দোহাজারী থেকে কক্সবাজার কলাতলী পর্যন্ত যাচ্ছে রেললাইন

মো. দেলোয়ার হোসেন, চন্দনাইশ: পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের কাজ হাতে নিয়েছে সরকার। ১৩ হাজার ২শ ৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারের কলাতলী পর্যন্ত যাচ্ছে রেললাইন। ভুমি অধিগ্রহণে ৬শ ৫Chandanaish Pic from-01 কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। নকশা পরিবর্তনে ব্যয় বেড়েছে সাত গুণ। রেলপথ নির্মাণ প্রস্তুতির প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২শ ১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। সড়ক পথের ঝুঁকি-ঝামেলা এড়িয়ে আরামদায়ক রেল ভ্রমণের মাধ্যমে পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পৌঁছানোর পদক্ষেপ হাতে নিয়েছে বর্তমান সরকার। তাই দোহাজারী থেকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের কলাতলী পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ করবে রেল মন্ত্রণালয়। ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ হাজার ২শ ৫৮ কোটি টাকা। যা পূর্বে ১ হাজার৮শ ৫২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১৩ হাজার ২শ ৫৮ কোটি টাকা হয়েছে। ভুমি অধিগ্রহণে ৬শ ৫ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পে ব্যয়ের এক বিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশ টাকায় প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা) সহযোগিতা হিসেবে দেবে এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বাকী অর্থ দেবে বাংলাদেশ সরকার। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্পের ভূমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের তহবিলে ইতিমধ্যে ৩শ ১২ কোটি জমা দিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। তাছাড়া চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এলাকায় ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ৬শ ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ ধরা হয়েছে। বাকী টাকা শীঘ্রই দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন রেল কর্তৃপক্ষ। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হলে রেলপথ ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে অর্থ বরাদ্দ দিতে এডিবি প্রস্তুত রয়েছে। বহুল প্রতীক্ষিত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্প ক্রমশঃ এগিয়ে চলছে। প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে চট্টগ্রাম জেলায় ২শ ৮০ একর ও কক্সবাজার জেলায় ৯শ ৯৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ করতে হবে। ভূমি অধিগ্রহণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের দাবীকৃত ৩শ ৯১ কোটি টাকার মধ্যে ৩শ ১২ কোটি টাকা ইতিমধ্যে জমা হয়েছে। অপরদিকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অধীনে অধিগ্রহণের জন্য ৩শ ১৪ কোটি টাকা দাবী করা হয়েছে। একনেকের বৈঠকে অনুমোদন হলেই শুরু হবে ভূমি অধিগ্রহণের কাজ। অনুমোদনের পর এ অর্থ ছাড় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পূর্বাঞ্চলীয় রেল কর্তৃপক্ষ। ২০০১ সালের ভূমি জরিপের ডুলাহাজারা খ্রিষ্টান মেমোরিয়াল হাসপাতালের মাঝখান দিয়ে রেললাইন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে, বাঁধ সাজে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে চীনের সাথে চুক্তি হলে এডিবি চীনের অর্থায়নে ৪টি সংস্থার সমন্বয়ে দ্বিতীয় বার জরিপ করে। সর্বশেষ জরিপে মেমোরিয়াল হাসপাতাল এলাকা রেললাইন থেকে বাদ দেয়া হয়। কানেডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল রেল (কেনারাল), ¯েœক ইন্টারন্যাশনাল পিটিওয়াই লিমিটেড, অষ্ট্রেলিয়া (এস.এন.ই.সি), ডিবি ইন্টারন্যাশনাল, জিএমএচএইচ (জার্মানী), এসিইউ কনসালটেন্ট লিমিটেড এ ৪টি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জরিপ কাজ সম্পন্ন করেন।
রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের দোহাজারী পর্যন্ত রেলপথ আছে। নতুন প্রকল্পের আওতায় দোহাজারী থেকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন কলাতলী পর্যন্ত ১শ মিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ বিষয়ে কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের আওতায় আরো কিছু সমন্বিত মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে টঙ্গী-ভৈরব বাজার-আখাউড়া মিটারগেজ ডবল ট্রাকে রূপান্তর, ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে লাকসাম-চট্টগ্রাম মিটারগেজ ডাবল ট্রাকে প্রতিস্থাপন, ফৌজদারহাট-চট্টগ্রাম বন্দর ষ্টেশনের মিটারগেজ ডাবল ট্রাককে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের রেল কন্টেইনার টার্মিনালের রি-মডেলিং চট্টগ্রাম-দোহাজারীর বর্তমান মিটারগেজ লাইনকে ডাবল ট্রাকে রূপান্তর, একটি নতুন আভ্যন্তরীন কন্টেইনার ডিপু (আইসিডি) নির্মাণ, গাজীপুর-পূবাইল-দিরাজশ্রম রেলওয়ে ষ্টেশনের সঙ্গে সংযোগ লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সে সাথে চট্টগ্রাম ডুয়েলগেজ রেলিং স্টকের জন্য ক্যারেজ-ওয়াগন, লুকো ওয়ার্কশপ, পুয়েলিং ব্যবস্থা, আলাদা ডিপু স্থাপন করা হবে বলেও জানিয়েছেন তারা। চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে কক্সবাজার কলাতলী পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১শ মিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-মায়ানমার সীমান্ত ঘুমধুম পর্যন্ত আরো ২৮ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করার পরিকল্পনা রয়েছে। রেলওয়ে সূত্র মতে প্রথমে এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮শ ৫২ কোটি ৩৬ লাখ ৯৭ হাজার টাকা। কিন্তু পরে রেললাইনের নকশায় মিটারগেজ ও ব্রডগেজ (থাকবে) পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয় ১৩ হাজার ২শ ৫৮ কোটি ৯০ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে প্রকল্পের আওতায় ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ লাইনের ব্যবস্থা রাখায় ব্যয়ের তারতম্য ঘটেছে। প্রয়োজনীয় রেল সংগ্রহ, স্পেশাল উডেল স্লিপার, ব্লাস্ট, মাটির কাজ সহ ৬টি ষ্টেশন ভবন পুনঃ নির্মাণ করা হবে। ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণ প্রস্তুতি প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ২শ ১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এ অর্থের মধ্যে শুধু পরামর্শক খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১শ ৪৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। পরামর্শক সেবার জন্য আয়কর ও ভ্যাট বাবদ আরো ৪২ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ২শ ১২ কোটি ৬৪ লাখ টাকার মধ্যে বিদেশী পরামর্শকেরা পাবেন ১শ ৯০ কোটি টাকা। প্রকল্পটি চলতি বছর জুলাই থেকে ২০১৯ সালের জুন মেয়াদে বাস্তবায়ন করবে বলে রেল মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়। প্রকল্প এলাকায় ছোট-বড় সেতু পুনঃ নির্মাণ করা হবে। আগামী ২০২৩ সাল নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) কর্তৃপক্ষ প্রকল্পের আওতায় কাজ বিবেচনা করে ঋণ দেবে এডিবি। প্রকল্পটির সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়নের জন্য রেল মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ রেললাইন নির্মাণের ফলে কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত, মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণসহ গভীর সমুদ্র বন্দর নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যায়। ২০১০ সালের ৬ জুলাই প্রকল্পটি একনেকের বৈঠকে অনুমোদন দেয়া হয়েছিল। তখন ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ২০১১ সালে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৮শ ৫২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের দেয়া অর্থের পরিমাণ ৬শ ৭০ কোটি ৬ লাখ টাকা। বাকী ১১শ ৮২ কোটি ২৮ লাখ টাকা দাতা সংস্থা থেকে নেয়া। ইতিমধ্যে বেশকিছু এলাকা বাদ দিয়ে সর্বশেষ জরিপে বরাদ্দ বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। ২০১৪ সালের ২৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেলপথ প্রকল্প পরিদর্শনে আসেন। সে সময় তিনি মিটারগেজ নয়, ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণের নির্দেশ দেন। যাতে সব ধরনের ট্রেন চলাচল করতে পারে। তার ঘোষণা মোতাবেক ২০২১ সালের আওতাভুক্ত সিঙ্গেল মিটারগেজ রেলপথ এ প্রকল্প ২০১১ সালের ৩ এপ্রিল আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ২০০১ সালের ২৫ মার্চ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হলে আর্থিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়। সরকার তা অনুমোদন দেয়।
এ প্রকল্পের দোহাজারী হতে রামু হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত ১শ কিলোমিটার, রামু হতে ঘুমধুম পর্যন্ত ২৮ কিলোমিটার সহ ১শ ২৮ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণ করা হবে। পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক, সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তন করতে পর্যটন শহর কক্সবাজারকে রেলের নেটওয়ার্কের আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ রেললাইনটি নির্মাণ হলে সহজে কম খরচে মাছ, লবণ, কাগজের কাঁচামাল, বনজ ও কৃষি দ্রব্যাদি পরিবহন, ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোর মিচিং লিক নির্মাণ হবে। এ রেললাইনে ৯টি ষ্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে রয়েছে। সে সাথে কম্পিউটার, বেইজড, ইন্টারলক, সিগনেল সিস্টেম ডিজিটাল টেলিকমিউনিকেশন সিস্টেম থাকবে। শঙ্খ, মাতামুহুরী ও বাকখালীর উপর নির্মাণ করা হবে ব্রীজ। তাছাড়া ৪৩টি মাইনর ব্রীজ, ২০১টি কালভার্ট, সাতকানিয়া কেউচিয়া এলাকায় ১টি ফ্লাইওভার, ১৪৪টি লেভেলক্রসিং, রামু, কক্সবাজার এলাকায় ২টি হাইওয়ে ক্রসিং নির্মাণের কথা রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রেলপথে ঢাকা থেকে সরাসরি কক্সবাজারে যাতায়াত করার সুযোগ হয়ে যাবে। সে সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার দেশী-বিদেশী পর্যটকে ভরপুর হয়ে উঠবে। অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাবে কক্সবাজার। এতে সরকারের রাজস্ব আয়ও বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেললাইন প্রকল্প। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ স্থাপনের চেষ্টা ব্রিটিশ আমল থেকে অব্যাহত ছিল। ১৯৫৮ সালে ইস্টবেঙ্গল রেলওয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করার লক্ষ্যে জরিপ কাজ সম্পন্ন করেন। ১৯৭১ সালের ১১ ফেব্র“য়ারি থেকে ২৫ মার্চ জাপান রেলওয়ে টেকনিক্যাল সার্ভিস (জেআরটিসি) প্রস্তাবিত রেল লাইনটির ট্রাফিক সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালু করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধে জাপানের জি.আর.টি.সি ১৯৭৬-৭৭ সালে ডাটা সংগ্রহের কাজ শেষ করে। পরবর্তীতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমিটির পরীক্ষা শেষে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনের পক্ষে মত দেন।

Leave a Reply

%d bloggers like this: