পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ কোটি লোক হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত

ডা. মামুন-আল-মাহতাব (স্বপ্নীল), ২৮ জুলাই ২০১৭, শুক্রবার: ১৯৬৫ সালে একজন অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীর রক্তে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আবিষ্কৃত হয়। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় ৩৫ কোটি লোক হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত। রক্ত আর স্ত্রী সহবাসের মাধ্যমে এ ভাইরাসটি ছড়ায়। হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তমাখা সুঁচের খোঁচায় ভাইরাসটি সংক্রমণের আশঙ্কা শতকরা ৩০ ভাগ। আর হেপাটাইটিস বি ভাইরাস আক্রান্ত মায়ের সন্তানের জন্মের পরপর আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় ৯০ ভাগ, তবে মায়ের দুধের মাধ্যমে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ছড়ায় না। সামাজিক মেলামেশা যেমন হ্যান্ডশেক বা কোলাকুলি এবং রোগীর ব্যবহার্য সামগ্রী যেমন গ্লাস, চশমা, তোয়ালে, জামা-কাপড় ইত্যাদির মাধ্যমেও এ রোগ ছড়ায় না।
বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত। এদের মধ্যে প্রায় ৮০ লাখ থেকে এক কোটি লোক ক্রনিক হেপাটাইটিস বি-তে আক্রান্ত, আর তাদের বেশির ভাগই জীবনের কোনো এক পর্যায়ে লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মত মারাত্মক রোগের ঝুঁকিতে আছেন। পাশাপাশি হেপাটাইটিস বি রোগীরা ভাইরাসটির রিজার্ভার হিসেবে থেকে যান। তাদের কাছ থেকে যে কোনো সুস্থ্য লোকের এই ভাইরাসে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি থাকে এবং বাংলাদেশে প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ নতুন করে হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে সংক্রমিত হচ্ছেন। নারী, গর্ভবতী মা এবং নবজাতক শিশুদের বেলায় হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের ঝুঁকি অনেক বেশি।
বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ থেকে এক কোটি মানুষ হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের সারফেস এন্টিজেন পজিটিভ হওয়ায় তারা মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, এমনকি কখনো কখনো নিজ দেশেও, চাকরির সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। আর সবচাইতে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো এদেশে প্রায় ২৫ হাজার লোক প্রতি বছর হেপাটাইটিস বি ভাইরাসজনিত লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত এদেশের ১০ শতাংশ লোকের চিকিৎসা ব্যয় প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ এক কথায় হেপাটাইটিস বি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে একটি বড় সমস্যা।
হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত প্রায় ৭০ ভাগ রোগীর জন্ডিসে আক্রান্ত হওয়ার কোনো ইতিহাস থাকে না । শতকরা ১০ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি আর প্রায় ৯০ ভাগ শিশু যারা এ ভাইরাসে আক্রান্ত হন, তাদের লিভারে স্থায়ী ইনফেকশন দেখা দেয়। একে আমরা বলে থাকি ক্রনিক হেপাটাইটিস বি। এ ধরনের রোগীদের প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না । এরা কখনো কখনো পেটের ডান পাশে উপরের দিকে ব্যথা, দুর্বলতা কিংবা ক্ষুধামন্দার কথা বলে থাকেন । অধিকায়শ ক্ষেত্রেই বিদেশে যাওয়ার সময় রক্ত পরীক্ষা করতে যেয়ে কিংবা রক্ত দিতে অথবা ভ্যাকসিন নিতে গিয়ে রোগীরা তাদের হেপাটাইটিস বি ইনফেকশনের কথা জানতে পারেন।
ক্রনিক হেপাটাইটিস বি এশিয়া ও প্রশান্ত-মহাসাগরীয় আরো অনেক দেশের মতোই বাংলাদেশেও লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের প্রধান কারণ। দুর্ভাগ্যের বিষয় হেপাটাইটিস বি অনেকাংশেই নিরাময়যোগ্য একটি রোগ হলেও, এডভান্সড লিভার সিরোসিস অথবা লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত না হওয়া পর্যন্ত রোগীরা প্রায়ই কোনো শারীরিক অসুবিধা অনুভব করেন না। ফলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই রোগ ধরা পরার পর হেপাটাইটিস বি ভাইরাস ইনফেকশনের চিকিৎসা করা সম্ভব হলেও রোগীকে আর সেভাবে সাহায্য করা সম্ভব হয় না।
বর্তমানে বিশ্ববাজারে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য কার্যকর ভ্যাকসিন রয়েছে। বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের ভ্যাকসিন, কিন্তু হেপাটাইটিস বি-র চিকিৎসায় এসব ভ্যাকসিনের কোনো ভূমিকা নেই। হেপাটাইটিস বি ভাইরাসে আক্রান্ত মায়ের সন্তান, হেপাটাইটিস বি রোগীর স্বামী বা স্ত্রী, স্বাস্থ্য কর্মী এবং থেলাসেমিয়া ও অন্যান্য হেমোলাইটিক এনিমিয়ার রোগীদের জন্য হেপাটাইটিস বি -এর ভ্যাকসিন নেয়া অত্যন্ত জরুরি। আর বাংলাদেশের মত দেশে, যেখানে হেপাটাইটিস বি সংক্রমণের হার যথেষ্টই বেশি, সেখানে প্রত্যেক নাগরিকেরই উচিত হেপাটাইটিস বি’র ভ্যাকসিন নিয়ে নেয়া। তবে ভ্যাকসিনটি নিতে হবে কোনো ভাল জায়গা থেকে, কারণ ঠিকমত সংরক্ষণ করা না হলে এই ভ্যাকসিন কোনো উপকারেই আসে না।
এতসব কিছুর মাঝেও সুসংবাদ এই যে, হেপাটাইটিস বি আজ আর কোনো দূরারোগ্য ব্যাধি নয়। লিভার সিরোসিস বা লিভার ক্যান্সারের মতো মারাত্মক রোগ দেখা দেয়ার আগে এটি ধরা গেলে রোগাক্রান্ত ব্যক্তির নিরাময়ের সম্ভাবনা উজ্জ্বল। পৃথীবিতে আজ এই ভাইরাসটির জন্য বেশ কয়েকটি ওষুধ রয়েছে যার সবগুলোই বাংলাদেশেও সহজলভ্য। এসবের মধ্যে পেগাইলেটেড ইন্টারফেরন, এন্টেকাভির ও টেনোফোভির উল্লেখযোগ্য। আরো সুসংবাদ এই যে আমাদের দেশীয় একাধিক ওষুধ কোম্পানি এগুলো এদেশেই তৈরি করছে।
তবে চিকিৎসায় প্রত্যাশিত ফলাফল প্রাপ্তি নির্ভর করে সঠিক সময়ে সঠিক ওষুধ প্রয়োগের উপর। হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত কোনো রোগীকে হেপাটাইটিস বি -এর যে কোনো ওষুধ দিয়ে দিলেই কাজ হয়ে যাবে এমনটা প্রত্যাশা করা উচিত নয়। এজন্য অনেক সময় লিভার বায়োপসি করেও সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ ওষুধ নির্বাচনে কিংবা প্রয়োগে এতটুকু হের-ফের হলেও তাতে ভাইরাল রেজিস্টেন্স তৈরির পাশাপাশি রোগীর লিভারে বড় ক্ষতির আশঙ্কা থাকে ।
এই প্রেক্ষাপটে আমি, জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি লিভার বিশেষজ্ঞ ডা. শেখ মোহাম্মদ ফজলে আকবরের সঙ্গে যৌথভাবে হেপাটাইটিস বি রোগের চিকিৎসায় ‘ন্যাসভ্যাক’ নামে একটি নতুন ওষুধ নিয়ে গবেষণা করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছি। ২০০৯ সালে আমরা বাংলাদেশে ১৮ জন ক্রনিক হেপাটাটিস বি রোগীর উপর ‘ন্যাসভ্যাক’-এর একটি সেফটি ও এফিকেসি ফেজ-১ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল পরিচালনা করি। আমাদের গবেষণালব্ধ ফলাফল এশীয়-প্রশান্ত মহাসাগরীয় লিভার অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক প্রকাশিত, পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষস্থানীয় লিভার বিষয়ক জার্নাল ‘হেপাটোলজি ইন্টারন্যাশনাল’ এ ইতোমধ্যেই প্রকাশিত হয়েছে।
এই সাফল্যের পর ২০১১ সাল থেকে আমি ও ডা. আকবর বাংলাদেশে ‘ন্যাসভ্যাক’এর আরেকটি ফেজ-৩ ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল করি। এই ট্রায়ালে ১৫১ জন ক্রনিক হেপাটাইটিস বি রোগীকে র‌্যান্ডোমাইজেশনের মাধ্যমে দুই গ্রুপে ভাগ করে, তাদেরকে যথাক্রমে ‘ন্যাসভ্যাক’ ও পেগাইলেটেড ইন্টারফেরনের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়।
উল্লেখ্য এই ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ ও ইউনাইটেড স্টেটস ফেডারেল ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন এবং বাংলাদেশের ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কর্তৃক অনুমোদিত। এই ট্রায়ালটির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশ মেডিকেল রিসার্চ কাউন্সিল থেকে ইথিক্যাল এপ্রুভালও নেয়া হয়েছিল।
এই ট্রায়ালে ‘ন্যাসভ্যাক’ তুলনামূলক বিচারে পেগাইলেটেড ইন্টারফেরনের চেয়ে অধিকতর নিরাপদ প্রমাণিত হয়। ‘ন্যাসভ্যাক’ গ্রহনকারী রোগীদের ভেতর কোনো ধরনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায় নাই। এছাড়াও লিভারের প্রদাহ নিরাময়েও ‘ন্যাসভ্যাক’ পেগাইলেটেড ইন্টারফেরনের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর। উল্লেখ্য লিভারের প্রদাহই লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের মূল কারণ। এই ফেজ-৩ ট্রায়ালটি ২০১৩ সালে পৃথিবীতে লিভার বিশেষজ্ঞদের সর্বোচ্চ বৈজ্ঞানিক কনফারেন্স হিসেবে স্বীকৃত, আমেরিকান লিভার মিটিং-এ ‘প্রেসিডেন্সিয়াল ডিস্টিংশন’ লাভ করে।
‘ন্যাসভ্যাক’এরই মধ্যে কিউবা, নিকারাগুয়া ও অ্যাঙ্গোলায় রেজিস্ট্রেশন পেয়েছে যা বাংলাদেশি গবেষকদের জন্য এধরনের প্রথম কৃতিত্ব। বাংলাদেশে ‘ন্যাসভ্যাক’এর রেজিস্ট্রেশনের বিষয়টি বর্তমানে সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের বিবেচনাধীন।
হেপাটাইটিস বি আক্রান্ত ব্যক্তিরদের জন্য সামনে আছে আশাব্যঞ্জক অনেক কিছুই । তাই তাদের উচিত হতাশ না হয়ে লিভার রোগ বিশেষজ্ঞের শরনাপন্ন হওয়া। পাশাপাশি হেপাটাইটিস বি জনিত লিভার রোগ প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় প্রয়োজন আরো বেশি সচেতনতার। লেখক-সহযোগী অধ্যাপক, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

%d bloggers like this: