নাসিক নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছে প্রধান দুই রাজনৈতিক দল

নিউজগার্ডেন ডেস্ক, ০৪ ডিসেম্বর, রবিবার: দেশে প্রথমবারের মতো দলীয় মনোনয়ন ও প্রতীকে হতে যাওয়া নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন (নাসিক) নির্বাচনকে মর্যাদার লড়াই হিসেবে দেখছে প্রধান দুই রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও বিএনপির অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান প্রধান দুই প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও এটিকে দেখা হচ্ছে মূলত ‘নৌকা বনাম ধানের শীষ’-এর লড়াই হিসেবে। দেশের বিদ্যমান সামগ্রিক রাজ-নৈতিক গতিপ্রবাহের মধ্যে এবং নানা কারণেই বিতর্কিত বর্তমান নির্বাচন কমিশনের (ইসি) বিদায়বেলায় ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনের দিকে দৃষ্টি থাকছে সারাদেশেরও। তাছাড়া রাজধানী ঢাকার লাগোয়া নারায়ণগঞ্জ জেলায় নির্বাচনটি হওয়ায় বাড়তি নজর রয়েছে সকল দল ও সাধারণ্যেরও।1
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নাসিক নির্বাচনকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে- খোদ প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া নিজেও নির্বাচনের আদ্যপ্রান্ত খোঁজ রাখছেন। গুরুত্ব দেওয়ার কারণে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের বিবাদ মেটাতে শেখ হাসিনা নিজে স্থানীয় সব মত-পক্ষের নেতাদের গণভবনে ডেকে কথা বলেছেন, অনৈক্য ভুলে দলীয় প্রার্থী আইভীর পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য স্থানীয় নেতাদের কড়া নির্দেশনা দিয়েছেন। অন্যদিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াও দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে নারায়ণগঞ্জের বিবদমান নেতাদের ঢাকায় ডেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিনবার কথা বলেছেন। আওয়ামী লীগ প্রধানের মতো বিএনপি চেয়ার-পারসনও বিভেদ ভুলে দলীয় মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াতের পক্ষে একযোগে কাজ করতে স্থানীয় নেতাদের নির্দেশ দেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, বিএনপি এই মুহূর্তে নাসিক অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদের শেষদিকে এবং নিরপেক্ষ নতুন কমিশন গঠনে খালেদা জিয়া জাতির সামনে যে ১৩ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছেন, সেটির যৌক্তিকতা প্রমাণেও এই নির্বাচন গুরুত্ববহ।
গুরুত্ব দিলেও ক্ষমতাসীন দল হওয়ায় আইভীর পক্ষে প্রচারণায় নামতে পারছেন না আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় বড় নেতারা। নির্বাচনে আচরণের বিধিনিষেধের কারণে সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপিরা প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। যার কারণে নাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রধান সমন্বয়কারী দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতাদের বেশিরভাগকেই কাজ করতে হচ্ছে ফোনে-ফোনে।
তবে সংসদে না থাকার কারণে বিএনপিসহ ২০ দলের কারোরই সাখাওয়াতের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে কোনো বিধিনিষেধ নেই। বিএনপিও এই সুযোগের সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে চায়। গত মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত ২০ দলের বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাসহ ২০ দলের শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন টিমে ভাগ হয়ে নারায়ণগঞ্জে গিয়ে সাখাওয়াতের পক্ষে প্রচারণায় অংশ নেবেন। বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ থাকলে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জে যেতে পারেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও ২০ দল প্রধান বেগম খালেদা জিয়া।
আইভী-শামীমের ভূমিকার খোঁজ রাখছেন শেখ হাসিনা
নির্বাচনী প্রচারণায় নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও দলীয় মেয়র প্রার্থী সেলিনা হায়াৎ আইভী এবং দলের স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ তাদের অনুসারীদের কার কি ভূমিকা, সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিয়মিত খবর রাখছেন। সূত্রমতে, নির্বাচনে নৌকার বিজয় নিশ্চিত করতে আইভী-শামীম দু’জনকেই কিছু নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনায় তাতে ব্যত্যয় ঘটায় আইভী-শামীমকে আবারও গণভবনে ডাকা হতে পারে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, নাসিক নির্বাচন নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ফিলিংস রয়েছে। কারণ এটা নৌকা প্রতীকের নির্বাচন। এই নির্বাচনকে কেউ তামাশা হিসাবে নিলে পরিণতি ভোগ করতে হবে। তিনি জানান, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রতিদিনই নির্বাচন পরিস্থিতির খবর নিচ্ছেন।
আজ মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিন, মোসলেমে চোখ
নাসিক নির্বাচনকে বিএনপি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেওয়ার কারণেই মেয়র পদে সাখাওয়াতকে ২০ দলের একক প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। জোটের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেয়র পদে মনোনয়নপত্র দাখিলকারী ২০ দল শরিক লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি—এলডিপির কামাল প্রধান এবং বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির রাশেদ ফেরদৌস সোহেল আজ রবিবার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিনে সরে দাঁড়াচ্ছেন।
তবে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের একক না জোটগত প্রার্থী থাকছে সেটা পরিষ্কার হবে আজ। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের আইভীর পাশাপাশি দলটির নেতৃত্বাধীন ১৪ দল শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের (ইনু) মোসলেমউদ্দিন আহমেদও প্রার্থী। আজ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিনে মোসলেমউদ্দিন প্রতিযোগিতায় থাকছেন, না সরে দাঁড়াচ্ছেন তা জানা যাবে। অবশ্য জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার ইত্তেফাককে বলেছেন, মোসলেমউদ্দিন প্রার্থী হিসেবে বহাল থাকবেন।
২৭ ওয়ার্ডের নেতাদের নিয়ে গয়েশ্বরের বৈঠক, তিন নেতাকে দায়িত্ব বণ্টন
বিএনপির প্রধান সমন্বয়কারী গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গতকাল নাসিকের ২৭টি ওয়ার্ড ও শহর বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকদের নিয়ে ঢাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে সাখাওয়াতের পক্ষে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে নির্বাচনে কাজ করার জন্য নারায়ণগঞ্জের তিন নেতাকে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। তৈমুর আলম খন্দকারকে শহর এবং সাবেক দলীয় দুই এমপি গিয়াস উদ্দিনকে সিদ্ধিরগঞ্জ ও আবুল কালাম আজাদকে বন্দর এলাকার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ সময় গয়েশ্বর তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘নারায়ণগঞ্জের মানুষ সাখাওয়াতকে চেনেন না, চেনেন আপনাদের তিনজনকে। কাজেই ধানের শীষকে জয়ী করার মূল দায়িত্ব কিন্তু আপনাদের। এখানে কোনো গাফিলতি বা গ্রুপিং চেয়ারপারসন বরদাশত করবেন না।’
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও নাসিক নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালও গতকাল নয়াপল্টন কার্যালয়ে যুবদলকে নিয়ে বৈঠক করেছেন। বৈঠকে নাসিক নির্বাচনে সাখাওয়াতের পক্ষে প্রচারণার জন্য যুবদলের একাধিক টিম গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়।
এদিকে নির্বাচনের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেওয়াসহ বিএনপির পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের ২৭টি ওয়ার্ডে বসবাসকারীদের কারা কোন জেলার সে বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। সাখাওয়াতের পক্ষে মাঠে নামানোর জন্য ১০৪ জন কেন্দ্রীয় নেতার তালিকাও করেছে বিএনপি। নির্বাচনে প্রতিদিন গণসংযোগের জন্য দলের ঢাকা মহানগর কমিটি থেকে ১০০টি এবং মহিলা দল থেকে ১০টি টিম চাওয়া হয়েছে। সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে টানতে বিএনপি সংখ্যালঘু নেতাদের নিয়ে পৃথক প্রচার টিমও করবে। এসব নিয়ে নির্বাচনের প্রধান সমন্বয়কারী গয়েশ্বর চন্দ্র রায়সহ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা গতকাল রাতে খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সম্পাদকের বাসায় আইভী
সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে তুলনামূলকভাবে সিদ্ধিরগঞ্জে বিএনপি সমর্থিত লোকজন বেশি। এজন্য আইভী পরপর দুদিন সেখানে গণসংযোগ করেছেন। গতকাল গণসংযোগকালে সকালে তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি মজিবুর রহমানের বাসায় যান, মজিবুর রহমানও মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন চেয়েছিলেন। দুপুরে আইভী যান সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াছিন মিয়ার বাসায়। এ সময় ইয়াছিন তাকে ফুলের নৌকা দিয়ে স্বাগত জানান। আগের দিন শুক্রবার শহরে অনুষ্ঠিত নির্বাচন পর্যালোচনা কমিটির বৈঠকে ঢাকা থেকে যাওয়া দলের নেতাদের কাছে মজিবুর ও ইয়াছিন দুজনই অভিযোগ করেছিলেন, আইভী সিদ্ধিরগঞ্জ গেছেন, তবে তারা কিছু জানেন না, আইভী একাই ঘুরছেন। এই অভিযোগ শোনার পর আইভী গতকাল তাদের দুজনের বাড়িতে ছুটে যান। ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*