পাবনায় বড় দুই দল সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে ব্যস্ত

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০৪ জুলাই ২০১৭, মঙ্গলবার: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে পাবনা জেলার ৯ উপজেলা ও পাঁচটি সংসদীয় আসনে দলীয় গ্রুপিং ও কোন্দল কমিয়ে সাংগঠনিক ভিত্তি মজবুত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বড় দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির জেলা পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতারা। তৃণমূল পর্যায়ে নেতাকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে বিভিন্ন সাংগঠনিক এলাকায় বর্ধিত সভাসহ নানা কর্মসূচি আয়োজন করছেন তাঁরা। এরই মধ্যে জেলার প্রায় সব উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন পর্যায়ে দলের কাউন্সিল সম্পন্ন করেছেন। তা সত্ত্বেও বেশ কয়েকটি উপজেলায় উভয় দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েই গেছে। এর জের ধরে প্রায়ই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়ে জেলার রাজনৈতিক অঙ্গনে।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে পাবনা-১ (সাঁথিয়া ও বেড়ার আংশিক) আসনে নির্বাচন করে জয়ী হন শামসুল হক টুকু। বাকি চার আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
বিগত বছরগুলোতে জেলার ৯ উপজেলার সব কটিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির এবং তাদের অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে তীব্র অভ্যন্তরীণ কোন্দল থাকলেও সম্প্রতি তা অনেকটাই কমিয়ে এনেছেন নেতারা। তবে ঈশ্বরদী, সাঁথিয়া, ভাঙ্গুড়াসহ কয়েকটি উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে এখনো বিরোধ রয়েই গেছে। মাঝেমধ্যেই হামলা, সংঘাত, মামলা চলছেই। সর্বশেষ গত ১৮ মে ঈশ্বরদীতে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি জুবায়ের বিশ্বাসসহ কয়েকজন নেতাকর্মীর বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতাকর্মীরা হামলা-ভাঙচুর করেছে। এ ঘটনায় পুলিশ উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ও ভূমিমন্ত্রীর ছেলে শিরহান শরীফ তমালসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করে। এর আগে আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গসংগঠনের মধ্যে কোন্দলে ঈশ্বরদীতে আলম নামের এক যুবলীগকর্মী নিহত হন।
একই অবস্থা চলছে ভাঙ্গুড়া উপজেলায়। সেখানে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চলছে বর্তমান সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান বাকী বিল্লাহর নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ঘিরে। দুই গ্রুপের নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের জেরে মাস দুয়েক আগে ভাঙ্গুড়া উপজেলা যুবলীগের সম্মেলন পণ্ড হয়ে যায়।

এ ছাড়া বেড়ায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের নেতাকর্মীদের বিরোধ, সাঁথিয়ায় পৌর মেয়র মিরাজুল ইসলাম মিরাজ ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তপন হায়দার সানের নেতাকর্মীদের গ্রুপিং এবং আটঘরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম রতন ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুর গফুর গ্রুপের মধ্যে বিরোধের জেরে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে অনেকটাই।
পাবনা সদর, চাটমোহর, ফরিদপুর ও সুজানগর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে প্রকাশ্যে কোনো গ্রুপিং না থাকলেও তাঁদের ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্বের জেরে কখনো কখনো নেতাকর্মী ও সমর্থকরা অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িয়ে পড়ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জেলার প্রবীণ এক আওয়ামী লীগ নেতা জানান, দলীয় পদ-পদবি, মনোনয়ন, বালুমহাল, হাটবাজার ইজারা, ঠিকাদারি, নিয়োগসহ বিভিন্ন ইস্যুতে আধিপত্য বিস্তার ও সুবিধাপ্রাপ্তিকে কেন্দ্র করে দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশ গ্রুপিংয়ে জড়িয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ এসব গ্রুপিংকে প্রশ্রয় দেওয়ায় দলের সাংগঠনিক ভিত্তি অনেকটা অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিককালে পাবনা জেলায় আওয়ামী লীগের অবস্থা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো।
এ বিষয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ও পাবনা জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান রেজাউল রহিম লাল জানান, বড় দল হিসেবে পাবনা জেলা আওয়ামী লীগেও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা আছে। ফলে কোথাও কোথাও অতি-উৎসাহী কোনো নেতার কর্মী-সমর্থকরা বিচ্ছিন্ন ঘটনাও ঘটিয়ে ফেলতে পারে। আগামী সংসদ নির্বাচনে দলীয় সভানেত্রী যে আসনে যাঁকে মনোনয়ন দেবেন সবাই একত্রিত হয়ে তাঁর জন্যই কাজ করবেন। এ কারণেই নির্বাচনের আগেই এসব দ্বন্দ্ব বা বিভেদ মিটে যাবে।
আবার সদরসহ ৯ উপজেলায় বিএনপির কার্যক্রম চলছে অনেকটাই রুটিন ওয়ার্কের মতো। বিভিন্ন উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌর কাউন্সিলে প্রার্থিতা; ইউপি ও পৌর নির্বাচনে মনোনয়ন ইত্যাদি নিয়ে অধিকাংশ উপজেলায় নেতাকর্মীদের মধ্যে মতানৈক্য এবং ক্ষেত্রবিশেষে দ্বন্দ্ব চলছে দীর্ঘদিন ধরে। স্থানীয়রা জানায়, গ্রুপিংয়ের জেরে চাটমোহর উপজেলায় জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীর কর্মসূচি পৃথকভাবে পালন করেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। চাটমোহরে বিএনপির উপজেলা সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য কে এম আনোয়ারুল ইসলাম এবং উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা গ্রুপের নেতাকর্মীরা কোন্দলের কারণে দলীয় সব কর্মসূচি পালন করছে নিজেদের এলাকায়, পৃথকভাবে। আনোয়ার গ্রুপ পাঠানপাড়ায় কে এম আনোয়ারুল ইসলামের বাসভবনে এবং হীরা গ্রুপ আফ্রাতপাড়ায় হাসাদুল ইসলাম হীরার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সেন্ট্রি সিকিউরিটিজে কর্মসূচি পালন করছে।
জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান তোতা জানান, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো স্থানে নেতাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। চাটমোহর ও সুজানগরে এই বিভেদ বেশি স্বীকার করে তিনি জানান, কেন্দ্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী এক মাসের মধ্যে জেলা বিএনপির সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনের আগে এসব বিভেদ নিরসন করা সম্ভব হবে।
একই অবস্থা জাতীয় পার্টিতেও। জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মকবুল হোসেন সন্টু ও সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের খান কদর গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্বে দলের কার্যক্রমে স্থবিরতা বিরাজ করছে। থেমে থেমে চলছে পাবনা জেলা জাতীয় পার্টির কার্যক্রম।
জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য মকবুল হোসেন জানান, ‘আমাদের সব জায়গাতেই সংগঠন আছে, কিন্তু কার্যক্রম না থাকায় একটু দুর্বল অবস্থানেই আছি। ’
সম্ভাব্য প্রার্থীদের আনাগোনা শুরু : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি নতুন-পুরনো বেশ কিছু মুখ ইতিমধ্যে তাঁদের নির্বাচনী এলাকায় আনাগোনা শুরু করেছেন। অনেকেই পোস্টার-ব্যানার বা লিফলেটে প্রাথমিক প্রচারও শুরু করেছেন। সমর্থকরাও তাদের পছন্দের প্রার্থীদের পক্ষে কথা বলা শুরু করেছে। তবে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকলেও নতুন মুখের অনেককে গত পাঁচ বছরে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী বা সাধারণ মানুষের কাতারে কখনো দেখা যায়নি।
পাবনা-১ : আওয়ামী লীগ থেকে এ আসনে বর্তমান এমপি ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মির্জা আব্দুল জলিল, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপক আবু সাইয়িদ, সাথিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নিজামউদ্দিন প্রমুখের নাম শোনা যাচ্ছে।

এ আসনে বিএনপি থেকে মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের, জামায়াতের সাবেক আমির মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেনের নাম শোনা যাচ্ছে।
পাবনা-২ (সুজানগর ও বেড়ার আংশিক) : এ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান এমপি আজিজুল হক আরজু, রাকসুর সাবেক জিএস জাহাঙ্গীর কবীর রানা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আহমেদ ফিরোজ কবীর, সাবেক সচিব ড. মজিবুর রহমান; বিএনপি থেকে সাবেক এমপি সেলিম রেজা হাবিব, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান জাফির তুহিন, জেলা বিএনপি সভাপতি মেজর (অব.) কে এস মাহমুদের নাম শোনা যাচ্ছে।
জাতীয় পার্টির ক্ষেত্রে জেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি মকবুল হোসেন সন্টুর নাম শোনা যাচ্ছে।
পাবনা-৩ (চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া ও ফরিদপুর) : আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান এমপি মকবুল হোসেন, জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আব্দুল হামিদ মাস্টার, জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আব্দুর রহিম পাকন, কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুল আলীম, মো. আতিকুর রহমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন সাখো, বিএমএর জেলা সভাপতি ডা. গোলজার হোসেন; বিএনপি থেকে সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা, পাবনা জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ খন্দকার, গ্রুপ ক্যাপ্টেন (অব.) সাইফুল আযম সুজা, ফরিদপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি জহুরুল ইসলাম বকুলের নাম মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া) : আওয়ামী লীগ থেকে বর্তমান এমপি ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফের পাশাপাশি তাঁর মেয়ের জামাই ঈশ্বরদী পৌর মেয়র আবুল কালাম আজাদ মিন্টু, সাবেক সংসদ সদস্য পাঞ্জাব আলী বিশ্বাস, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটন, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী রবিউল আলম বুদু; বিএনপি থেকে সাবেক এমপি সিরাজুল ইসলাম সরদার, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব, সাবেক পৌর মেয়র মোখলেসুর রহমান বাবলু ও জাকারিয়া পিন্টুর নাম মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
পাবনা-৫ (সদর) : এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্স, আওয়ামী লীগ নেতা হাসান কবির আরিফ ও দুদকের সাবেক কমিশনার সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর নাম শোনা যাচ্ছে।
বিএনপি থেকে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার হাবিবুর রহমান তোতা, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা মওলানা আব্দুস সোবহানের ছেলে নেসার উদ্দিন নান্নু; জাতীয় পার্টি থেকে জেলা জাপার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের খান কদর মনোনয়ন প্রত্যাশা করতে পারেন বলে দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এর বাইরে পাবনা পৌর মেয়র কামরুল হাসান মিন্টুর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে। কালের কণ্ঠ

Leave a Reply

%d bloggers like this: