প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত : রোহিঙ্গারা ক্যাম্প ছেড়ে ছড়িয়ে পড়ছে দেশব্যাপী

অজিত কুমার দাশ হিমু, কক্সবাজার : কক্সবাজার জেলার বিভিন্ন ক্যাম্পেrahinga অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরনার্থীরা দেশব্যাপী ছড়ি যাচ্ছে। এসব রোহিঙ্গা শরনার্থীদের নিয়ে মিয়ানমার-বাংলাদেশের কুটনৈতিক টানাপোড়নের ফলে সীমান্তবর্তী উখিয়া-টেকনাফের দু’রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে নিবন্ধনকৃত ও বিভিন্ন বস্তিতে অবৈধ ভাবে অবস্থানরত ২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গারা যে যেদিকে পারচ্ছে পালিয়ে যাচ্ছে। ক্যাম্পে কোন নিয়ন্ত্রন না থাকার কারনে রোহিঙ্গাদের অনেকেই স্থায়ী বসবাস করার মন-মানষিকতা নিয়ে বস্তি ছেড়ে দেশব্যাপী বিভিন্ন শহর ও গ্রাম-গঞ্জে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে বলে জানা গেছে। নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা এসব রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে সঠিক তথ্য উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ক্যাম্প কর্তৃপক্ষ। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার জেলার সীমান্ত উপজেলা উখিয়া-টেকনাফের দু’ রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে প্রায় ২৮ হাজার ৮৩১ জন নিবন্ধনকৃত রোহিঙ্গার অবস্থান। ওই দু’ক্যাম্পের আশপাশে অবৈধ ভাবে আরো কয়েকটি বস্তিগড়ে ঝুপড়িতে অবস্থান নিয়েছে প্রায় দেড়লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। ওই সব রোহিঙ্গারা এখন স্থানীয় এনজিও সংস্থাগুলোর সহায়তায় বহাল তবিয়তে ক্যাম্প এলাকায় বসবাস করলেও এদেশে স্থায়ী হওয়ার জন্য দালালের সহায়তায় দেশব্যাপী শহর ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাচ্ছে। কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তিতে অবস্থানকারী জাফর আলম জানান, ১৪০৪ সাল থেকে ১৬৩৭ সাল পর্যন্ত আরকান রাজ্য শাসন করে আসছিল মুসলমানেরা। ১৯৪৭ সালে অংসান প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন সময়ে মুসলমানের পক্ষ হয়ে সংসদে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আব্দুর রাজ্জাক। মিয়ানমার সরকার কেন জানি না আমাদের সে দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করছে না। তাই আমরা এখন আর কোন অবস্থাতেই মিয়ানমারে ফিরে যাব না। বাংলাদেশই আমাদের স্থায়ী ঠিকানা। এদিকে মিয়ানমারে ফিরে না যেতে স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিও রোহিঙ্গাদের সাহায্য সহযোগিতা বাড়িয়ে দিয়েছে। কিছু কিছু এনজিও আন-রেজিষ্টার্ড রোহিঙ্গাদের জন্য প্রসাশনের অগোচরে কোটি কোটি টাকার সেড নির্মান করে যাচ্ছে। তাছাড়া এসব রোহিঙ্গাদের মাঝে নগদ টাকা বিতরন করার অভিযোগ রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক কয়েকটি এনজিওর বিরুদ্ধে। এসব কারনে মিয়ানমার থেকে সীমান্ত পথে নতুন নতুন রোহিঙ্গা এদেশে অনুপ্রবেশ করতে উৎসাহিত হচ্ছে। পাশাপাশি পুরাতন আসা রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করার লক্ষ্যে ঢাকা, চট্রগ্রাম, কক্সবাজার সহ বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে পড়ছে। রোহিঙ্গাদের নিয়ন্ত্রন করার জন্য ক্যাম্প পুলিশ নিয়োজিত থাকলেও অর্থের বিনিয়মে পুলিশের সদস্যরাও রোহিঙ্গাদের বাইরে যাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। জানা গেছে, তৎকালীন ৮০দশকে সামরিক সরকারের আমলে এদেশে রোহিঙ্গাদের আগমন ঘটে। নাইক্ষ্যংছড়ি, রামু, উখিয়া-টেকনাফ সীমান্ত অতিক্রম করে এসময় প্রায় ২লক্ষাধিক রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে সরকারের প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহন করে। পরবর্তীতে দু’দেশের সফল কুটনীতিক তৎপরাতায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। অতি অল্প সময়ে প্রায় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যেতে সক্ষম হলেও বাদবাকী রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের জেলার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। দ্বিতীয় দফায় ১৯৯১ সালে সীমান্তের নাফ নদী অতিক্রম করে প্রায় ২ লক্ষ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন রোহিঙ্গা উখিয়া-টেকনাফ, রামু ও নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন শরাণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করে। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার মিয়ানমার সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যায়ে দফায় দফায় বৈঠক করে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করে। ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ২ লক্ষ ৩৬ হাজার ৫৯৯ জন রোহিঙ্গাকে ফেরৎ পাঠানো হলেও টেকনাফের নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে ১ হাজার ৭৭৫ পরিবারের ১৪ হাজার ৪৩১জন রোহিঙ্গা এবং উখিয়া কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের ১ হাজার ১৯৪ পরিবারে ৯ হাজার ৮৫০ জন সহ প্রায় ২৮ হাজার রোহিঙ্গা দুই ক্যাম্পে অবস্থান করে। ২০০৪ সালে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়। যা এখনো পর্যন্ত বিদ্যমান রয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেয়া এসব শিশু কিশোর যুবকরা বর্তমানে বাংলাদেশের নাগরিক দাবী করে বলে বেড়াচ্ছে। রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে ত্রান সামগ্রী বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত কতিপয় এনজিওর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তাদের উৎসাহিত করার কারণে এ দেশে জন্ম নেয়া উঠতি বয়সের রোহিঙ্গা যুব-যুবতীরা প্রকাশ্য প্রত্যাবাসন বিরোধী কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ছে। ককক্সবাজারস্থ ১৭ বিজিবির অধিনায়ক লেঃ কর্নেল সাইফুল আলম খন্দকার জানান, মিয়ানমার সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে অবৈধ ভাবে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের প্রতিদিনই পুশব্যাক করা হচ্ছে। তবুও রোহঙ্গা প্রবেশ টেকানো যাচ্ছে না। কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জ সরওয়ার কামাল বলেন, ক্যাম্প অবস্থানকারী রেজিষ্টার্ড রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে অবস্থান করার সুযোগ নেই। বহিরাগত রোহিঙ্গারা যাতে বস্তি ছেড়ে কোথাও যেতে না পারে সে ব্যাপারে তাদের উপর কড়া নজর রাখার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এদিকে অনুবেশকারী রোহিঙ্গা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার খবরে শংখিত হয়ে পড়েছে জেলার সচেতন মানুষেরা। তারা মনে করেন, এইভাবে রোহিঙ্গারা দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়লে, বিঘিœত হবে আইনশৃংখলা। বৃদ্ধিপাবে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই সহ অপরাধ মূলক কর্মকান্ড।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*