নতুন পে-কমিশনের ৩৩ হাজার কোটি টাকার বেতন-ভাতার সুপারিশ

1123নিউজগার্ডেন ডেস্ক : নতুন পে-কমিশনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরকে বছরে ৩২ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকা বেতন, আনুতোষিক ও পেনশন দেওয়ার সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। আগের তুলনায় এ হার ৩৫ শতাংশ বেশি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে বিদ্যমান হারে রাজস্ব বাজেটভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাজেট প্রাক্কলন করা হয় ২৪ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। এর সঙ্গে অতিরিক্ত ৮ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা যুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিশন। জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশে স্থায়ী সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জমি বা প্লট ক্রয় বা গৃহ নির্মাণের জন্য স্বল্প সুদে বা বিদ্যমান ব্যাংক রেটে ঋণ সুবিধা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই ঋণের পরিমাণ হবে ৫ থেকে ১৫ লাখ টাকা। ঋণ গ্রহণের পর ১২ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হবে। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী যে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন আয়করের যোগ্য তারা নিজেরাই কর দেবেন। তবে বর্তমানে প্রচলিত প্রথা অনুযায়ী তা ফেরতের পদ্ধতি রহিতের সুপারিশ করা হয়েছে। তবে ২৫ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বলা হয়েছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন খাতে প্রদত্ত আয়কর বিদ্যমান প্রথা অনুযায়ী ফেরত দেওয়ার পদ্ধতি রহিতকরণের প্রস্তাব সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। কামিশন সুপারিশে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, সর্বোচ্চ সেবা ও ব্যয় সাশ্রয়ের লক্ষ্যে প্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তাদের ধাপে ধাপে সার্বক্ষণিক গাড়ি সেবা দেওয়ারও সুপারিশ করেছে। এছাড়া, প্রথম শ্রেণীর সব কর্মকর্তার জন্য স্বল্প সুদে পাঁচ লাখ টাকা ঋণ দেওয়া হবে। এই ঋণ দশ বছরের মধ্যে শোধ করতে হবে। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়েছে, সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তা ও জওয়ান, বেসরকারি স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী এবং উন্নয়ন খাতভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও আনুতোষিকসহ পেনশন সুবিধা খাতে এই টাকা খরচ হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জন্য প্রণয়ন করা হবে পৃথক বেতন কাঠামো। এছাড়া, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এবং গবেষণায় নিয়োজিত বিশেষায়িত চাকরিজীবীদের জন্য চুক্তিভিত্তিক উচ্চতর বেতন ও সম্মানীর বিধান চালুর সুপারিশ করেছে বেতন কমিশন। বর্তমানে প্রচলিত বিভিন্ন ভাতার হার বৃদ্ধি, অবসরভোগীদের জন্য অবসর ভাতা, নিট পেনশন বৃদ্ধি, চিকিৎসা ভাতা বৃদ্ধিরও সুপারিশ করা হয়েছে। বেতন কমিশনের সুপারিশসমূহ বাস্তবায়নের কারণে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ যাতে বৃদ্ধি না পায় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখার সুপারিশও করেছে কমিশন। কমিশনের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, ইতোপূর্বে গঠিত বেতন কমিশনের কোনটিরই সুপারিশ সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে পুরোপুরি বা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এবারও তেমনটি হওয়ার সম্ভাবনা মাথায় রেখেই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। জানা যায়, জাতীয় বেতন কমিশনের প্রতিবেদনে প্রচলিত বেতন কাঠামোর মতো ২০টি স্কেল বহাল রাখা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ বেতন ৪৫ হাজার এবং কর্মচারীদের সর্বনিম্ন বেতন চার হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:১১.২৫।
সূত্র জানায়, গত ২৫ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাতে এই ব্যবধান দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বৈঠকে আলোচনা হয়, সর্বনিম্ন এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের বেতনের অনুপাত ১:১০-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যুক্তিযুক্ত হবে। তবে মন্ত্রিসভায় গঠিত সাত সদস্যের কমিটির সুপারিশের আলোকে এ বিষয়টি ঠিক করা হবে। জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয় ২০০৮ সালের ৩১ আগস্ট। এর প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় চলতি বছরের ২৩ এপ্রিল। এছাড়া, সশস্ত্র বাহিনীর জন্য আলাদা বেতন কমিশন গঠন করা হয় গত বছরের ৫ অক্টোবর এবং প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয় ৫ মে। গত ২৫ মে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বেতন কমিশনের প্রতিবেদন ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই বৈঠক থেকে গঠিত সাত সদস্যের কমিটির প্রথম সভায়ও সম্প্রতি একই ধরনের আলোচনা হয়েছে। তবে কমিশনের প্রতিবেদন যখনই কার্যকর হোক না কেন, আগামী ১ জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-কমিশন অনুযায়ী বেতন পাবেন। বেতন কমিশনের প্রতিবেদনের আলোকে সরকারের আর্থিক অবস্থা পর্যালোচনা করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বেতন কাঠামো নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নে সুপারিশ করতে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে আহ্বায়ক করে গঠিত কমিটির সদস্যরা হলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব, অর্থ বিভাগের সচিব, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব এবং পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (কার্যক্রম)। এই কমিটি ৪৫ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। জানা যায়, এর আগেও এ ধরনের কমিটি গঠন করে বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করা হয়েছে। ১৯৯১ সালে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিবকে আহ্বায়ক করে চার সদস্যের একটি কমিটি, ১৯৯৭ সালে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে আহ্বায়ক করে সাত সদস্যের কমিটি এবং ২০০৫ সালে মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে আহ্বায়ক করে ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এসব কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এবং মন্ত্রিসভার অনুমোদনক্রমে বেতন স্কেল নির্ধারণ ও কার্যকর করা হয়েছিল। এদিকে, বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদ মঙ্গলবার সংস্থাপন সচিবের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ সম্পর্কে পরিষদের মতামত সংবলিত ১০ দফা দাবি পেশ করেছে। এতে বেতন কমিশনের সুপারিশে কর্মকর্তাদের বেতন ৯৬ শতাংশ এবং কর্মচারীদের বেতন ৬৬ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এছাড়া, পরিষদ সচিবালয় কর্মচারীদের রেশন দেওয়ারও দাবি জানিয়েছে।

Leave a Reply

%d bloggers like this: