মানুষের সুন্দর পরামর্শ কামনা করছি। কিরাতসহ চট্টগ্রাম এবং বাংলার প্রাচীন ইতিহাসে এ চট্টগ্রামের নামের পরিবর্তন হয়েছে হাজার হাজার বছর ধরে ৩৭ বার। যথাক্রমে- আদর্শদেশ, সুহ্মদেশ, ক্লীং বা কালেন, রম্যভূমি, চিতাগাঁও, চিৎগাঁও, চট্টল, চৈত্যগ্রাম, সপ্তগ্রাম, চট্টলা, চট্টগ্রাম, চক্রশালা, চন্দ্রনাথ, চরতল, চিতাগঞ্জ, চাটীগাঁ, শ্রীচট্টল, সাতগাঁও, সীতাগঙ্গা (সীতাগাঙ্গ), সতের কাউন, পুষ্পপুর, রামেশ, কর্ণবুল, সহরেসবুজ, পার্ব্বতী, খোর্দ্দ-আবাদ, Porto grando (বৃহৎ বন্দর), ফতেয়াবাদ, আনক, রোশাং, ইসলামাবাদ, মগরাজ্য, Chittangon, কিরাত, যতরকুল, চক্রশা, কেলিশহর, পেন্টপোলিস।
লেখক: সভাপতি, চট্টগ্রাম ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র। ই-মেইল: chrc1994@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*